In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

আল্লাহতা’লার ঐশী গুণ ‘রহিমিয়্যাত’

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

৯ই ফেব্রুয়ারী, ২০০৭ইং

“পবিত্র কুরআনের পরিভাষা অনুযায়ী খোদা তা’আলা তখন ‘রহীম’ সাব্যস্ত হন যখন মানুষের দোয়া, আহাজারি এবং পূণ্যকর্ম গ্রহণ করতঃ বিপদাপদ এবং কর্ম বিফল হওয়া থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন।”

“আল্লাহ্‌ তা’আলার রহীম বৈশিষ্ট্য থেকে যদি কল্যাণমন্ডিত হতে হয় তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তি যার বিবেক ও চেতনাবোধ রয়েছে তার উচিত নিজের বিনয় ও নম্রতাকে বৃদ্ধি করা। দোয়া, অনুনয়-বিনয় আর পূণ্যকর্মের প্রতি মনযোগ নিবদ্ধ করা।”

“যদি মানুষ রহিমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য দ্বারা লাভবান না হয় তাহলে এমন মানুষ পশু বরং জড়বস্তুর সমতুল্য।”

“হযরত আকদাস মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর তত্বপূর্ণ উক্তি ও লেখনীর আলোকে রহমানিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা ও প্রাণ সঞ্জীবনী বিবরণ”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَةَ اللّهِ لاَ تُحْصُوهَا إِنَّ اللّهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ

(সূরা আন্‌ নহলঃ ১৯)

গত কয়েকটি খুতবায় আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার রহমান বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম, আজ আমি রহীম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করবো। আমরা জানি যে, পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরা, সূরাতুল ফাতিহা যা আমরা নামাযের প্রতিটি রাকাতে পাঠ করে থাকি, তাতে আল্লাহ্‌ তা’আলার যে তৃতীয় বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তা হলো ‘আর্‌ রহীম’।

হযরত আকদাস মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“খোদা তা’আলার তৃতীয় গুণ ‘রহিমিয়্যাত’ যা তৃতীয় পর্যায়ের অনুগ্রহ। সূরাতুল ফাতিহায় তা ‘আর্‌ রহীম’ শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের পরিভাষার আলোকে খোদা তা’আলা সে অবস্থায় ‘রহীম’ সাব্যস্ত হন যখন মানুষের দোয়া, আকুতি-মিনতি এবং পূণ্যকর্ম গ্রহণ করতঃ বিপদাপদ, সমস্যা এবং কর্ম বিফল হওয়া থেকে তাদেরকে রক্ষা করেন।” (আইয়ামুস্‌ সুলেহ্‌, রূহানী খাযায়েন-১৪তম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ২৪৯)

বিভিন্ন আলেম ও তফসীরকারকগণ এ শব্দ এবং বৈশিষ্ট্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা আমি সংক্ষেপে বর্ণনা করছি। এরপরে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর ভাষায় তা বর্ণনা করবো। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কথা অথবা তাঁর কোন ব্যাখ্যার পরে অন্য কোন সনদের প্রয়োজন হয় না; কিন্তু এ বর্ণনার দ্বারা এটিও অনুমিত হয় যে, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গী; যাঁকে সরাসরি খোদা তা’আলার পক্ষ থেকে জ্ঞান ও অন্তরদৃষ্টি দেয়া হয়েছে, তা তাঁরই বিশেষত্ব কেননা তিনিই সে মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী যিনি মহানবী (সাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এসেছেন। যাইহোক, প্রথমে মুফাস্‌সের এবং আলেমদের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছি যদ্বারা এ শব্দের অর্থের উপর আলোকপাত হবে।

মুফরাদাত ইমাম রাগেব’এ লিখিত আছে,

‘আর্‌ রহীম’ তাঁকে বলা হয় যার দয়া অনেক ব্যপক। আক্‌রাবুল মওয়ারেদ অনুসারে ‘আর্‌ রহীম’ অর্থ দয়া প্রদর্শনকারী। অধিকন্তু এটি আল্লাহ্‌ তা’আলার সুন্দর গুণবাচক নামসমূহের একটি।

মোটকথা অভিধানে আলোচিত এ শব্দের বিভিন্ন অর্থের মাঝে সামঞ্জস্য দেখা যায়। তাই একে বাদ দিয়ে বিভিন্ন তফসীরকারক এ শব্দের যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন তা বর্ণনা করছি। এরপরে যেভাবে আমি বলেছি, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর উদ্ধৃতির আলোকে এ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করবো।

আবু আব্দুল্লাহ্‌ মুহাম্মদ বিন আহ্‌মদ আল্‌ আনসারী আল্‌ কুরতুবী কৃত ‘তফসীরুল্‌ জামে লিআহ্‌কামিল্‌ কুরআন’-এ তিনি বলেন,

