In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর স্নেহ-মায়া ও দয়ার একান্ত ঈমান উদ্দীপক ঘটনাবলী

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২রা ফেব্রুয়ারী, ২০০৭ইং

“আল্লাহ্‌ তা’আলার রহ্‌মানিয়্যাত বৈশিষ্ট্য থেকে অংশ লাভ এবং মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নতের উপর প্রতিষ্ঠিত হবার কল্যাণে খোদার সৃষ্টির জন্য হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর স্নেহ-মায়া ও দয়ার একান্ত ঈমান উদ্দীপক ঘটনাবলীর হৃদয়গ্রাহী বিবরণ।”

“জামাতের সদস্যদের পরস্পরের মাঝে দয়ার প্রেরণা সৃষ্টি ও তা বৃদ্ধির তাগিদপূর্ণ উপদেশ।”

“মুহাম্মদী মসীহ্‌র দাসদের দায়িত্ব হচ্ছে তাঁর শিক্ষাকে কর্মে প্রতিফলিত করে খোদার সৃষ্টির প্রতি সহানূভুতির প্রেরণা নিয়ে এ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো।”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

মহানবী (সাঃ)-এর সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন এবং স্বীয় সাহাবাদেরকে এ উপদেশ প্রদান করা যে, রহমান খোদার রহমানিয়্যাত থেকে অংশ লাভের জন্য তোমাদেরকে পরষ্পরের সাথে এবং আল্লাহ্‌ তা’আলার সৃষ্টির প্রতিও সদয় ব্যবহার করা উচিৎ; গত খুতবায় আমি এ ব্যাপারে বিভিন্ন ঘটনা উপস্থাপন করেছি।

আজ আমি মহানবী (সাঃ)-এর নিষ্ঠাবান প্রেমিক হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করবো যা থেকে তাঁর (আঃ) হৃদয়ে খোদাতা’লার সৃষ্টির প্রতি যে দয়ার প্রেরণা ছিল আর সে কারণে অনেক সময় স্বয়ং নিজেকে কষ্টে নিপতিত করেও তিনি যে আদর্শ দেখিয়েছেন তার চিত্র কিছুটা ফুটে উঠে। এতই কর্ম ব্যস্ত ছিল তাঁর জীবন যার কোন সীমা নেই। ইসলামের নিরাপত্তাকল্পে সকল যুদ্ধ তিনি একাই লড়েন; বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে তিনি তা করেছেন। অপরদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের অপতৎপরতারও কোন সীমা ছিলনা; মামলা-মোকদ্দমাও ছিল। এত কিছু সত্বেও তিনি সদা সচেষ্ট থাকতেন, আমি যেন আল্লাহ্‌ তা’আলার সৃষ্টির জন্য, আপন-পর সবার জন্য মূর্তিমান দয়া হয়ে রই আর নিজ মনিব ও নেতা (সাঃ)-এর আদর্শ পূর্ণরূপে যেন অবলম্বন করতে পারি। তাঁর জীবনাদর্শের এ অধ্যায়ও আলোকোদ্ভাসিত ছিল, কারণ তিনি (আঃ) নিজ স্রষ্টা, নিয়ামতদাতা ও অনুগ্রহকারী খোদার কৃতজ্ঞ বান্দা হবার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন; যিনি তাঁকে ইলহাম পূর্বক বলেছেন,

‘গারাস্‌তু লাকা বিইয়াদী র‏হ্‌মাতী ওয়া কুদরাতী’

‘আমি নিজ হাতে তোমার জন্য স্বীয় ‘রহমত’ ও ‘কুদরত’ বপন করেছি’ (তাযকিরাহ্‌, চতুর্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠাঃ ৭২, রাব্‌ওয়া থেকে প্রকাশিত)

সুতরাং আল্লাহ্‌ তা’আলার হস্ত দ্বারা যে রহমতের চারা রোপিত হয়েছে খোদার সৃষ্টির প্রতি ভালবাসার দৃষ্টি প্রদান করে তিনি এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন না তা কি করে সম্ভব! অথচ আল্লাহ্‌ তা’আলা ইলহামে তাঁকে একথাও বলেছেন,

‘ইয়া আহমদু ফাযাতির্‌ রহ্‌মাতু আলা শাফাতাইকা’

‘হে আহমদ! তোমার ওষ্ঠ হতে রহমত প্রবাহিত হয়েছে।’ (তাযকিরাহ্‌, চতুর্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠাঃ ৭৩, রাব্‌ওয়া থেকে প্রকাশিত)

সুতরাং এ দয়া যেখানে আধ্যাত্মিক দিক থেকে রুগ্নদের জন্য তাঁর (আঃ) হৃদয়ে বেদনা সৃষ্টি করেছে, যে কারণে তিনি সর্বদা দোয়া ও চেষ্টায় রত থাকতেন সেখানে আল্লাহ্‌ তা’আলার সৃষ্টির দৈহিক ও জাগতিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেও তিনি (আঃ) সব সময়, প্রতিটি মূহুর্ত দোয়া ও পরিকল্পনায় নিয়োজিত থাকতেন।

এখন আমি সেসব ঘটনা বর্ণনা করছি যদ্বারা স্পষ্ট হবে যে, তিনি (আঃ) কিভাবে সৃষ্টি সেবা করতেন আর তাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তাঁর হৃদয়ে কতটা বেদনা ছিল।

হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রাঃ) বর্ণনা করেন,

কাদিয়ানবাসী জনৈক লালা শরমপত রায় যিনি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কাছে তাঁর দাবীর পূর্বেও যাতায়াত করতেন। তিনি তাঁর (আঃ) অনেক নিদর্শনের সাক্ষী ছিলেন। একদা তিনি অসুস্থ হন; ইরফানী সাহেব (রাঃ) বলেন এর পূর্বেই হিজরত করে আমার কাদিয়ানে আসার সৌভাগ্য হয়। তার পেটের উপর একটি ফোঁড়া বেরিয়েছিল যার মূল বেশ গভীরে ছিল। সেই ফোঁড়া ভয়াবহ আকৃতি ধারণ করে। হযরত আকদাস (আঃ)-এ সংবাদ অবগত হন। তিনি (আঃ) স্বয়ং লালা শরমপত রায়ের গৃহে গেলেন , যেটি ছিল ছোট্ট সংকীর্ণ অন্ধকার এক ঘর; অধিকাংশ বন্ধুরাও তাঁর সাথে ছিলেন। ইরফানী সাহেব (রাঃ) বলেন, আমিও সাথে ছিলাম। যখন তিনি (আঃ) লালা শরমপত রায়কে দেখেন তখন সে ব্যক্তি চরম উৎকন্ঠিত ও হতবিহ্বল ছিল আর তার বদ্ধমূল ধারণা জন্মে যে, আমার মৃত্যু অত্যাসন্ন; এবং তিনি চরম উৎকন্ঠা নিয়েই কথা বলছিলেন যেমনটি কিনা মানুষ মৃত্যুর সময় করে থাকে। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) তাকে শান্তনা প্রদান করেন, ভয় পেও না। আব্দুল্লাহ্‌ সাহেব নামের একজন ডাক্তার ছিলেন; হযরত আকদাস বলেন, আমি তাঁকে নিযুক্ত করছি, তিনি ভালোভাবে চিকিৎসা করবেন। পরের দিন হযরত আকদাস ডাক্তার সাহেবকে সাথে নিয়ে যান আর তাঁকে লালা শরমপত রায়ের চিকিৎসার কাজে বিশেষভাবে নিযুক্ত করেন। চিকিৎসার খরচ বা বোঝা লালা সাহেবের উপর চাপান নি। প্রত্যেক দিন তিনি (আঃ) তাকে দেখতে যেতেন।

