প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান - জুমুআর খুতবা । Invite to Allah with wisdom and goodly exhortation - Friday Sermon

প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান

রোজ শুক্রবার, ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদ থেকে “প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর, সূরা নাহলের ১২৬ নং আয়াত তেলাওয়াত করেন যার অর্থ হল: “তুমি প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রভু-প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান জানাও; আর তুমি সর্বোত্তম যুক্তিপ্রমাণের মাধ্যমে তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় তোমার প্রভু-প্রতিপালকই তাদের সবচেয়ে ভাল জানেন যারা তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে, আর তিনি হেদায়েতপ্রাপ্তদেরও সবচেয়ে ভালভাবে জানেন।”

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জামাতের মজলিসে শূরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে ও তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে যে কিভাবে তবলীগের কাজ তথা ইসলামের প্রকৃত বাণী নিজ দেশের প্রত্যেক পর্যায়ে পৌঁছাবার কাজকে বিস্তৃত করা যায়, বা পূর্বাপেক্ষা অধিক উত্তম ভিত্তির উপর স্থাপন করা যায়। যুক্তরাজ্যের জামাতও এরূপ করেছে এবং তাদের প্রস্তাবিত কর্মপন্থা আমার কাছে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেছে। কিন্তু যে বিষয়টি সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে তা হল- তবলীগ হোক বা অন্য কোন বিষয়েই হোক, মজলিসে শূরায় বিভিন্ন মতামত উপস্থাপিত হয়, তার মধ্য থেকে কোন একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয় এবং তা যুগ-খলীফার কাছে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়; যখন খলীফা সেই কর্মপন্থা অনুমোদন করেন, তখন মজলিসে শূরার প্রত্যেক সদস্যের এবং জামাতের প্রত্যেক পর্যায়ের সকল কর্মকর্তার দায়িত্ব হল তা পালন করানো ও নিজে পালন করার জন্য যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করা। এটি মনে করবেন না যে যেহেতু তবলীগ সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাই এটি সেক্রেটারি তবলীগের দায়িত্ব, আমার না; কিংবা অন্য কোন বিভাগ সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত হলে কেবল সেই সেক্রেটারির দায়িত্ব। নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট সেক্রেটারিরই দায়িত্ব, কিন্তু তবলীগ ও তরবিয়ত বিভাগ সেই বিশেষ বিভাগ যাতে জামাতের সর্বস্তরের প্রত্যেক কর্মকর্তার অংশ নেয়া এবং নিজের উদাহরণ প্রদর্শন করা আবশ্যক। যেহেতু এখন আমি তবলীগ প্রসঙ্গে বলছি, তাই জামাতের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বলব যে, তারা যেন নিজ জামাতের সেক্রেটারি তবলীগদেরকে এই প্রস্তাবনাসমূহ তাদের জামাতগুলোতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। নিজেরা অংশগ্রহণ করে জামাতের সদস্যদের সামনে উদাহরণ রাখুন। প্রত্যেক কর্মকর্তাই কোন না কোনভাবে তবলীগে অংশ নিতে পারেন, আর যদি তা করেন তবে জামাতের সামনে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে, আর তা দেখে অনেক আহমদী নিজে নিজেই তবলীগের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, তাদেরকে এজন্য বিশেষভাবে বলা লাগবে না। ন্যাশনাল সেক্রেটারি তবলীগের দায়িত্ব হল এই কর্মপন্থা যা অনুমোদিত হয়েছে, তা প্রত্যেক স্থানীয় জামাতের সেক্রেটারি তবলীগের কাছে পৌঁছানো, আর এটিও নিশ্চিত করা যে ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব করণীয় রয়েছে, সেসব কথা যেন প্রত্যেক সদস্য পর্যন্ত পৌঁছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হল- আমি যে আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ্ তা’লা যে পথনির্দেশনা দিয়েছেন তা বুঝুন এবং সে অনুসারে প্রত্যেক সেক্রেটারি তবলীগ, প্রত্যেক কর্মকর্তা ও দায়ী ইলাল্লাহ্ কাজ করুন। হুযুর (আই.) বলেন, দায়ী ইলাল্লাহ্‌দের কথা আমি বিশেষভাবে এজন্য বলেছি কারণ, তারা নিজে থেকে স্বেচ্ছায় একাজের জন্য নিজেদের উপস্থাপন করেছেন যে তারা অন্য সদস্যদের তুলনায় তবলীগের কাজে বেশি সময় দিবেন। যদি সময় দিয়েও থাকেন এবং তবলীগের জ্ঞানও থাকে, কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার এই নির্দেশনার প্রতি মনোযোগ না থাকে- তবে সেই কাজে কল্যাণ সৃষ্টি হতে পারে না বা অধিক ভাল ফলাফল সৃষ্টি হতে পারে না। এরপর হুযুর (আই.) আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশনার বিষয়টি তুলে ধরেন, যাতে প্রথমে রয়েছে হিকমত বা প্রজ্ঞা, এরপর সদুপদেশ, তারপর নির্দেশ দিয়েছেন তর্ক-বিতর্কের ক্ষেত্রে এমন দলিল উপস্থাপন কর যা সর্বোত্তম। হুযুর (আই.) বলেন, আজকালকার নামসর্বস্ব উলামারা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের উন্মাদনা, প্রজ্ঞাহীন-বুদ্ধিহীন ও প্রমাণবিহীন কর্মকান্ড দ্বারা ইসলামের এতটা দুর্নাম করে রেখেছে যে অমুসলিম বিশ্ব মনে করে-ইসলাম প্রজ্ঞাহীন, যুক্তিহীন একটি ধর্ম এবং বুদ্ধিহীন ও মূর্খদের ধর্ম, নাঊযুবিল্লাহ্। এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তা’লার এই নির্দেশনা অনুসারে তবলীগ করা ও তবলীগী যোগাযোগ করা প্রত্যেক আহমদীর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। আর এই গুরুত্বকে বোঝার দায়িত্ব সর্বাগ্রে হল কর্মকর্তাদের।

হুযুর (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তা’লা যে নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম রয়েছে হিকমতের সাথে তবলীগ করা। হিকমতের অর্থ অনেক বিস্তৃত। একটি অর্থ হল জ্ঞান, অর্থাৎ তবলীগের জন্য জ্ঞান প্রয়োজন। অনেকে এটিকে অজুহাত বানায় যে আমাদের তো জ্ঞান নেই। হুযুর (আই.) বলেন, এই যুগে এমন অজুহাত একেবারেই অচল, কারণ মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পুস্তকাদি ও জামাতি বই-পুস্তকে তা ব্যাপকহারে রয়েছে, প্রশ্নোত্তর আকারেও অডিও-ভিডিও রয়েছে, ওয়েবসাইটগুলো রয়েছে। প্রথমত দায়িত্ব হল নিজের জ্ঞান বাড়ানো, যেন কথা বলার সময় ব্যক্তির অবস্থানুসারে কথা বলা যায়; দ্বিতীয়ত এটি জানা দরকার যে কোন বিষয়ের উত্তর কোন বইয়ে বা ওয়েবাসাইটে কোথায় রয়েছে। হিকমতের আরেকটি অর্থ হল শক্ত ও অকাট্য কথা, এমন প্রমাণ যা দৃঢ় ও অকাট্য; এমন দলিল যেন না হয় যে উল্টো সেটাকেই প্রমাণ করা লাগে। এটি তবলীগ বিভাগের দায়িত্ব যে, যুগের চাহিদানুসারে আপত্তি ও এর অকাট্য খন্ডন যেন জামাতকে সরবরাহ করে। হিকমতের একটি অর্থ আদল বা ন্যায়বিচার। তর্কের সময় আপত্তি করতে গিয়ে এমন বিষয়ের অবতারণা করা উচিত নয় যা আমাদের উপরও পড়ে। আল্লাহ্‌র ফযলে আহমদীরা তো সাধারণত এমনটি করে না, কিন্তু অ-আহমদী ও অ-মুসলিমরা আমাদের উপর আপত্তি তুলতে গিয়ে এমন সব বিষয়ের অবতারণা করে বসে যা অন্য নবীদের বা তাদের ধর্মবিশ্বাসের উপরও আপত্তির কারণ হয়। তবলীগ বিভাগের দায়িত্ব হল এমন বিষয়সমূহ একত্রিত করে লিফলেট আকারে প্রকাশ ও সহজলভ্য করা। হিকমতের একটি অর্থ হল সহিষ্ণুতা ও নম্রতা। তবলীগের সময় কখনোই রাগ দেখানো যাবে না, এমনকি যে রাগ দেখাবে তার সাথেও না। রাগ দেখানোর মানেই হল যে তার কাছে যুক্তি-প্রমাণ নেই বা তার যুক্তি দুর্বল। যেহেতু আমাদের যুক্তি অকাট্য তাই রাগ দেখানোর প্রশ্নই আসে না। আরেকটি অর্থ হল সত্য ও বাস্তবসম্মত, অর্থাৎ আমাদেরকে সর্বদা সত্য ও প্রকৃত ঘটনার আলোকে তবলীগ করতে হবে। হিকমতের একটি অর্থ হল পরিস্থিতি অনুসারে কথা বলা। অনেক সময় একটি বিষয়ে কথা বললে অপরপক্ষের তা মেনে নেয়ার বদলে তাতে ক্ষেপে যাওয়ার আশংকা থাকে, ফলতঃ ঝগড়া সৃষ্টির বা আরও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার শংকা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অবস্থানুসারে ও এমন বিষয়ে আলোচনা করা উচিত যেন ঝগড়া না হয় এবং সেই ব্যক্তি আরও নিকটে আসে। মোটকথা, আল্লাহ্ তা’লা হিকমত, সদুপদেশ ও অকাট্য দলিলের মাধ্যমে তবলীগ করার যে নির্দেশ দিয়েছেন তা ধারাবাহিকতার সাথে আমাদের পালন করতে হবে, এর ফলে কে হেদায়েত পাবে- না পাবে তা দেখা আমাদের দায়িত্ব নয়। হেদায়েত আল্লাহ্‌র ইচ্ছার অধীন, আমাদের দায়িত্ব সংবাদ পৌঁছানো, যেন কেউ একথা বলতে না পারে যে ইসলামের দাওয়াত সে পায় নি।

আর ‘তুমি সর্বোত্তম যুক্তিপ্রমাণের মাধ্যমে তাদের সাথে বিতর্ক কর’ এই নির্দেশের মাধ্যমে আল্লাহ্ বুঝিয়েছেন যে হিকমতের সাথে কথা বলতে গিয়ে যেন আবার ভীরুতা দেখানো না হয় এবং অপরপক্ষের সুরেই সুর মেলানো না হয়। যেসব বিষয় অন্যায়, তাকে স্পষ্টভাবে অন্যায় হিসেবেই অভিহিত করতে হবে। অপরপক্ষকে তৈলমর্দন করা হিকমত নয়, বরং সেসব ক্ষেত্রে ধর্মাভিমান প্রদর্শন করতে হবে ও সর্বোত্তম যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে তাদের জবাব দিবে হবে। এ বিষয়টি হুযুর (আই.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর লেখনীর আলোকেও ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন যে, বিরোধিতার ভয়ে তাদের সুরে সুর মেলাবেন না; বরং বিরোধিতা হলে তো পরিচিতি ও তবলীগ বৃদ্ধি পায় এবং এক্ষেত্রে আলজেরিয়ার উদাহরণ তুলে ধরেন। হুযুর (আই.) শেষদিকে এটিও উল্লেখ করেন যে, তবলীগের জন্য আবশ্যক হল তবলীগকারী যেন কথায় ও কাজে এক হয়, তাহলেই তার কথায় প্রভাব সৃষ্টি হবে-নতুবা নয়। এ প্রসঙ্গেও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর নসীহত উদ্ধৃত করেন এবং দোয়া করেন যে, আল্লাহ্ তা’লা যেন আমাদের তদনুযায়ী কাজ করার তৌফিক দান করেন। আমীন।

Top