‘আর্‌রহ্‌মান’এর সাথেই ‘আর্‌রহীম’ বৈশিষ্ট্য উল্ল্যেখ করার প্রজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে মুহাম্মদ বিন ইয়াযিদ বলেন, এটি কৃপারূপী (রহ্‌মান) দানের পর দ্বিতীয় (রহীম) দান এবং খোদার রহমত প্রত্যাশীদের আশারআলো-কে সুদৃঢ় করার জন্য এক পুরষ্কারের পর এটি দ্বিতীয় পুরস্কার। এটি এমন এক প্রতিশ্রুতি যা পূর্ণতার প্রত্যাশী কখনই বিফল মনোরথ হয় না।

আবার বলেন,

আলেমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘আর্‌রহীম’ নামের দিক থেকে সার্বজনীন এবং স্বীয় কার্যকারীতার দিক থেকে বিশেষ এবং বিশেষত্ব সম্পন্ন।

পুনরায় লিখেন,

আবু আলী ফারসী ‘আর্‌রহ্‌মান’ বৈশিষ্ট্যের বিবরণ দেয়ার পর বলেন, ‘আর্‌রহীম’ বৈশিষ্ট্য কেবল মু’মেনদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন আল্লাহ্‌ বলেনঃ

وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيماً (সূরা-আল্‌ আহ্‌যাবঃ৪৪)

আব্দুল মালেক আল্‌ আরযমী বলেন,

রহীম বৈশিষ্ট্য মু’মেনদের পথ দেখানো এবং তাঁদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শনের অর্থে ব্যবহৃত হয়।

ইবনুল মুবারক বলেন,

‘আর্‌রহ্‌মান’ তিনি, যাঁর কাছে যখনই কিছু যাচনা করা হয় তিনি তা দান করেন এবং ‘আর্‌রহীম’ তিনি, যার কাছে না চাইলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। উদাহরণ স্বরূপ তিরমিযি’তে হযরত আবু হুরায়রাহ্‌ (রাঃ) কর্তৃক এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন; ‘মাল্লাম ইয়াদ্‌উল্লাহা সুবহানাহু গাযিবা আলাইহি’ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে দোয়া করে না আর তাঁর কাছে চায় না আল্লাহ্‌ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন।

কবি এ বিষয়টিকে নিজের ভাষায় এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন,

‘আল্লাহু ইয়াগ্‌যাবু ইন্‌ তারাকতা সুয়ালাহু’ ওয়া বুনাইয়্যূ আদামা হীনা ইউসআলু ইয়াগযাবু’

অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ ত���নি, যাঁর কাছে তুমি যদি চাওয়া এবং যাচনা ছেড়ে দাও তাহলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। অপর দিকে অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এর বিপরিত চিত্র হলো, কেউ যদি তাদের কাছে চেয়ে বসে তাহল��� ���ার প্রতি অসন���তু����্ট ���য়।

বাস্তবে তাই হয়। কোন জিনিষের জন্য কেউ যদি নাছোড়বান্দা হয় তাহলে বিরক্ত হয়ে অবশেষে দিয়ে দেয় কিন্তু ভৎসনাও করে যে, ভবিষ্যতে আর এমন কীর্তি করোনা।

তাঁর বিবরণেই মাহ্‌দভী’র কথা রয়েছে। তিনি বলেন,

মাহ্‌দভী বলেছেনঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা বিসমিল্লাহির র‏হ্‌মানির্‌ রহীম’এ রহীম অন্তর্ভূক্ত করে এটি বলেছেন যে, তোমরা ‘রহীম’ অর্থাৎ মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মাধ্যমেই আমা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে।

হযরত উসমান (রাঃ) কর্র্তৃক বর্ণিত,

তাঁর প্রশ্নের উত্তরে রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্টির প্রত্যেক পূণ্যবান ও পাপীর উপর সদয় হওয়ার অর্থে ‘আর্‌রহ্‌মান’। ‘আর্‌রহীম’ বৈশিষ্ট্য মু’মেনদের প্রতি বিশেষভাবে দয়া প্রদর্শনের অর্থে ব্যবহৃত হয়।

অনেক স্থানে রহ্‌মান বৈশিষ্ট্যেরও উল্ল্যেখ এসে যাবে কেননা, রহ্‌মান এবং রহীম শব্দের মূল ধাতু একই। তাই তুলনা করার লক্ষ্যে কোন-কোন স্থানে পুনরাবৃত্তি করা হবে যা হয়ত পূর্বেও হয়ে থাকবে।

‘আর্‌রহ্‌মানঃ’ আল্লামা রাজী (রহ:) বলেন,

‘আর্‌রহ্‌মান’ নাম আল্লাহ্‌রই বিশেষত্ব অথচ ‘আর্‌রহীম’ আল্লাহ্‌ তা’আলার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও বলা হয়ে থাকে। যদি এটি বলা হয় যে, এ দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আর্‌রহ্‌মান’ উৎকৃষ্ট ও উন্নত বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াবে! গৌণ বৈশিষ্ট্যের উল্ল্যেখ মুখ্যের পরে কেন করা হল। অর্থাৎ প্রথমে রহ্‌মান আর পরে রহীম কেন আসল? তিনি বলেন, এর উত্তর হচ্ছে, যিনি বিরাট এবং মহান তাঁর কাছে তুচ্ছ এবং সহজলভ্য জিনিষ প্রত্যাশা করা হয় না। কথিত আছে যে, কেউ কোন ধনী লোকের কাছে গিয়ে বললো, আমি একটি সামান্য কাজের জন্য আপনার কাছে এসেছি। সে বড় লোকটি বললেন, তুচ্ছ কাজের জন্য কোন তুচ্ছ মানুষের কাছে যাও। অতএব আল্লাহ্‌ তা’আলা এটি বলছেন যে, যদি তোমরা রহমানের পর থেমে যাও তাহলে আমার কাছে চাইতে সংকোচ আর লজ্জা পাবে আর ছোট-ছোট জিনিষ চাওয়া থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু তোমরা আমাকে জানো যে, আমি রহমান; সে সুবাদে তোমরা আমার কাছে বড়-বড় জিনিষ কামনা কর; আমি একইভাবে রহীম’ও সুতরাং তোমরা আমার কাছে জুতার ফিতাও চাও আর নিজেদের খাবারের জন্য লবনও। (তেহরানের দারুল কুতুবুল ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত আল্লামা ফখরুদ্দিন রাজি’র তফসীরে কবীরের ১ম খন্ড। সূরা ফাতিহার তফসীর-৩য় অধ্যায়, আর্‌ রহমান-রহীম এর তফসীর পৃষ্ঠাঃ২৪৩- ২য় সংস্করণ)

আল্লামা রাযী (রহঃ) পুনরায় বলেন,

মানুষ যা করার শক্তি রাখে না তিনি তা সৃষ্টি করেন আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রহমান, রহীম এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে, তিনি এরূপ কাজ করেন যা অন্য কেউ করতেই পারে না। অর্থাৎ তিনি বলছেন, আমি র‏হ্‌মান কেননা তোমরা একটি তুচ্ছ শুক্রানু আমার কাছে সোপর্দ কর আর আমি একে সর্বোত্তম চেহারা ও আকৃতি দেই। এছাড়া আমি রহীম’ও কেননা তোমরা আমার অসম্পূর্ণ আনুগত্য কর কিন্তু আমি তোমাদেরকে আমার স্থায়ী জান্নাত দান করি। (তেহরানের দারুল কুতুবুল ইলমিয়া থেকে প্রকাশিত আল্লামা ফখরুদ্দিন রাজি’র তফসীরে কবীরের ১ম খন্ড। সূরা ফাতিহার তফসীর-৩য় অধ্যায়, আর্‌ রহমান-রহীম এর তফসীর পৃষ্ঠাঃ২৩৫- ২য় সংস্করণ)

কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুফাস্‌সেরের সংক্ষিপ্ত তফসীর আমি উপস্থাপন করলাম।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“রহিমিয়্যাত স্বীয় কল্যাণ প্রকাশের জন্য বুদ্ধি-সম্পন্ন সৃষ্টির কাছে এ স্বীকৃতি চায় যে, ‘আমি কিছু নই, আমি কিছু নই’ আর এটি কেবল মানব জাতির সাথে সম্পর্ক রাখে।”(আইয়ামুস্‌ সুলেহ্‌, রূহানী খাযায়েন-১৪তম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ২৪৩)

অর্থাৎ যদি এ বৈশিষ্ট্য থেকে লাভবান হবার ইচ্ছে থাকে তাহলে প্রত্যেক বিবেক-বোধ সম্পন্ন মানুষের উচিত নিজের বিনয় আর নম্রতাকে বৃদ্ধি করা, দোয়া এবং কাকুতি-মিনতির প্রতি মনযোগী হওয়া; তাহলেই কল্যাণ অর্জিত হবে। কেবল অহংকার এবং গর্ব থেকে মুক্ত হলেই রহিমিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের আশিস লাভ করবে। অর্থাৎ পূণ্য কর্ম করলেই কল্যাণ থেকে অংশ পাবে কেননা কোন প্রকারের অহংকার থাকলে মানুষ আল্লাহ্‌ তা’আলার সমীপে সেরূপ বিনয়ের সাথে উপস্থিত হতেই পারে না যা তাঁর এক বান্দা হওয়ার জন্য আবশ্যক। তাই আল্লাহ্‌ তা’আলার সমীপে উপস্থিত হবার শর্ত হচ্ছে আপনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা, নিজেকে কিছু মনে না করা, স্বীয় সত্বাকে কোন গুরুত্ব না দেয়া ।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) এ সম্পর্কে আরো বলেন,

“আর্‌রহীম অর্থাৎ সে খোদা পূণ্য কর্মের উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন, কারো পরিশ্রম বিনষ্ট করেন না, এ দৃষ্টিকোণ থেকে রহীম আখ্যায়িত হন এবং এ বৈশিষ্ট্য রহিমিয়্যাত নামে পরিচিত। (রাবোয়া থেকে প্রকাশিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনের রিপোর্ট পৃষ্ঠা: ১২৩, সূত্রঃ হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর তফসীর, ১ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ৬৬)

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর উপরোক্ত যে দু’টি উদ্ধৃতি আমি পাঠ করেছি এ উদ্ধৃতি থেকে তা আরো স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন,

“রহিমিয়্যাত সে ঐশী কল্যাণধারা যা রহ্‌মানিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের কল্যাণমালা হতে পৃথক। এ কল্যাণধারা মানব জাতির পরিপূর্ণতা এবং মানব প্রকৃতিকে উৎকর্ষতায় পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত কিন্তু একে অর্জনের জন্য চেষ্টা , সৎকর্ম সম্পাদন আর প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করা হচ্ছে পূর্ব-শর্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত কর্ম সম্পাদনে পুরো প্রচেষ্টা নিয়োজিত না করা হয়, যতক্ষণ নফসের পবিত্রতা অর্জন না হবে এবং লোক দেখানোর প্রবণতা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে পুরো নিষ্ঠা ও হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জিত না হবে আর যতক্ষণ পর্যন্ত মহাপরাক্রমশালী খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মৃত্যূকে বরণ না করবে ততক্ষণ এ রহমত পুরোপুরি অবতীর্ণ হবে না। সুতরাং তারাই কল্যাণমন্ডিত যারা নেয়ামত থেকে অংশ লাভ করেছে বরং তারাই প্রকৃত মানুষ আর অন্যরা চতুষ্পদ জন্তুর সমতূল্য।” (ইজাযে মসীহ্‌, রূহানী খাযায়েন ১৮তম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ৯৫-৯৬, রাবোয়া থেকে প্রকাশিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কৃত তফসীর ১ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ৪৪)

এ বর্ণনা থেকে বুঝা গেল যে, এ বৈশিষ্ট্য মানব প্রকৃতিকে উৎকর্ষতায় পৌঁছিয়ে থাকে। আর কারা সুউচ্চ মার্গে অধিষ্ঠিত ছিলেন? এ সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদেরকে সূরা ফাতিহায় দোয়া শিখিয়েছেন যে, দোয়া কর! আমাদেরকে পরাকাষ্ঠায় উপনীত লোকদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করো। তারা কারা ছিলেন? তারা ছিলেন সে সকল লোক ,যাদেরকে আল্লাহ্‌ তা’আলা পুরস্কৃত করেছেন; অর্থাৎ নেয়ামত প্রাপ্ত শ্রেণী।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন,

চতুর্থ সমুদ্র হচ্ছে ‘আর্‌রহীম’ বৈশিষ্ট্য এবং এদ্বারা صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ বাক্য কল্যাণমন্ডিত হয়েছে যাতে করে বান্দা বিশেষ পুরস্কারপ্রাপ্ত লোকদের মাঝে গণ্য হতে পারে কেননা রহিমিয়্যাত এমন বৈশিষ্ট্য যা বিশেষ পুরস্কার পর্যন্ত পৌঁছিয়ে থাকে; যাতে আনুগত্যের কোন ভূমিকা নেই অর্থাৎ (আল্লাহ্‌ তা’আলার) এ সার্বজনীন পুরস্কার মানুষ থেকে শুরু করে সাপ, অজগর পর্যন্ত সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। (কিরামাতুস সাদেকীন-রূহানী খাযায়েন,৭ম খন্ড-পৃষ্ঠা:১১৮-হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কৃত তফসীরের ১ম খন্ড ১১৬ পৃষ্ঠা)

রহীম বৈশিষ্ট্যের কল্যাণে এ পুরস্কার লাভ হয়। এ পুরস্কারপ্রাপ্ত লোকদের পরিচয় আল্লাহ্‌ তা’আলা এভাবে বর্ণনা করেছেন,

وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقاً

(সূরা নিসাঃ৭০)

‘এবং যারা আল্লাহ্‌ এবং এ রসূলের আনুগত্য করবে তারা ঐ সব ��োকদের মধ্যে শামিল হ��ে যাদে�����কে আল্লা��্‌ পুরস্কার দান করেছেন অর্থাৎ নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ এবং সালেহ্‌গণের মধ্যে। এবং এরাই সঙ্গী হিসেবে উত্তম।’

সুতরাং রহিমিয়্যাতের কল্যাণ লাভের জন্য কিছু কর্মের প্রয়োজন, আর হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কথা অনুসারে মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্‌ এবং রসূলের পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ আনুগত্য; তাহলেই পুরস্কারপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে। ইবাদতের মানও উন্নত করা প্রয়োজন আর অন্যান্য পূণ্যকর্ম করাও একান্ত আবশ্যক যা হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) স্পষ্ট করেছেন, যার একটি হলো প্রবৃত্তির তাড়না পুরোপুরি পরিহার করা। প্রতিটি কাজ যেন খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়, তাতে কোন রূপেই যেন আমিত্বের অনুপ্রবেশ না ঘটে, কিন্তু এটি কোন সহজ কাজ নয়। প্রবৃত্তিকে দমন করা অত্যন্ত কঠিণ কাজ; কিন্তু কামনা-বাসনাকে পিষ্ট করা ছাড়া আল্লাহ্‌ তা’আলার রহমত থেকে পুরোপুরি অংশ লাভ হয় না। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন, এটি পুরো মহিমার সাথে অবতীর্ণ হয় না। সুতরাং দোয়া গৃহীত হবার জন্য আর আল্লাহ্‌ তা’আলার রহিমিয়্যত থেকে অংশ পেতে হলে নিজেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে, আমাদের কর্ম কতটা সৎ, আল্লাহ্‌ ও বান্দার অধিকার প্রদানে কতটা তৎপর এবং তাঁর খাতিরে নিজের কামনা-বাসনা আর প্রবৃত্তিকে কতটা দমনকারী? যদি এরূপ না হয় তাহলে আমাদের এ দাবী করা ভুল হবে যে, আমরা কেবল আল্লাহ্‌র সমীপে সমর্পণকারী, তাঁর কাছেই প্রার্থনাকারী। সুতরাং হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কথা অনুসারে এ উদ্দেশ্যে পুরো চেষ্টা এবং পরিশ্রম করা প্রয়োজন, একটি সংগ্রামের প্রয়োজন তাহলেই নফস্‌ পুরোপুরি পবিত্র হবে, কপটতা থেকে তখনই আমাদের হৃদয় পুরোপুরি মুক্ত হবে, আর এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হলেই আমাদের হৃদয় মহা পরাক্রমশালী খোদার সন্তুষ্টি অর্জনকারী হবে। তাহলে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বীয় প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সে দলে অন্তর্ভূক্ত করবেন যার সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ এবং সালেহ্‌গণের দল, তারপর আমরা আমাদের জীবনে আল্লাহ্‌ তা’আলার এ প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপায়ন দেখবো যে,

وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لا تُحْصُوهَا

অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তা’আলার নেয়ামতরাজি এত বেশী বর্ষিত হবে যে তোমরা তা গনে শেষ করতে পারবে না।

অতএব এটি অর্জনের জন্য এবং তাঁর রহিমিয়্যাত থেকে অংশ পাওয়ার জন্য ইস্তেগফারের সাথে আমাদের কর্ম সংশোধন করতে হবে, তাহলেই এ বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণমন্ডিত হতে পারবো। আল্লাহ্‌ তা’আলার সার্বজনীন নিয়ামততো এমনিতেই সব কিছুর উপর ছেয়ে আছে, কেউ এর বাইরে নয়; কিন্তু এটি রহ্‌মানিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের আওতায় হচ্ছে। রহিমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য থেকে অংশ লাভ করে আল্লাহ্‌ তা’আলার এক বান্দা আল্লাহ্‌ তা’আলার নিয়ামত রাজীর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দায় পরিণত হয়। এ যুগে এটিও আল্লাহ্‌ তা’আলার কত বড় অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদেরকে মসীহ্‌ ও মাহ্‌দীকে মানার তৌফিক দিয়েছেন, অথচ অন্যরা একথার অমান্যকারী যা কার্যত: আল্লাহ্‌ তা’আলার রহিমিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের ফলে সৃষ্ট নিয়ামতরাজিরই অস্বীকার। এ যুগে মহানবী (সাঃ)-এর জ্যোতি থেকে অংশ পেয়ে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আদলে আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের জন্য যে চাঁদ আবির্ভূত করেছেন, যে জ্যোতির বিস্তার করেছেন তাঁকে ছেড়ে মুসলমানরা পীর-ফকিরের মাজারে গিয়ে আলো সন্ধান করছে, সেসব ম্রিয়মান প্রদীপের মাধ্যমে আলোকিত হবার চেষ্টা করছে, আর একারণেই অহরহ বেদাত ও নোংরামিতে লিপ্ত হচ্ছে।

সুতরাং বর্তমান যুগে এক আহ্‌মদীকে সে রহীম খোদার রহিমিয়্যাত থেকে অংশ লাভ করার জন্য এভাবেও ভাবা উচিত যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে স্বীয় রহমানিয়্যাতের বদৌলতে আহ্‌মদী ঘরে জন্ম দিয়েছেন বা নতুন আহ্‌মদী যারা আছেন তাদেরকে, তাদের দোয়া কবুল করত: রহিমিয়্যাতের কল্যাণে আহ্‌মদীয়াত গ্রহণের তৌফিক দিয়েছেন। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কে মানার সৌভাগ্য দিয়েছেন। এসব কল্যাণ এবং নিয়ামতরাজির দাবী হচ্ছে, আমরা যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আল্লাহ্‌ তা’আলা এবং তাঁর রসূলের কামেল ও পরিপূর্ণ আনুগত্য করি, সৎকর্ম সম্পাদন করি এবং সর্বদা তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকি। সকল জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক নেয়ামতরাজি সম্পর্কে ভেবে দেখুন এমন কোন অনুগ্রহ আছে যা তিনি আমাদের উপর করেন নি। সব ধরণের পুরস্কার আমাদেরকে দিয়েছেন, তারপর আমাদেরকে এ পথও প্রদর্শন করেছেন যে, আমার কাছে ক্ষমা চাইতে থাকো কেননা এর উপর অর্থাৎ পূণ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য এবং তার মান উন্নত করার জন্য ইস্তেগফার একান্ত আবশ্যক। আল্লাহ্‌ তা’আলার নিয়ামতের ফলে জ্ঞান ও মা’রেফাতে অথবা পূণ্যে ও আধ্যাত্মিকতায় উন্নতির জন্য বিনয় অবলম্বন এবং ইস্তেগফার একান্ত আবশ্যকীয়। নতুবা অহংকারের ভূত ভালো মানুষকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। উপরে যেতে যেতে নিচের দিকে নামা আরম্ভ করে আর সে সময় পূণ্য ও জ্ঞান কোন কাজে আসে না। তাই রহীম খোদার রহীমিয়্যাতের সাথে ইস্তেগফার অত্যাবশ্যকীয়। এজন্যই আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে যেখানে রহীম শব্দ ব্যবহার করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানে গফুর বৈশিষ্ট্যের সাথে এটি রেখেছেন। সুতরাং রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণমন্ডিত হবার জন্য সৎকর্ম এবং ইস্তেগফার মৌলিক বিষয়।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) আবারো বলেন,

“রহীমিয়্যাতের একটি বিশেষত্ব হলো দুর্বলতা ঢেকে রাখা কিন্তু এর পূর্বে কোন পূণ্যকর্ম থাকা আবশ্যক। এ কর্মে কোন প্রকারের ঘাটতি বা ত্রুটি থাকলে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বীয় রহীমিয়্যাত দ্বারা একে ঢেকে রাখেন। রহমানিয়্যাত এবং রহীমিয়্যাতের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, রহমানিয়্যাতের মধ্যে কর্মের কোন ভূমিকা নেই। কিন্তু রহীমিয়্যাতের মধ্যে কর্মের দখল রয়েছে কিন্তু দুর্বলতাও সহাবস্থান করে। খোদার দয়া দুর্বলতাকে ঢেকে রাখা পছন্দ করে।” (মলফুযাত, নব সংস্করণ-১ম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ১২৬-১২৭)

অতএব এর মাধ্যমে রহীমিয়্যাতের সাথে আল্লাহ্‌ তা’আলা কেন গফুর বৈশিষ্ট্য রেখেছেন সে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে গেল। এর কারণ হলো, বান্দার জন্য আল্লাহ্‌ তা’আলার যে দয়া রয়েছে সে কারণে তাদেরকে ক্ষমার চাঁদরে আবৃত করা আর এভাবে তাদের দুর্বলতা গোপন করা। কিন্তু হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কথা অনুযায়ী, কোন না কোন পূণ্যকর্ম থাকতে হবে। এমন যেন না হয় যে কাজের বেলায় ঠনঠন আর আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে দুর্বলতা ঢেকে রাখার আশা করবে! এছাড়া পাপের ক্ষেত্রেও হঠকারী হওয়া উচিত নয়। যদি কোন অন্যায় হয়ে যায় তাহলে ইস্তেগফার করা উচিত যাতে আল্লাহ্‌ তা’আলার ক্ষমা লাভ হয় আর তা যেন গোপন থাকে। তওবার প্রতি মনযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءاً بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (সূরা আল্‌ আনআমঃ ৫৫)

অর্থাৎ তোমাদের প্রভু দয়া করা নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ অজ্ঞতা বশতঃ মন্দ কাজ করে, অত:পর সে তওবা করে এবং আত্মসংশোধন করে তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অতীব ক্ষমাশীল এবং পরম দয়াময়।

অতএব এখানেও সেই হত্যকারীর দৃষ্টান্তই প্রযোজ্য যা আমি পূর্বে দিয়েছিলাম; যে ৯৯টি খুনের পর শতক পূর্ণ করেছিল কিন্তু যেহেতু অনুশোচনাবোধ জাগ্রত হয়েছিল এবং পূণ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছিল তাই আল্লাহ্‌ তা’আলা তার ক্ষমার উপায় করেছেন। আ্ল্লাহ্‌ তা’আলা ক্ষমা করেন কিন্তু ���ানুষকেও তওবার প্রতি মনযোগী হতে হবে। সুতরাং রহীম বৈশিষ্ট্য থেকে সর্বাধিক কল্যাণ লাভের জন্য অনুশোচনার পাশাপাশি তাঁর কাছে সমর্পণ এবং সৎকর্ম করা একান্ত আবশ্যক।

���কস্থানে দোয়ার দর্শন ���বং রহীম��য়্যতের সম্���র্ক বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“দ্বিতীয় অনুগ্রহ হচ্ছে রহীমিয়্যাত। অর্থাৎ আমরা দোয়া করলে আল্লাহ্‌ তা’আলা দান করেন। চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দোয়া এবং ঐশী নিয়ম-কানুন সর্বদা ওতপ্রতোভাবে জড়িত। কেউ কেউ আজকাল একে বেদা’ত মনে করে। খোদা তা’আলার সাথে আমাদের দোয়ার যে সম্পর্ক আমি তাও বর্ণনা করতে চাই”

তিনি বলেন,

“এক শিশু যখন ক্ষুধায় কাতর হয়ে দুধের জন্য কাঁদে এবং চিৎকার করে তখন মাতৃ স্তনে দুধ আসে। শিশু দোয়ার নামও জানে না কিন্তু তার চিৎকার কিভাবে দুধ’কে আকর্ষণ করে, সবারই এ অভিজ্ঞতা আছে। অনেক সময় দেখা গেছে মা দুধ আছে বলে অনুভবও করেন না, কিন্তু শিশুর চিৎকার দুধ টেনে আনে। প্রশ্ন হলো আল্লাহ্‌ তা’আলার সমীপে আমাদের ক্রন্দন কি কিছুই আকর্ষণ করতে পারে না? পারে; সবই পারে। কিন্তু দৃষ্টিহীনরা যারা বিজ্ঞ এবং দার্শনিক বনে বসে আছে তারা দেখতে পায় না। শিশুর সাথে মায়ের যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক এবং বন্ধনকে মাথায় রেখে যদি মানুষ দোয়ার দর্শনের উপর অভিনিবেশ করে তাহলে তা অনেক সহজ এবং বোধগম্য মনে হয়। দ্বিতীয় প্রকার অনুকম্পা এ শিক্ষা প্রদান করে যে, একটি অনুকম্পা চাওয়ার পর প্রদর্শন করা হয়। চাইতে থাক পেতে থাকবে। ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ(সূরা আল্‌ মু’মেনঃ ৬১) কেবল কথার কথা নয় বরং এটি মানব প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চাওয়া বান্দার বৈশিষ্ট্য আর দেয়া আল্লাহ্‌ তা’আলার। যে বুঝে না আর মানে না সে মিথ্যুক। শিশুর যে উদাহরণ আমি দিয়েছি তা দোয়ার দর্শনকে ভালোভাবে স্পষ্ট করে। রহ্‌মানিয়্যাত আর রহীমিয়্যাত দু’টি পৃথক বিষয় নয়, তাই যে একটি বাদ দিয়ে অন্যটি চায় সে পেতে পারে না। রহ্‌মানিয়্যাতের দাবী হলো, তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের মধ্যে রহীমিয়্যাতের কল্যাণ লাভের সামর্থ সৃষ্টি করা। যে এরূপ করে না সে নিয়ামতের অস্বীকারকারী।” (মলফুযাত, নব সংস্করণ-১ম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৮১-৮২)

অর্থাৎ রহ্‌মানিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের কল্যাণে আল্লাহ্‌ তা’আলা যে উপকরণ প্রদান করেছেন, জীবন ধারণের যে ব্যবস্থা করে রেখেছেন, জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক যে উপকরণ আমাদেরকে সরবরাহ করেছেন সে জন্যও আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন তোমরা আমার নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞ হও কেননা আমার নিয়ামতরাজি এত বেশী যে তোমরা গণনা করে শেষ করতে পারবে না। তাই আল্লাহ্‌ তা’আলা রহ্‌মান বৈশিষ্ট্যের অধীনে আমাদেরকে যে নেয়ামতরাজি দান করেছেন তার দাবী হলো, আল্লাহ্‌ তা’আলার রহীম বৈশিষ্ট্যের অধীনে তা থেকে অধিক লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে এবং একে অব্যাহত রাখার জন্য তাঁর সমীপে দোয়া করুন, তাঁর অধিকার প্রদান করুন এবং ইবাদত ও সৎকর্ম সম্পাদন করুন।

পুনরায় ‘আর্‌রহীম’ সিফত সম্পর্কে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“এ অনুগ্রহ অন্য ভাষায় বিশেষ কল্যাণ নামে পরিচিত আর কেবল মানব জাতির জন্য নির্ধারিত। অন্যান্য সৃষ্টিকে খোদা দোয়া, অনুনয়-বিনয় এবং সৎকর্ম করার ক্ষমতা প্রদান করেন নি কিন্তু মানুষকে দিয়েছেন। মানুষ বাক শক্তিসম্পন্ন প্রাণী আর স্বীয় বাকশক্তি দ্বারাও খোদার কল্যাণ লাভ করতে পারে।” (আল্লাহ্‌ তা’আলা বলার শক্তি দিয়েছেন আর নিজ কথা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা’আলার কল্যাণ লাভ করতে পারে) “অন্যান্য সৃষ্টিকে বাকশক্তি দেয়া হয়নি। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, মানুষের দোয়া করা তার একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য যা তার প্রকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেভাবে খোদা তা’আলার রব এবং রহমান বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণ লাভ হয় অনরূপভাবে রহীম বৈশিষ্ট্য থেকেও একটি কল্যাণ লাভ হয়। পার্থক্য কেবল, রব এবং রহমান বৈশিষ্ট্যদ্বয় দোয়ার মুখাপেক্ষী নয় কেননা এ দু’টি বৈশিষ্ট্য কেবল মানুষের জন্যই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা সব পশু-পাখিকে আপন কল্যাণে আশিসমন্ডিত করছে, বরং রবুবিয়্যাত বৈশিষ্ট্য সব জীব-জন্তু, উদ্ভিদ, জড়বস্তু এককথায় আকাশ ও পৃথিবীর সব কিছুকে কল্যাণমন্ডিত করছে।” (সকল পশুপাখি, জীব-জন্তু, গাছপালা এবং অন্যান্য জড়বস্তু বরং গোটা বিশ্বে গ্রহ-নক্ষত্ররাজিসহ যা কিছু্‌ই আছে, সবই এত্থেকে কল্যাণ লাভ করছে)। “কোন কিছুই এর কল্যাণ বহির্ভূত নয়। এগুলো রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য থেকে পৃথক, কারণ সে পোষাক কেবল মানুষের বিশেষত্ব ।” (এমন একটি জিনিষ, এমন এক পোষাক, এরূপ এক পুরস্কার যা কেবল মানুষের জন্যই নির্ধারিত) “যদি মানুষ হয়ে এ বৈশিষ্ট্যকে কাজে না লাগায় তাহলে এমন মানুষ পশু বরং জড়বস্তুর সমতুল্য।” (যদি মানুষ রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্য থেকে কল্যাণমন্ডিত না হয় তাহলে সে মানুষ নয় বরং সে পশুর ন্যায় বরং জড়বস্তুর ন্যায়, পাথর, ইট এবং নুড়ির মত অর্থাৎ মৃতবৎ) “যেখানে খোদা তা’আলা কল্যাণ সাধনের জন্য চারটি বৈশিষ্ট্য নিজ সত্ত্বায় ধারণ করেছেন সেখানে রহীমিয়্যাত যা মানুষের দোয়ার সাথে শর্ত সাপেক্ষ তা বিশেষভাবে মানুষের জন্য নির্ধারিত করেছেন। সুতরাং এথেকে স্পষ্ট হয় যে, খোদা তা’আলার মধ্যে এমন এক প্রকার কল্যাণ রয়েছে যা দোয়ার সাথে সম্বন্ধযুক্ত আর দোয়া ছাড়া কোন ক্রমেই তা পাওয়া যায় না। এটি আল্লাহ্‌র সুন্নত এবং ঐশী রীতি যার ব্যত্যয় সম্ভব নয়। এ কারণেই নবীরা নিজ নিজ উম্মতের জন্য সর্বদা দোয়া করতেন..........। প্রকৃতপক্ষে দোয়ার ফলে অবশ্যই কল্যাণ বর্ষিত হয় যা আমাদেরকে মুক্তি দান করে। এরই নাম রহীমিয়্যাতের কল্যাণ যার মাধ্যমে মানুষ ক্রমোন্নতি করে থাকে। এ কল্যাণের ফলে মানুষ ওলীর পদমর্যাদায় উপনীত হয় আর খোদা তা’আলার উপর এমন বিশ্বাস স্থাপন করে যেন স্বচক্ষে দেখছে।” (আইয়মুস সুলেহ্‌, রূহানী খাযায়েন-১৪তম খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ২৪৯-২৫০)

আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদেরকে তাঁর রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের সঠিক জ্ঞান ও উপলব্ধি দান করুন এবং আমরা তাঁর অনুগ্রহে তা যেন নিজ জীবনে অবলম্বন করে এর উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে পারি যাতে আল্লাহ্‌ তা’আলার নিয়ামত ও অনুগ্রহরাজি থেকে অধিকমাত্রায় লাভবান হয়ে পুরস্কার প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হতে পারি।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে