প্রকৃত মুমিনদের গুণাবলী - জুমুআর খুতবা । Attributes of True Believers - Friday Sermon

প্রকৃত মুমিনদের গুণাবলী

রোজ শুক্রবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৪ই এপ্রিল, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “প্রকৃত মুমিনদের গুণাবলী”- বর্ণনা করে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

আজ এবং আগামী শুক্রবারের জন্য জামা’ত যে স্থানে জুমুআর ব্যবস্থা করেছে তা এয়ারপোর্টের খুবই সন্নিকটে হওয়ার কারণে উড়োজাহাজের শব্দে খুতবা শুনতে সমস্যা হতে পারে। বায়তুস সুবুহ-তে যথেষ্ট স্থান না থাকায় সেখানে জুমুআর ব্যবস্থা করা যায় নি। আর উপযুক্ত মূল্যে হলরুম ভাড়া পাওয়া যায় নি দেখেই এখানে ব্যবস্থা করা হয়েছে। জামা’ত যদি পূর্ণ প্রচেষ্টা চালাতো এবং আগে থেকেই প্রস্তুতি নিত তাহলে উপযুক্ত মূল্যে হলরুম ভাড়া পাওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের একেবারে শেষ সময়ে গিয়ে কাজ করার অভ্যাসের ফলে তা সম্ভবপর হয় নি। যদিও অনেক সময় আল্লাহ্ তা’লার ফযলে কাজ হয়ে যায়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেই আশায় প্রথম থেকেই চেষ্টা না করে বসে থাকবেন। হুযুর (আই.) বলেন, কর্মকর্তাদের মনোযোগ না দেয়া এবং গুরুত্ব অনুধাবন না করার কারণে বায়তুস সুবুহ-এর পাশে বায়তুল আফিয়্যাত নামক যে নতুন ভবন ক্রয় করা হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত জুমুআ বা অন্য কোন অনুষ্ঠান করার অনুমতি পাওয়া যায় নি। যদিও কর্মকর্তারা এই অনুমতি পাবার জন্য অনেক চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেখানকার কাউন্সিল খুঁটিনাটি কারণ দেখিয়ে তা প্রদান করছে না। কর্মকর্তাদের স্মরণ রাখা উচিত ছিল যে কাউন্সিল তাদের অধীন নয়, তারা এরূপ করতেই পারে; তাই সে অনুযায়ী চেষ্টা করা উচিত ছিল। দু’তিন বছর পূর্বে যখন এটি ক্রয় করা হয়েছিল তখন এদের ইসলামভীতি ও বিদ্বেষ তেমন ছিল না যেমনটি এখন হয়েছে, যদি তখন মনোযোগ দেয়া হতো তবে কাজটি হয়ে যেতে পারত। হুযুর (আই.) দোয়া করেন যে আল্লাহ্ তা’লা যেন ব্যবস্থাপনাকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেন এবং তারা যেন ধারণা করে বসে না থেকে সব কাজ বুঝে-শুনে যথাসময়ে করতে পারেন।

এরপর হুযুর (আই.) জামা’তের তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের যিকরে খায়ের বা স্মৃতিচারণ করেন, যাদের মধ্যে একজন হলেন শহীদ, একজন মুরব্বী সিলসিলাহ ও একজন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পৌত্রি; তারা এমন গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন যা জামা’তের সর্বস্তরের সদস্যদের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্তস্বরূপ এবং তাদের অবস্থা সেই লোকদের মত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা কুরআন শরীফে বলেছেন যে ‘তাদের মধ্যে কতক এমন রয়েছে যারা আল্লাহ্‌র সাথে কৃত অংগীকারের এক অংশ পূর্ণ করে ফেলেছে’।

প্রথম জন, অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. আশফাক আহমদ শহীদ সাহেব, যিনি লাহোরের শেখ সুলতান আহমদ সাহেবের পুত্র ছিলেন। গত ৭ এপ্রিল শুক্রবার তিনি জুমুআর নামাযের উদ্দেশ্যে কয়েকজন আহমদীকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে যানজটের সময় একজন হেলমেটধারী মোটরসাইকেল আরোহী গাড়ির পাশে এসে তার কানের পিছনে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে, ফলে তিনি সেই স্থানেই শাহাদত বরণ করেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন। মরহুমের বয়স ছিল ৬৮ বছর। মরহুম খেলাফতের প্রতি অত্যন্ত অনুগত, মুসী, তাহাজ্জুদ আগায়কারী, অতিথিপরায়ণ ও সৃষ্টির সেবায় উৎসাহী ছিলেন। তার তবলীগের গভীর আগ্রহ ছিল, সহকর্মী প্রফেসরদের বাড়িতে দাওয়াত করে তবলীগ করতেন; এর ফলে অনেক হুমকিরও শিকার হয়েছেন, কিন্তু কখনো পিছ-পা হন নি। তার কোন সন্তান ছিল না, ৬ ভাই ও এক বোন রয়েছেন, তাদেরকে নিজ সন্তানের মত দেখাশোনা করেছেন ও তাদের তরবিয়ত করেছেন। খলীফা রাবে (রাহে.)-এর যুগে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন যাতে তার শাহাদাতের প্রতি ইংগিত ছিল। হুযুর (আই.) মরহুমের পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন।

দ্বিতীয় জন, মোকররম আইজ নাসির উদ্দীন সাহেব, যিনি ভারতের পূর্ব গুদাওয়ারি অঞ্চলের মোবাল্লেগ ইন চার্জ ছিলেন। গত ৭ এপ্রিল জামা’তি সফরকালে সাঁতার কাটতে গিয়ে মাত্র ৪২ বছর বয়সে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন। তার স্মৃতিচারণে ওয়াক্‌ফে যিন্দেগীদের জন্য শিক্ষণীয় অজস্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি এমন স্থানেও দায়িত্বে ছিলেন যেখানে কাছে-পিঠে কোন আহমদী ছিল না, সেখানে তিনি নিজ পরিবারকে নিয়েই নামায প্রতিষ্ঠা করেছেন। আসবাবপত্রাদি তৈরি করান নি, কারণ তার যুক্তি ছিল যে ওয়াকেফে যিন্দেগী হিসেবে যেকোন সময় যেকোন স্থানে বদলি হতে পারে, আসবাবপত্র থাকলে স্থান বদলে দেরি হতে পারে। জীবনে অনেকবার তবলীগ করতে গিয়ে বিরোধিতা ও বিরুদ্ধবাদীদের মারপিটের শিকার হয়েছেন, কখনো সাহস হারান নি বা তবলীগে পিছ-পা হন নি। প্রত্যহ কুরআন তিলাওয়াত, মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পুস্তক অধ্যয়ন, তাহাজ্জুদ পড়া ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন আদর্শ ওয়াক্‌ফে যিন্দেগী ছিলেন। মরহুমের শাহাদাতের খুব আকাংখা ছিল, আর তার মৃত্যুও একপ্রকার শাহাদাতই ছিল, কারণ তিনি জামা’তি দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণ করেন।

তৃতীয় জন, সাহেবযাদী আমাতুল ওয়াহীদ সাহেবা, যিনি সাহেবযাদা মির্যা খুরশীদ আহমদ সাহেবের স্ত্রী, হযরত মির্যা শরীফ আহমদ সাহেবের কনিষ্ঠা কন্যা ও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর পৌত্রি ছিলেন। গত ১০ এপ্রিল প্রায় ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন। দীর্ঘ দুই দশক যাবৎ কষ্টকর রোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে আল্লাহ্‌র প্রতি সন্তুষ্ট থেকে তা সহ্য করেছেন। নিজের তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও স্বামী, সাহেবযাদা মির্যা খুরশীদ আহমদ সাহেবের এনজিওপ্লাস্ট করানোর সময় তার সেবা করেছেন। তিনি হুযুর (আই.)-এর ফুফু ছিলেন এবং খেলাফতের প্রতি অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধাশীলা ছিলেন। তিনি স্বয়ং হুযুর (আই.)-কে বলেছিলেন, খেলাফতের পর আপনার সাথে ফুফু-ভাতিজা সম্পর্ক শেষ, এখন কেবল খেলাফতের সম্পর্ক রয়েছে। তার ৬ জন পুত্রের চার জনই ওয়াক্‌ফে যিন্দেগী; দু’জন ডাক্তার, একজন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী, একজন উকিল। মরহুমা জলসা ও শূরার সময় মেহমানদের অসাধারণ খেদমত করতেন, জামা’তের কাজের সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনন্য আনুগত্য করতেন, বড়-ছোট দেখতেন না, অধীনস্তদের প্রতি অত্যন্ত নম্রতার আচরণ করতেন, খাদেম-খাদেমাদের খুবই স্নেহ করতেন এবং তাদের সাথে নিজ সন্তানদের মতই ব্যবহার করতেন, দরিদ্রদের প্রতি অসাধারণ ভালবাসা রাখতেন এবং এর বহিঃপ্রকাশও ঘটাতেন, বিপদাপদ সাহস ও ধৈর্য নিয়ে মোকাবেলা করতেন, জামা’তের শিক্ষার পরিপন্থী কোন কথা সহ্য করতেন না, ছোট শিশুদেরও অসাধারণভাবে তরবিয়ত করতেন, নিজ সন্তান ও নাতি-নাতনিদের তো কুরআন শিখিয়েছেনই, এমনকি চাকরদের সন্তানদেরও কুরআন শিখিয়েছেন। সব ধরনের আত্মীয়দের সাথে সর্বদা অসাধারণ সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন, সবাই-ই এ কথার সাক্ষ্যও দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লার প্রতি অগাধ ভরসা রাখতেন। একবার ঘটনাচক্রে একজনের বারংবার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এ কথা স্বীকার করেন যে তিনি মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে তাহাজ্জুদে নিয়মিত হয়েছেন। হুযুর দোয়া করেন, তার এসব অজস্র গুণাবলী আল্লাহ্ তা’লা তার সন্তানদের মাঝেও বহমান রাখুন, আর আল্লাহ্ তা’লা মরহুমার পদমর্যাদা বৃদ্ধি করুন। আমীন। অতঃপর হুযুর (আইঃ) মরহুমদের গায়েবানা জানাযা পড়ান ও তাদের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন।

Top