যখন ক্ষত শুকানো আরম্ভ হয় আর তার নাজুক অবস্থার উন্নতি হয় তখন তিনি (আঃ) বিরতি দিয়ে যাওয়া আরম্ভ করেন আর ততদিন পর্যন্ত তাকে দেখতে যাওয়া অব্যাহত রাখেন যতদিন তিনি পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন নি। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ১৬৯-১৭০)

পুনরায় ইরফানী সাহেব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে,

ক���দীয়ানের আর্য সমাজীদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি ছিলেন মেহের হামেদ যিনি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর হাতে বয়আত করেছিলেন এবং এখনও খোদাতা’লার কৃপায় তাঁর বংশধররা নিষ্ঠাবান আহ্‌মদী। (এখনও হবেন ইনশাআল্লাহ্‌‌) মেহের হামেদ আলী সাহেব অত্যন্ত বিনয়ী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন আর তার বাসস্থান কাদীয়ানের বাইরে এমন স্থানে অবস্থিত ছিল যেখানে গ্রামের ময়লা-আবর্জনা ও অন্যান্য বর্জ্য স্তুপীকৃত করা হতো। সে স্থানটি ছিল অতি দুর্গন্ধময় আর কিষাণদের ঘর-দোর এমনই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, তার বাড়ী-ঘরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কোন বালাই ছিল না। গবাদি পশুর গোবর এবং এ ধরনের অন্যান্য আবর্জনা যত্রতত্র পড়ে থাকতো যা তারা সার হিসেবে ব্যবহার করতো। যাহোক, সেস্থানেই তিনি বসবাস করতেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন আর সে রোগই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।

হযরত আকদাস (আঃ) বহুবার কাদিয়ানে অবস্থিত স্বীয় সাথীদের নিয়ে তাকে দেখতে গিয়েছেন আর স্বভাবতই দুর্গন্ধের ফলে অনেকের মারাত্মক কষ্ট হতো এবং হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) স্বয়ংও কষ্টই অনুভব করতেন বরং যথেষ্ট কষ্ট পেতেন। ইরফানী সাহেব (রাঃ) লিখেন, এর কারণ হলো প্রকৃতিগতভাবেই এ সত্তা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা প্রিয় ছিলেন তথাপি ইশারা-ইঙ্গিতেও কখনও তা প্রকাশ করেন নি আর সে কষ্ট তাঁকে (আঃ) তার খবরাখবর নেয়ার জন্য সেখানে যাওয়া থেকে কখনও বিরত রাখতে পারেনি। তিনি (আঃ) যখন যেতেন তখন তার সাথে একান্ত স্নেহ ও ভালবাসাপূর্ণ কথাবার্তা বলতেন। তার রোগ এবং কষ্ট সম্পর্কে দীর্ঘক্ষণ ধরে খোঁজ-খবর নিতেন, আশ্বস্ত করতেন, ঔষধ-পথ্যাদীও বাতলিয়ে দিতেন এবং আল্লাহ্‌র প্রতি মনোনিবেশেরও উপদেশ প্রদান করতেন। ইরফানী সাহেব বলেন, সামাজিক পদমর্যাদায় তিনি একজন সামান্য কৃষক ছিলেন আর একথা বলাও খুবই যুক্তি সংগত যে, তাঁদের {মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)} জমি-জমা চাষবাস করার কারণে তিনি তাঁদের প্রজাদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি (আঃ) কখনই অহংকার আর আত্মম্ভরিতা পছন্দ করতেন না। তার কাছে যেতেন আর নিজের একজন প্রিয় ভাই মনে করেই যেতেন এবং কথা-বার্তা বলতেন, তার চিকিৎসায় আগ্রহ প্রকাশ করতেন যা দেখে অন্যরাও সুস্পষ্টভাবে বলেছে, যেভাবে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) তাঁর দেখাশোনা করেছেন কেউ নিজ আত্মীয়-স্বজনেরও এভাবে দেখাশোনা করেনা। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ১৭২-১৭৩)

হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রাঃ) পুনরায় লিখেন,

যদিও তিনি (আঃ) রোগীর সেবা-শুশ্রূষার জন্য যেতেন কিন্তু এটিও একটি বাস্তব বিষয় যে, খোদাতা’লা তাঁর হৃদয়কে সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি এবং সহমর্মিতায় যেখানে দৃঢ় ও অবিচল করেছেন সেখানে সৃষ্টির ভালবাসা ও তাদের কষ্টকে অনুভব করার ক্ষেত্রেও তাঁর হৃদয় এত স্পর্শকাতর ছিল যে, তিনি তাঁর আন্তরিক বন্ধুদের কষ্ট সইতে পারতেন না আর আশংকা হতো, কষ্টের সময় যদি তিনি তাদের কাছে যান তাহলে তাঁর শরীর না আবার খারাপ হয়ে যায়। তাই অনেক সময় রোগী দেখার জন্য তিনি নিজে যেতেন না অন্যদের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিতেন অর্থাৎ ডাক্তার-চিকিৎসকের মাধ্যমে অবস্থা জেনে নিতেন এবং রোগীর আত্মীয়-পরিজনের মারফতে সান্তনাবার্তা পাঠাতেন আর ক্ষেত্র বিশেষে নিজ হৃদয়ের এ কোমলতার কথা তিনি প্রকাশও করেছেন। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ১৮৬)

অতএব দেখুন! প্রচন্ড ব্যস্ত হওয়া সত্বেও, কারো খবরাখবর নেয়া বা দেখতে যেতে এবলে অপারগতা প্রকাশ করেন নি যে, সময় নেই, ব্যস্ততা, বরং সৃষ্টির প্রতি সহমর্মিতা ও কষ্টের কথা ভেবে তাঁর (আঃ) নিজের শরীর খারাপ হয়ে যেতো! সুতরাং এ ছিল পরম মমতা যদ্বারা তাঁর হৃদয় পরিপূর্ণ ছিল।

তাঁর এক শিষ্যের অসুস্থতার সময় লিখিত একটি চিঠিতেও বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। এ সম্পর্কে ইরফানী সাহেব (রাঃ) লিখেন,

‘মরহুম আইয়্যুব সাদেক সাহেব একান্ত নিষ্ঠাবান ও উদ্যমী একজন আহ্‌মদী ছিলেন (অর্থাৎ মির্যা আইয়্যুব বেগ সাহেব)। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে তার গভীর ভালবাসার সম্পর্ক ছিল। তিনি অসুস্থ্য হন আর সে রোগেই পরিশেষে তিনি তাঁর পরম প্রভুর সমীপে প্রত্যাবর্তণ করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি তার ভাই ডাক্তার মির্যা ইয়াকুব বেগ সাহেবের সাথে ফায্‌লেকায় অবস্থান করেন এবং হযরত আকদাস এর সাথে ভালবাসা প্রবলরূপ ধারণ করলে তিনি হযরতকে দেখার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য আসা ছিল একেবারেই অসম্ভব কারণ সফর করার মত শক্তি তার ছিলনা অন্যদিকে আবেগও ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি হযরত আকদাস (আঃ)-কে চিঠি লিখেন, ফায্‌লেকায় এসে সাক্ষাত দিয়ে যান (হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কে লিখেছেন, আপনি এখানে এসে আমার সাথে দেখা করে যান)। হুযূরের দর্শন লাভের জন্য আমার মন ছটফট করছে; এরপর একই বিষয় সম্বলিত একটি টেলিগ্রামও পাঠান। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) উত্তরে তাঁকে যা লিখেন তাত্থেকে তাঁর হৃদয়ে যে কোমলতা ছিল সেই কোমলতর স্বভাবই সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি (আঃ) চিঠিতে মির্যা আইয়্যুব বেগ সাহেবকে লিখেনঃ

প্রিয়, স্নেহভাজন মির্যা আইয়্যুব বেগ সাহেব এবং ইয়াকুব বেগ সাহেব,

“আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া র‏হ্‌মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

বর্তমানে আমি মাথাব্যথা এবং মৌসুমী জ্বরে প্রচন্ডভাবে আক্রান্ত। আমি টেলিগ্রাম পেয়েছি আর কিভাবে যে প্রিয় মির্যা আইয়্যুব বেগ এর জন্য দোয়াতে নিমগ্ন রয়েছি তা কেবল খোদাই ভালো জানেন। খোদাতা’লার রহমত সম্পর্কে কোন ভাবেই নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আমি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেও আসতে দ্বিধা করতাম না তবে এমন প্রিয়ভাজনকে কষ্টে নিপতিত দেখা আমার পক্ষে অসহনীয়। আমার হৃদয় অল্পতেই দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সুস্থ্য অবস্থায় আর সুস্বাস্থ্যে দেখাই আমার কাম্য। মানবীয় শক্তিতে যতটা কুলায় এখন আমি তারও চেয়েও বেশি চেষ্টা করবো। আমাকে পাশে এবং নিকটে জানবেন, দূরে নয়। এ বেদনা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। খোদার রহমত থেকে কোন ভাবেই নিরাশ হবেন না। খোদা পরম স্নেহশীল এবং মহাদানের অধিকারী। তাঁর শক্তি, অনুগ্রহ এবং করুণার কাছে অসম্ভব কিছু নয় যে প্রিয় আইয়্যুব বেগ সাহেবকে সত্ত্বর সুস্থ্য দেখবো। এ রোগের সময় তারবার্তা পেয়ে আমি এতটাই উদ্বেগাকুল হয়েছি যে, আমার হাত থেকে কলম খসে পড়ছে (অর্থাৎ এতটাই উৎকন্ঠিত কলমও ধরে রাখতে পারছি না)। আমার সহধর্মীনিও আইয়্যুব বেগ এর জন্য একান্ত উৎকন্ঠিত (হযরত আম্মাজান (রাঃ) সম্পর্কে লিখেছেন)। এখন তাঁকেও আমি এ টেলিগ্রামের সংবাদ দিতে পারছি না কেননা গতকাল থেকে তিনিও জ্বরে আক্রান্ত সাথে গলাব্যথায়ও ভূগছে। অনেক কষ্টে কিছু গিলতে পারছেন আর ব্যাথার তীব্রতায় জ্বরও এসে গেছে। তিনি নীচ তলায় পড়ে আছেন আর আমি উপর তলায়। আমার কিছু লেখার মত অবস্থা ছিল না কিন্তু টেলিগ্রামের বেদনাবিধূর প্রভাব আমাকে এখন উঠিয়ে বসিয়েছে। প্রতিদিন আমাকে সংবাদ পাঠাতে আপনার অসুবিধা রয়েছে কি? আমি যে এক বোতল ঔষধ পাঠিয়েছি জানি না তা পৌঁছেছে কি-না, রেলে পার্সেল করেছিলাম। জানিনা প্রতিদিন মালিশ করা হচ্ছে কি-না? (এসব কিছুই সান্তনা ছিল) আপনি আমাকে প্রতিটি মূহুর্ত সম্পর্কে অবহিত রাখুন, নিশ্চিৎ জানুন খোদা মহা পরাক্রমশালী। প্রবোধ দিতে থাকুন। প্রতিদিন বাচ্চা মুরগীর স্যুপ দিন। মনে হয় প্রচন্ড দূর্বলতাই দাস্ত’র কারণ।”

ওয়াস্‌সালাম

মির্যা গোলাম আহমদ

(হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ১৮৭-১৮৮)

দেখুন! অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে স্বয়ং যাওয়া সম্ভব ছিল না। রোগের সময় এমনিতেই মানুষ স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। নিজের এ অবস্থায় অসুস্থ্য কাউকে দেখা তিনি (আঃ) সহ্য করতে পারতেন না। আর অসুস্থ্যও সেই ব্যক্তি, যিনি তাঁর (আঃ) একান্ত প্রিয়ভাজন; এ অবস্থায় তিনি স্নেহভাজন রোগীর জন্য দোয়াকে পরম পর্যায়ে পৌঁছিয়েছেন আর বল্‌ছেন, প্রত্যহ আমাকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবহিত কর।

হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রাঃ) লিখেনঃ

‘যেখানে এটি তাঁর অভ্যাসের অন্তর্গত ছিল যে, তিনি কোনও যাচনাকারীকে ফিরিয়ে দিতেন না তদ্রূপ এটিও তাঁর রীতি ছিল যে, অনেকের প্রয়োজন অনুমান করে চাওয়ার পূর্বেই তিনি তাদেরকে সাহায্য করতেন। ২৮শে অক্টোবর, ১৯০৪ এর প্রত্যুষে ফজরের নামাযের পূর্বে তিনি (আঃ) একজন মুহাজিরকে ৮ অথবা ১০ রুপী দিয়ে বলেন, এখন শীতকাল, আপনার গরম কাপড়ের প্রয়োজন হবে। এই মুহাজিরের পক্ষ থেকে কোন আবেদন ছিল না, স্বয়ং হুযূর (আঃ) তার প্রয়োজন অনুধাবন করে এ অর্থ তাকে প্রদান করেন। তিনি লিখেন, কেবল একটি ঘটনাই নয় বরং অসংখ্যবার এমনটা ঘটেছে যে, তিনি (আঃ) সচরাচর দরিদ্রদের সাথে গোপনে এরূপ ব্যবহারই করতেন। এক্ষেত্রে শত্রু-মিত্র, হিন্দু-মুসলমানের কোন তারতম্য ছিল না। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ২৯৮-২৯৯)

এ হলো রহমান খোদার সেই বৈশিষ্ট্য যা বর্তমান কালে মহানবী (সাঃ)-এর সত্যিকারের প্রেমিক সেই রহ্‌মাতুল্লিল আলামীন এর অনুকরণে নিজ জীবনে অবলম্বন করেছেন এবং এ দৃষ্টান্তস্থাপন করেছেন যে, না চাইতেই দেয়া উচিত।

অনুরূপভাবে আরেকটি ঘটনা আছে যা ইরফানী সাহেবই লিপিবদ্ধ করেছেন,

এটি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আরেকটি রীতি ছিল। প্রায়শই তিনি কারো অভাব বা প্রয়োজন অনুধাবন করলে সে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হাতপাতা বা চাওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন না বরং নিজ থেকেই প্রদান করতেন। তিনি লিখেন, কাশ্মীর রাজ্যের অবসর প্রাপ্ত ইন্সপেক্টর মোকাররম শেখ ফাতেহ্‌ মুহাম্মদ সাহেব দীর্ঘ দিন যাবত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। তিনি বর্ণনা করেন, যখনই আমি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কাছে আসতাম (তখনই) আমার যাতায়াত ভাড়া দেয়ার জন্য তিনি (আঃ) উঠে পড়ে লাগতেন। আমার যেহেতু প্রয়োজন ছিল না তাই আমি কখনই নেই নি। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসতেন আর হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) যাতায়াত ভাড়া দিতেন! কিন্তু তিনি বলেন, আমি নিতাম না। কিন্তু হযরত (আঃ)-এর উদারতার মান এতই মহান ছিল যে, তিনি না চাইতেই সর্বদা দিতেন আর এ ব্যবহার কেবল আমার সাথেই ছিল না বরং অধিকাংশ লোকদেরই তিনি তা দিতেন। কেবল নিকট থেকে আগতদের জন্যই নয়, সিরিয়া এবং আরব থেকেও অনেকেই আসতেন যাদেরকে তিনি (আঃ) অনেক সময় পথ খরচ হিসেবে বেশ বড় অংকের অর্থ প্রদান করতেন, কেননা হুযূর (আঃ) জানতেন, তারা দূরদেশ থেকে এসেছেন। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ৩১৯)

ইরফানী সাহেব আবারো লিখেন, তাঁর (আঃ) চিরাচরিত রীতি ছিলো, তিনি (আঃ) লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কাউকে কিছুদিতেন না। কেবল খোদাতা’লার সন্তুষ্টির জন্য এবং আল্লাহ্‌র সৃষ্টির প্রতি স্নেহপরায়নতার বশবর্তী হয়ে দান করতেন। একারণে তিনি সচরাচর একান্ত গোপনীয়তার সাথে দান করতেন, কখনও কখনও অন্যদেরকে অনুপ্রাণিত করার জন্য বা অন্যদেরকে শিখানোর জন্য প্রকাশ্যেও দিতেন, দু’ভাবেই খোদাতা’লার নির্দেশ রয়েছে। গোপনে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি এমন ছিল এবং এমনভাবে দিতেন যে স্বয়ং গ্রহীতাও তা কদাচিৎ জানতে পারতো।

তিনি বলেন,

এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করছি। ‘মুনশী মুহাম্মদ নছীব সাহেব সম্পূর্ণ এতিম অবস্থায় কাদিয়ানে এসেছিলেন। হযরত আকদাসের দয়া-দাক্ষিণ্যে তিনি কাদিয়ানে থেকে শিক্ষা অর্জন করেন। তার যাবতীয় ব্যয়ভার আর সব প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব ছিল জামাতের উপর। যৌবনে উপনীত হয়ে তিনি বিয়ে করেন আর লাহোরের একটি পত্রিকা অফিসে লিপিকারের কাজ নেন। তারপর কাদিয়ানের ‘বদর’ পত্রিকার অফিসে মাসিক ১২রুপী বেতনে কর্মচারী নিযুক্ত হন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ সানী (রাঃ)-কে যখন আল্লাহ্‌ তা’আলা নাসির আহমদ নামে প্রথম সন্তান দান করেন (কিছু দিন পরে যিনি মারা যান) তখন হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর মরহুম (পৌত্র) নাসীর আহমদের জন্য একজন ‘আন্না’র প্রয়োজন দেখা দেয় (এমন মহিলা যাকে দুধমাতা হিসেবে রাখা হয়)। ইয়াকুব আলী সাহেব বলেন, আমি শেখ মুহাম্মদ নছীব সাহেবকে বলি, এ সময়ে তুমি তোমার স্ত্রী’র সেবা পেশ করো। একই সাথে নিজের কাজও হবে আর পুণ্যের ভাগীও হবে (অর্থাৎ খাদ্যপানীয় ও বাসস্থানের ব্যবস্থা একই সাথে জুটবে)। শেখ সাহেব আমার পরামর্শকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। তিনি এ সুযোগ লাভ করেন আর তাঁর স্ত্রী সাহেবজাদা নাসীর আহমদ সাহেবকে দুধ পান করানোর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। এ প্রসঙ্গে কথায় কথায় হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, শেখ মুহাম্মদ নছীব কত বেতন পান? যখন তিনি (আঃ) জানতে পারেন, মাত্র ১২ রুপী বেতন পান তখন তিনি (আঃ) ভাবলেন, এত অল্প বেতনে সম্ভবত চলে না। যদিও তখনকার বাজারে তা যথেষ্ট ছিল। ইয়াকুব সাহেব লিখেন, জিনিস পত্রের দাম কম আর সস্তার যুগ ছিল; কিন্তু হযরত আকদাস (আঃ) এটি অনুভব করেন এবং একদিন যেতে যেতে তার কক্ষে ২০-২৫ রুপীর একটি থলে ছুঁড়ে দেন। শেখ সাহেব ভাবলেন জানি না এই রুপী কিভাবে কোত্থেকে এল? পরিশেষে অনেক খোঁজ-খবর নেয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আকদাস (আঃ) তাঁর অসচ্ছলতার কথা ভেবে এমনভাবে সেখানে রূপী রেখে দেন যেন তাঁর কোন কষ্ট না হয় এবং যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারেন। ইরফানী সাহেব লিখেন, তাঁর প্রয়োজন ছিল না, সম্ভবত সে অর্থ দিয়ে তার স্ত্রী গহনা বানিয়েছেন। কেননা দুধ পান করানোর কারণে খাদ্য-পানিয়ের সংস্থানতো হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর ঘর থেকেই হতো।’ (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনি, পৃষ্ঠাঃ ৩০৪-৩০৬)

ইরফানী সাহেব আরও লিখেন,

‘কাদিয়ানে নেহাল সিং নামে একজন গোঁয়াড় প্রকৃতির কৃষক ছিল। যৌবনে সে সেনাবাহীনিতে চাকুরী করত কিন্তু তখন পেনশনে ছিল। তার বাসগৃহ হযরত খাঁন বাহাদুর মির্যা সুলতান আহমদ সাহেবের বৈঠক খানার দেয়ালের সাথে লাগোয়া অর্থাৎ একই সাথে যুক্ত ছিল। সে জামাতের ঘোরবিরোধী শত্রু ছিল আর তার প্ররোচনায় হযরত হাকীমুল উম্মত এবং অন্যান্য আহ্‌মদীদের বিরুদ্ধে ভয়ানক সব মিথ্যা মামলা হয়েছিল। হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ) এবং অন্যান্যের বিরুদ্ধেও সে মিথ্যা মামলা করিয়েছিল। সর্বদা অন্যদের সাথে মিলে আহ্‌মদীদের নির্যাতন করতো আর গালি-গালাজ করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। মামলা চলাকালীন সময়ে তার ভাতিজা শানতা সিং এর স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে মৃগনাভী’র প্রয়োজন দেখা দেয়। এহেন অসুস্থতার সময় এ মূল্যবান বস্তুটি ছিল দুষপ্রাপ্য। কস্তুরী এমনিতেই অনেক দামী আর তখন পাওয়াও যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় সে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর দ্বারে গিয়ে কস্তুরীর জন্য হাত পাতে। তার ডাকে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) দ্রুত বেরিয়ে আসেন আর তাকে সামান্য অপেক্ষা না করিয়েই চাহিদা শোনা মাত্র তৎক্ষণাৎ গৃহাভ্যন্তরে যান আর বলে যান যে, দাঁড়াও এখনই আনছি। অনুরূপভাবে তিনি (আঃ) ঔষধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় অর্ধ তোলা কস্তুরী নিয়ে এসে তার হাতে দেন।’ (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী (রাঃ) সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ৩০৬)

দেখুন! তিনি (আঃ) আদৌ ভাবেন নি, যার প্রয়োজন পড়েছে সে কে? শত্রুতা করে কি-না? এটি তার নিজ কর্ম; একজন রোগীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঔষধের প্রয়োজন পড়লে কালক্ষেপণ না করে দয়ার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে ঔষধ এনে দেন। প্রতিশোধ নেয়া বা মোকদ্দমা প্রত্যাহারের কোন প্রশ্ন তিনি উঠান নি।

হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী (রাঃ) বলেন,

লুধিয়ানার পশমী কাপড় ব্যবসায়ী হাফেজ্ব নূর আহমদ সাহেব (রাঃ) হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর পুরোনো নিষ্ঠাবান সেবকদের একজন। একবার ব্যবসায় তাঁর মারাত্মক লোকসান হয় আর ব্যবসা প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। তিনি কোনভাবে অন্যত্র গিয়ে অন্য কোন ব্যবসা করতে চাচ্ছিলেন যেন নিজের আর্থিক দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেন। তখন তিনি চলে যান আর অনেক বছর পর যে যুগে এটি লিখা হচ্ছিল তখন তিনি ফিরে আসেন। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবদ্দশায় সর্বদা তাঁর সাথে চিঠি-প্রত্রের আদান প্রদান ছিল আর নিজে সাধ্যাতীত ভাবে জামাতের আর্থিক খিদমত করতেন। ইরফানী সাহেব (রাঃ) যখন একথা লিখছেন সে সময় তিনি কাদিয়ানে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর দান-দক্ষিণা এবং বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে আমি কেবল একটি কথাই বলবো, তাহলো, তিনি অল্প দেয়া জানতেনই না। ব্যক্তিগত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যখন আমি এ সফরের সংকল্প করলাম তখন হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর কাছে কিছু রুপী চাইলাম। হুযূর একটি ছোট সিন্দুক নিয়ে আসেন যাতে রূপী রাখতেন এবং আমার সম্মুখে রেখে বল্লেন ‘যত ইচ্ছে নিয়ে নাও’ আর এতে হুযুর পরম আনন্দিত ছিলেন। আমি আমার প্রয়োজন অনুযায়ী যতটা দরকার ছিল তা সেই সিন্দুক থেকে বের করে নেই যদিও হুযূর বারবার বলছিলেন, ‘পুরোটাই নিয়ে নাও’।

হযরত মৌলভী আব্দুল করীম সাহেব লিখেন,

অনেক সময় ঔষধ নেয়ার জন্য গ্রাম্য মহিলারা এসে সজোরে দরজায় কড়াঘাত করতো। সহজ-সরল গ্রাম্য ভাষায় বলতো, মির্যা জ্বী! একটু দরজা খোল। ডাকশুনে হুযূর এমনভাবে উঠে দাঁড়াতেন যেন কোন মহিমান্বিত মান্যবর নেতার নির্দেশ এসেছে, অর্থাৎ নামজাদা কোন বাদশা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন আর তিনি তাঁর আনুগত্য করছেন! দ্রুত এসে দরজা খুলতেন আর হাসিমুখে সানন্দে কথা-বার্তা বলতেন আর ঔষধ বলে দিতেন। মৌলভী আব্দুল করীম সাহেব লিখেন, আমাদের দেশে সময়ের মূল্য শিক্ষিত শ্রেণীও বুঝে না আর গ্রামের মানুষতো সময় আরো বেশি নষ্ট করে, এখনও অবস্থা তদ্রুপই। এক মহিলা অনর্থক কথা-বার্তা বলতে থাকে, নিজ ঘরের সুখ-দুঃখ এবং শাশুড়ি-ননদের কথা বলতে শুরু করে। ঘন্টাখানেক সময় এতেই নষ্ট করে ফেলে। এসেছে ঔষধ নিতে অথচ গল্প জুড়ে দিয়েছে আর তিনি (আঃ) ধৈর্য্য ও গাম্ভির্যের সাথে বসে থেকে তা শুনে যাচ্ছেন। মুখে বা ইঙ্গিতেও বলেন নি যে, চলে যাও, ঔষধ জেনে নিয়েছ এখন আবার কি কাজ, আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে; অবশেষে মহিলা দেখে যে, অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে তাই তাড়াহুড়ো করে সে নিজেই ফিরে যায় আর ঘরও দুর্গন্ধ মুক্ত হয়।

একদা বেশ কয়েক জন গ্রাম্য মহিলা তাদের সন্তানদের (মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কে) দেখাতে নিয়ে আসে, সে সময় অন্দর মহল থেকেও কয়েকজন মহিলা মিষ্টি শরবতের আশায় গ্লাস হাতে নিয়ে সেখানে হাজির হয় যদিও তখন তাঁকে (আঃ) ধর্মীয় প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রবন্ধ লিখতে হচ্ছিল; আমিও ঘটনাক্রমে সেখানে পৌঁছলাম। হঠাৎ করে দেখি, হযরত (আঃ) নিশ্চল ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন যেভাবে ইউরোপবাসীরা জাগতিক ডিউটি প্রদানের সময় সদা-সতর্ক ও চৌকস দন্ডায়মান থাকে; আর পাঁচ-ছয়টি বাক্স খুলে রেখে ছোট ছোট শিশি-বোতল থেকে একেক জনকে একেক প্রকারের শরবত দিচ্ছেন। প্রায় তিন ঘন্টা যাবত এ বাজার চলতে থাকে আর হাসপাতালও খোলা থাকে। সুযোগমত আমি নিবেদন করলাম, হুযূর এটিতো বড়ই কষ্টদায়ক কাজ আর এভাবে অনেক মূল্যবান সময়ও নষ্ট হচ্ছে। খোদার কসম! তিনি আমাকে অভূতপূর্ব সন্তুষ্ট চিত্তে প্রশান্তির সাথে উত্তর দিলেন, এটিওতো সেরূপই ধর্মীয় কাজ। এরা হতদরিদ্র মানুষ, কোন হাসপাতালও নেই, আমি তাদের জন্য সবধরনের এ্যালোপ্যাথী আর ইউনানী ঔষধ সংগ্রহে রাখি যাতে সময়মত তা কাজে লাগে। তিনি আরো বলেন, এটি বড়ই পুণ্যের কাজ। সে-ই মহিলাদের জন্য তিন ঘন্টা সময় নষ্ট হয়েছে অথচ তিনি তখন একটি পুস্তক রচনায় ব্যস্তছিলেন যা দ্রুত লিখবারও প্রয়োজন ছিল। এতদসত্বেও তিনি সে কাজ পরিত্যাগ করে তাদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। বলেন, এটি অনেক বড় পুণ্যের কাজ, মু’মিনের এসব ক্ষেত্রে অলস ও উদাসীন হওয়া উচিত নয়। আমি শিশুদের উল্ল্যেখ করেছি বটে, তবে আয়া-সেবিকাদের ব্যাপারেও তাঁর (আঃ) রীতি এটিই ছিল। একজন বারংবার আসে আর কাংখিত জিনিষের দাবী জানায় এবং একই জিনিস বারবার চাইতে থাকে। একবারও তিনি বলেন নি, দুর্ভাগা বিরক্ত করে কেন, যা কিছু নেয়ার একবারেই কেন নিয়ে যায় না। অনেকবার আমি দেখেছি, তাঁর নিজের সন্তান ও অন্যান্য বাচ্চারা তার খাট দখল করে আছে আর তাঁকে খাটের পায়ের দিকে বসতে বাধ্য করেছে এবং তাঁকে শিশুসুলভ ভাষায় ব্যাঙ, কাক ও পাখির গল্প শোনাচ্ছে আর ঘন্টার পর ঘন্টা শুনিয়েই যাচ্ছে; হযরত সাহেব অত্যন্ত আনন্দের সাথে তা শুনে যাচ্ছেন অর্থাৎ শিশুরা প্রত্যেকে নিজস্ব ভঙ্গিতে গল্প শোনাচ্ছে আর হযরত সাহেব এমন ভাবে শুনছেন যেন কেউ আল্লামা রুমীর ‘মসনবী’ শোনাচ্ছে। হুযূর শিশুদের মার-ধর করা বা বকা-ঝকার কঠোর বিরোধী ছিলেন। শিশু যতই কান্নাকাটি করুক, ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করুক, প্রশ্ন করে বিরক্ত করুক, অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করুক এবং কাল্পনিক এবং অস্তিত্বহীন বস্তুর বায়না ধরে সীমাহীন বাড়াবাড়ি করুক না কেন তিনি কখনো মারতেন না আর বকাঝকাও করতেন না আর রাগের কোন লক্ষণও প্রকাশ করতেন না।’ (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী (রাঃ) সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ৩০৬)

ঔষধের কথা উল্ল্যেখ করতে গিয়ে আমি প্রথমেও একবার বলেছি, আমাদের ডাক্তারদেরও এ আদর্শ নিজেদের সামনে রাখা আবশ্যক; তারা অন্যকোন কাজ পরিত্যাগ করে এ কাজ করছে না, তাই তাদের কর্তব্যই হলো রোগীদের দেখাশোনা করা। একজন ডাক্তারের জন্য সর্বদা রোগীদের আবেগ-অনুভূতির প্রতি সুদৃষ্টি রাখা এবং উত্তম ব্যবহার করা একান্ত আবশ্যক আর বিশেষভাবে জীবন উৎসর্গকারী ডাক্তারদের জন্য এটি একান্তই আবশ্যক কেননা অর্ধেক রোগ রোগীর সাথে সুন্দরভাবে কথা বলার ফলে দূর হয়ে যায়। তাই এদিকেও গভীর মনযোগ দেয়া প্রয়োজন।

অনেকে আবার তাঁর (আঃ) সহানুভূতি আর দয়ার প্রেরণার সুযোগও নিত। হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রাঃ) একটি ঘটনা বর্ণনা করেন,

অমৃতসরের মুনশী গোলাম মুহাম্মদ একজন দক্ষ লিপিকার ছিলেন। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) শুরুতে অমৃতসরের মুনশী ইমাম উদ্দিনকে দিয়ে লিখানোর কাজ করাতেন। বারাহীনে আহ্‌মদীয়ার প্রথম তিন খন্ড, শাহনায়ে হক, সূরমা চশমায়ে আরিয়া প্রভৃতি তার দ্বারাই লেখানো হয়েছে। আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম পুস্তকের একটি বৃহদাংশও তিনি লিখেছেন। কিন্তু এরপর তিনি মুনশী গোলাম মুহাম্মদকে দিয়ে কাজ করাতেন। তিনি (রাঃ) বলেন, মুনশী গোলাম মুহাম্মদ সাহেবও বড় ভান করতেন। বিভিন্ন ভাবে নির্ধারিত বেতনের চেয়ে তিনি বেশী আদায় করে নিতেন। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) সবকথাই বুঝতেন কিন্তু হেসে তা উড়িয়ে দিতেন। শেখ সাহেব বলেন, একবার তিনি মসজিদে জোহরের নামায আদায়ের জন্য আসেন এবং হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) নামাযান্তে কিছুক্ষনের জন্য বসলেন। তাঁর (আঃ) এটিই রীতি ছিল, সাধারণত ফরয আদায় করে চলে যেতেন আবার কোন কোন সময় বসতেনও। তিনি (আঃ) হাসলেন বরং একটু বেশিই হেসে বললেন আজ অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছে। আমি লিখছিলাম তখন মুনশী গোলাম মুহাম্মদ সাহেবের ছেলে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে আর মুনশী সাহেবও জুতা হাতে নিয়ে চিৎকার করতে করতে পিছু ধাওয়া করেন আর বলছিলেন যে, বাইর��� বেরো, আমি তোকে মেরেই ফেলবো, প্রাণে মেরে ফেলবো এবং এই করবো সেই করবো। হযরত আকদাস (আঃ) এত চেঁচামেচিঁ শুনে বাইরে এসে মুনশী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন, কি হয়েছে? মুনশী সাহেব বলতেই থাকেন, না আজ আমি ওকে মেরেই ফেলবো। অবশেষে, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, বলতো আসলে কি হয়েছে? তখন তিনি বলেন, আমি ওকে নতুন জুতো কিনে দিয়েছিলাম আর সে তা হারিয়ে ফেলেছে। হুযূর (আঃ) হেসে বলেন, মুনশী সাহেব এতে এত চেঁচামেচির কি আছে? আমি জুতো কিনে দেবো।

প্রকৃতপক্ষে জানা নেই যে, মুনশী সাহেব আদৌ নতুন জুতো কিনেছিলেন কি-না তবে ছেলেকে নতুন জুতো প্রদানের উদ্দেশ্য ছিল তাই এত হৈ-চৈ করেছেন।

তিনি লিখেন, তার আচার-আচরণ খুবই অদ্ভুত ছিল; বেতন-ভাতা ছাড়াও খোরাকী ইত্যাদির খরচও তিনি (আঃ) দিতেন। খাবারও হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর ঘর থেকেই খেতেন। তারপর কাপড়-চোপড় এবং শীতকালীন বিছানাপত্র, গরম কোট প্রভৃতিও নিতেন। তাসত্ত্বেও কথায় কথায় বিভিন্নভাবে বাড়তিও আদায় করতেন কিন্তু হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) কখনই অসন্তুষ্ট হতেন না বা তাকে কাজ থেকে ছাটাইও করেন নি বরং তার এই ঢং সহ্য করেও তাকে কাজে নিয়োজিত রাখেন। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী (রাঃ) সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ৩৫৩-৩৫৪)

হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রাঃ) সাহেব বর্ণনা করেন যে,

ফকীর মুহাম্মদ নামের একজন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন, তিনি আমাকে লিখিতভাবে বয়ান দিয়েছেন, চাষাবাদ আমাদের পেশা ছিল। হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জমি চাষাবাদ করতো। একবার বৃষ্টি অনেক কম হয়েছে ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়; যা ছিল তা খাবারের জন্যও অপ্রতুল। এদিকে হযরত সাহেবের খাদেম হামেদ আলী সাহেব ফসলের নির্ধারিত অংশ নিতে আসেন। সবাই মিলে নিবেদন করলাম ফসল খুবই কম হয়েছে ভাগের অংশ যদি দেয়া হয় তাহলে আমাদের কি করে চলবে। হামেদ আলী সাহেব ফিরে গিয়ে হযরত সাহেবের কাছে এভাবেই বললেন। তিনি (আঃ) বলেন, ঠিক আছে আগামী বছর ভাগের অংশ আদায় করো এখন ছেড়ে দাও। পরের বছর ফসল এত বেশি হয়েছে যে, দু’টো ভাগই আদায় হয়ে গেছে। বস্তুত তিনি (আঃ) দরিদ্রদের উপর অনেক দয়া করতেন। (সিরাতুল মাহ্‌দী, ৪র্থ খন্ড-অপ্রকাশিত বর্ণনা নাম্বার ১৩১১)

তাই আহ্‌মদী কৃষকদের এটি স্মরণ রাখা উচিত, যেভাবে আমি ওয়াকফে জাদীদের নব বর্ষ ঘোষণার প্রাক্কালে সিন্ধুর কৃষকদের কথা বিশেষভাবে খুতবায় উল্ল্যেখ করেছিলাম ‘থার’ থেকে যে দরিদ্র লোকেরা আসে তাদের জন্য হৃদয়ে দয়ার প্রেরণা সৃষ্টি করুন। প্রথমত তাদেরকে পারিশ্রমিক পুরো দিন আর যতটুকু সম্ভব তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা উচিত। এটি এ অঞ্চলে তবলীগের এক বিরাট মাধ্যম।

কেবল মানুষই নয় অন্যান্য সৃষ্টির জন্যও তাঁর মাঝে দয়ার প্রেরণা ছিল। মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নতের উপর অনুশীলন করে আল্লাহ্‌ তা’আলার সকল বৈশিষ্ট্য অবলম্বনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম আদর্শ যা আঁ-হযরত (সাঃ)-এর মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা তাঁর মাঝেও ছিল।

হযরত মিয়া বশীর আহমদ সাহেব (রাঃ) লিখেন,

একবার মিয়া সাহেব অর্থাৎ হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ সানী (রাঃ) ঘরের দরজা বন্ধ করে পাখি ধরছিলেন। হযরত সাহেব জুমুআর নামাযের জন্য বাইরে যাবার সময় তাকে দেখে ফেলেন আর বলেন, মিয়া! ঘরের পাখি ধরতে হয় না। যার মধ্যে দয়া নেই তার ঈমানও নেই। (সিরাতুল মাহ্‌দী, ১ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ১৯২)

যেখানে তিনি (আঃ) পাখির উপর দয়া করেছেন সেখানে ছোটদেরও উপদেশ দিয়েছেন, যদি নিজের ঈমান বাঁচাতে চাও তাহলে হৃদয়ে দয়ার চেতনা সৃষ্টি করো।

এরপর হযরত মিয়া বশীর আহমদ সাহেব (রাঃ) আরও বর্ণনা করেন,

কাশ্মীর নিবাসী খাজা আব্দুর রহমান সাহেব নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি তাকে পত্রে লিখেছেন, একদা একটি মোটা তাগড়া কুকুর হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর ঘরে ঢুকে পড়ে। আমরা ছোটরা দরজা বন্ধ করে ওটাকে মারতে চাইলাম। কিন্তু কুকুর চিৎকার জুড়ে দিলে হযরত সাহেব শুনে ফেলেন আর তিনি (আঃ) আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হন ফলে আমরা দরজা খুলে কুকুরটিকে ছেড়ে দেই। (সিরাতুল মাহ্‌দী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ২৮-২৯ বর্ণনা নাম্বার ৩৪১)

কোন প্রাণীর উপরও তিনি (আঃ) অত্যাচার সইতে পারতেন না। কত আশ্চর্যজনক বিষয়! একজন দরিদ্রের জন্য দয়া আর সহানুভূতির বশবর্তী হয়ে আল্লাহ্‌ তা’আলার সমীপে ক্ষমা এবং করুণা যাচনা করে দোয়া করছেন।

হযরত পীর সিরাজুল হক নোমানী সাহেব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে,

১৮-২০ বছরের এক যুবক ছিল। সে অসুস্থ হলে তার আত্মীয়-স্বজন তাকে নিজ গ্রাম থেকে তাঁর (আঃ) সমীপে নিয়ে আসে আর সে কাদিয়ানে তাঁর (আঃ) কাছে কয়েক দিন অসুস্থ থেকে মারা যায়; তার কেবল বৃদ্ধা মা ছিল। হযরত আকদাস (আঃ) নিয়মানুসারে মরহুমের জানাযার নামায পড়ান। নামাযে দীর্ঘ দোয়া পড়ার ফলে নামায লম্বা হয় যার ফলে অনেকের মাথা ঘুরতে থাকে। সালাম ফিরানোর পর তিনি (আঃ) বলেন , এখন আমরা যার জানাযার নামায আদায় করলাম তার জন্য এত দোয়া করেছি যে, তাকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে চলা-ফিরা করতে না দেখা পর্যন্ত আমরা দোয়ায় ক্ষ্যান্ত দেইনি। এ ব্যক্তি ক্ষমা লাভ করেছে জেনে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। রাতে সেই ছেলের বৃদ্ধা ‘মা’ স্বপ্নে দেখেন, তার ছেলে বেহেশতে অতি আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সে বলছে হযরতের দোয়ায় আল্লাহ্‌ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন আর আমার উপর দয়া করেছেন এবং জান্নাতে আমায় স্থান দিয়েছেন। (পীর সিরাজুল হক নোমানী সাহেব রচিত ‘তাযকিরাহ্‌ মাহ্‌দী’ ১ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ৮০)

মানুষকে আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকটবর্তী করা এবং সত্যকে চিনিয়ে দেয়া আর তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষায় তাঁর সহানুভূতির প্রেরণা এবং দয়া সর্বাধিক ছিল। একটি দৃষ্টান্ত দিলে এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।

হযরত ইয়াকুব আলী ইরফানী সাহেব (রাঃ) বর্ণনা করেন,

‘হযরত মখদুমুল মিল্লাত মৌলভী আব্দুল করীম সাহেব শিয়ালকোটি (রাঃ) একবার বর্ণনা করেছেন, বাইতুদ্‌ দোয়ার উপর তলায় আমার কামরা ছিল। আমি সেটিকে বাইতুদ্‌ দোয়ার মত করে ব্যবহার করতাম। এখানে বসে দোয়ার সময় হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আহাজারি শুনতাম। লাগোয়া কামরা ছিল বলে যখন হুযূর সেখানে দোয়া করতেন এবং নামায আদায় করতেন তখন আমি হুযূরের আকুতি-মিনতি শুনতে পেতাম। তাঁর আওয়াজ এত বেশি ব্যথাপূর্ণ ও বেদনাঘন ছিল যে, শ্রবণকারীর পিত্ত পানি হয়ে যেত আর তিনি এভাবে খোদার আস্তানায় আহাজারি করতেন যেন কোন মহিলা প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মনযোগ সহকারে শুনে দেখি, তিনি প্লেগের আযাব থেকে খোদার সৃষ্টির রক্ষার জন্য দোয়া করেন, (যে যুগে প্লেগ হচ্ছিল) ‘হে খোদা! যদি এরা প্লেগের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কে তোমার ইবাদত করবে?’

হযরত মখদুমুল্‌ মিল্লাত কর্তৃক বর্ণিত বিষয়ের সারকথা হলো, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-কে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা ও প্রত্যাখ্যান করার কারণে শাস্তি হিসেবে প্লেগের প্রাদূর্ভাব ঘটে; তা সত্ত্বেও তিনি মানুষের হেদায়াত ও তাদের কল্যাণের জন্য এতবেশি দয়াপরবশ ছিলেন যে, শত্রু ও বিরুদ্ধবাদীদের সংখ্যা অগনিত হওয়া সত্ত্বেও এ আযাব দূর হবার জন্য তমসাচ্ছন্ন নির্জন রাতে কেঁদে কেঁদে এমন সময়ে দোয়া করতেন যখন বিরুদ্ধবাদীরা সুখ নিদ্রায় মগ্ন। বস্তুত আল্লাহ্‌র সৃষ্টির জন্য তাঁর সহানুভূতি এবং স্নেহ নিজ বৈশিষ্ট্যে ছিল অনন্য। (হযরত শেখ ইয়াকুব আলী ইরফানী (রাঃ) সাহেব সংকলিত হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর জীবনী, পৃষ্ঠাঃ ৪২৮-৪২৯)

মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও দয়ার এই হলো দৃষ্টান্ত। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর সত্যতা প্রমানের জন্য নিদর্শন দেখাচ্ছেন আর তিনি (আঃ) বলছেন, তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা কর আর তাদের হৃদয়ে ���ত্যকে বুঝবার শক্তি সঞ্চারিত কর। এটাই হচ্ছে নিজ মনিবের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যখন মহানবী (সাঃ)-কে মানুষ আহত করে তখন পাহাড়ের ফিরিশতারা বলেছিল, আমরা কি তাদের উপর পাহাড়কে আছড়ে ফেলবো? তখন তিনি (সাঃ) বলেন, না; তাদের মধ্য থেকেই ইবাদতগুজার মানুষ সৃষ্টি হবে। তিনি তাদের জন্য দোয়া�� করেন।

আল্লাহ্‌ তা’আলার সৃষ্টির আধ্যাত্মিক অবস্থা সংশোধনের কিরূপ মনোভাব এবং কেমন সহানুভূতির প্রেরণা তাঁর মধ্যে ছিল, তাঁর (আঃ) একটি উদ্ধৃতি থেকেও এর বহিঃপ্রকাশ হয়।

তিনি (আঃ) বলেন,

“আল্লাহ্‌ জাল্লা শানহু খুব ভালো ভাবে অবহিত আছেন যে, আমি আমার দাবীতে সত্য; আমি মিথ্যারটনাকারী, দাজ্জাল এবং কায্‌যাব নই। এ যুগে কায্‌যাব, দাজ্জাল এবং মিথ্যাবাদীর সংখ্যা কোন অংশেই কম নাই যে, খোদাতা’লা শতাব্দীর শিরোভাগেও বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য নিজের পক্ষ থেকে সংস্কারক প্রেরণ না করে আর একজন দাজ্জালকে দন্ডায়মান করবেন। কিন্তু যারা সত্যকে বুঝেনা এবং বস্তুনিষ্ঠতাকে গুরুত্ব দেয়না এবং কুফুরীর প্রতি ধাবিত হয় আমি তাদের কি চিকিৎসা করবো? আমি সেই শুশ্রূষাকারীর ন্যায় যে নিজ অসুস্থ্য আত্মীয়ের দুঃখে মুহ্যমান।” এমন পরিচর্যাকারী, রোগীর সেবা-শুশ্রূষাকারী যে নিজ অসুস্থ আত্মীয়-স্বজনের দুঃখে নিপতিত। এ নির্বোধ জাতির জন্য একান্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে দোয়া করছি, ‘হে সর্বশক্তিমান মহাপরাক্রমশালী খোদা! হে হাদী ও পথ প্রদর্শক! এদের চোখ খুলে দাও আর তুমি তাদেরকে দৃষ্টি দাও এবং তাদের হৃদয় সমূহে সত্য এবং সঠিক পথের ইলহাম করো।’ আমি বিশ্বাস করি, আমার দোয়া বৃথা যাবে না। কেননা আমি তাঁর পক্ষ থেকে আর তাঁরই দিকে আহবান করি। এটি সত্য যে, যদি আমি তাঁর পক্ষ থেকে না হই আর এক মিথ্যাবাদী হই তাহলে তিনি এক মহা আযাব দ্বারা আমাকে ধ্বংস করবেন কেননা তিনি কখনই মিথ্যাবাদীকে এমন সম্মান প্রদান করেন না যা সত্যবাদীদের প্রদান করা হয়।” (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, লন্ডন থেকে প্রকাশিত, রূহানী খাযায়েন ৫ম খন্ড পৃষ্ঠাঃ ৩২৪)

একস্থলে তিনি আরও বলেন,

“গালি-গালাজ শুনে তাদের জন্য দোয়া করি
দয়ার প্রবল আবেগে ক্রোধকে আমরা সংবরণ করেছি।”

তারপরে আরেকস্থলে আল্লাহ্‌ তা’আলার সৃষ্টিকে সঠিক পথে আনা এবং আযাব থেকে রক্ষার জন্য তিনি (আঃ) বলেন,

“ইহজাগতিক আকর্ষণ অধিকাংশ হৃদয়কে কলুষিত করে রেখেছে। খোদা এ কৌলুষকে দূর করুন, খোদা এ অন্ধকারকে দূরীভূত করুন, এ জগৎ ক্ষণভঙ্গুর আর মানুষ স্থায়িত্বহীন; কিন্তু উদাসীনতার চরম অন্ধকার অধিকাংশকে প্রকৃত অবস্থা বুঝা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। সম্মানিত খোদার কাছে প্রত্যাশা যে, তিনি নিজ দুর্বল বান্দাদের পূর্ণ সহায়তা দেবেন। যেভাবে তারা বিভিন্নভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে সেভাবেই তিনি তাদের নিরাময়ী মলম প্রদান করবেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন যারা আলোকে অন্ধকার আর অন্ধকারকে আলো মনে করে। যাদের ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে তাদেরকেও পর্যুদস্ত ও লজ্জিত করবেন আর তাদেরকেও যারা এক খোদার স্নেহদৃষ্টিকে মূল্যায়ন করেনি, যা যথাসময়ে তাদের উপর পড়েছে (অর্থাৎ হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আগমন) আর এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি বরং অজ্ঞদের ন্যায় সন্দেহে নিপতিত। তাই, যদি এ অধমের নিবেদন প্রভুর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে তাহলে সে যুগ দূরে নয় যখন মুহাম্মদী (সাঃ) এর নূর এ যুগের অন্ধদের উপর প্রকাশিত হবে এবং ঐশী শক্তির নিদর্শনাবলী প্রদর্শিত হবে। (মকতুবাত আহমদ, ১মখন্ড পৃষ্ঠাঃ ৪-৫, ৯ই ফেব্রুয়ারী-১৮৮৩ সনে মীর আব্বাস আলী সাহেবের নামে লিখিত চার নাম্বার চিঠি)

সাধারণভাবে সৃষ্টির জন্য তাঁর সহানুভূতির আবেগ ছিল চরম পর্যায়ে কিন্তু যাদের চোখ থাকা সত্বেও অন্ধ, যারা আলো দেখেও তাকে অন্ধকার বলে, যারা জ্ঞান থাকা সত্বেও অজ্ঞদের ন্যায় হঠকারিতার আশ্রয় নেয় আর সাধারণ জনতাকেও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে থাকে তাদের জন্য দোয়া আসে না। মহত্তরের জন্য তুচ্ছকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। তিনি যে তাদের জন্য বদদোয়া করেছেন তাও দয়া এবং সহমর্মিতার প্রেরণার কারণে ছিল। নিঃসন্দেহে তিনি এ অভিশাপ দিয়েছেন, কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য এটা করেছেন এবং সৃষ্টির অধিকাংশের সাথে সহানুভূতির প্রেরণার কারণেও করেছেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা অবশ্যই তাঁর (আঃ) দোয়াকে গ্রহণীয়তার মর্যাদা প্রদান করেছেন। প্রতিদিন আমরা দেখি যে, সদাত্মারা জামাতে প্রবেশ করছে, যাদের উপর আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বীয় কৃপা বর্ষণ করেন আর এভাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জ্যোতি বিশ্বে বিসতৃত হচ্ছে। আজ আমরা অর্থাৎ মুহাম্মদী মসীহ্‌ (আঃ)-এর দাসদের কর্তব্য, তাঁর (আঃ) দোয়াসমূহকে নিজেদের দোয়ায় অন্তর্ভূক্ত করা আর তাঁর (আঃ) দোয়া থেকেও অংশ লাভ করা। তাঁর (আঃ) শিক্ষামালাকে নিজেদের ব্যবহারিক জীবনে অবলম্বন করে খোদার সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতির প্রেরণা নিয়ে এ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বেশি দোয়া করা; যাতে যে মুহাম্মদী জ্যোতির বিস্তারকল্পে বর্তমান যুগে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) আবির্ভূত হয়েছেন আমরাও এতে ‘নাহনু আনসারুল্লাহ্‌’র ধ্বনি উচ্চকিত করে শামিল হতে পারি। আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদেরকে এর তৌফিক দিন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে