প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী (আ:) - জুমুআর খুতবা । The Promised Messiah and Mahdi (a.s.) - Friday Sermon

প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী (আ:)

রোজ শুক্রবার, ২৪শে মার্চ, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২৪শে মার্চ, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

গতকাল ২৩শে মার্চ, জামাতে আহমদীয়ার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ.) প্রথম বয়আত গ্রহণের মাধ্যমে জামাতের ভিত্তি রাখেন। তিনি (আ.) ঘোষণা দিয়ে বলেন, যেই প্রতিশ্রুত মসীহ্‌র আগমনের সংবাদ মহানবী (সা.) প্রদান করেছিলেন, আমিই সেই ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি এইজন্য প্রেরিত হয়েছি যেন ঐশী প্রেম মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করি। তিনি আরও বলেন, খোদা তা’লা চান যে সেই সমস্ত ব্যক্তিবর্গ যারা নেক প্রকৃতির, তারা ইউরোপেই থাকুক বা এশিয়াতেই থাকুক বা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই থাকুক, তাদেরকে একত্ববাদের দিকে আকর্ষণ করেন এবং নিজ বান্দাদেরকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করেন- এটিই খোদা তা’লার উদ্দেশ্য, যার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি। তিনি এটিও বলেছেন, এই মর্যাদা আমি মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালবাসার কারণে লাভ করেছি। তাই সারা পৃথিবীর জন্য বার্তা হল- এই রসূলকে ভালবাস এবং তাঁর অনুসরণ কর। তাহলে খোদা তা’লার সাথেও সম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং প্রকৃত একত্ববাদী হতে পারবে। তিনি আরও বলেন, সকল আদমসন্তানের জন্য আজ মুহাম্মদ (সা.) ব্যতীত কোন রসূল ও শাফী নেই। তাই তোমরা চেষ্টা কর যেন এই মহাগৌরবসম্পন্ন ও প্রতাপশালী রসূলের সাথে প্রকৃত ভালবাসা সৃষ্টি করতে পার, আর কাউকে তাঁর (সা.) উপর কোন প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না, যেন তোমরা আকাশে নাজাতপ্রাপ্ত বলে গণ্য হতে পার। হুযুর (আই.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তো মহানবী (সা.)-এর প্রতি এরূপ ভালবাসা রাখতেন। যারা একথা বলে যে মসীহ্ মওউদ (আ.) ও তাঁর মান্যকারীরা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদাকে খাটো করে দেখে তারা যালেম। আজকাল আলজেরিয়াতে এই কারণ দেখিয়েই আহমদীদের উপর চরম অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। এখন তো আহমদী মহিলাদের বিরুদ্ধেও তারা লেগেছে এবং তাদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখছে, কতক দুধের শিশুকেও তাদের মায়েদের সাথে জেলে কাটাতে হচ্ছে। অবশ্য এই ধৈর্যশীল মহিলারা তাদের ঈমানে অবিচল রয়েছেন। হুযুর (আই.) বলেন, এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন আমরা আহমদীদের জন্য দোয়া করছি যে আল্লাহ্ যেন তাদের উপর থেকে এই বিপদ দূর করেন, একইসাথে আমরা এই দোয়াও করছি যে আল্লাহ্ তা’লা এই অ-আহমদীদেরকেও যেন মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে মান্য করার তৌফিক দান করেন।

হুযুর (আই.) হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কতক উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন যেগুলো থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে মানুষ যেন তাদের প্রকৃত মা’বুদ আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করতে পারে তার জন্য তিনি (আ.) কতটা ব্যাকুল ছিলেন। মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, কত দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি যে আজও জানে না যে তার এমন এক খোদা আছেন যিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমাদের খোদাই আমাদের বেহেশত! আমাদের খোদাতেই আমাদের পরম আনন্দ। হে খোদালাভে বঞ্চিত ব্যক্তিগণ! এই প্রস্রবণের দিকে ধাবিত হও, এটি তোমাদেরকে সিঞ্চিত করবে। এটি জীবনের উৎস যা তোমাদেরকে সঞ্জীবিত করবে। আমি কী করব এবং কী উপায়ে এই সুসংবাদ তোমাদের হৃদয়ঙ্গম করাব? মানুষের শ্রুতিগোচর হবার জন্য আমি কোন জয়ঢাক দিয়ে বাজারে-বন্দরে ঘোষণা করব যে ‘ইনি তোমাদের খোদা’। আর কোন ঔষধ দিয়ে আমি চিকিৎসা করাব যেন শোনার জন্য তাদের কান খোলে? হুযুর (আই.) কিশতিয়ে নূহ পুস্তকের এই উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করে বলেন, এটি হল সেই মানদন্ড যা তিনি (আ.) তাঁর মান্যকারীদের মাঝে দেখতে চান।

হুযুর (আই.) বলেন, তওহীদ প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের পুনর্জাগরণের দায়িত্ব হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লাভ করেছিলেন মহানবী (সা.)-এর প্রতি তীব্র ও গভীর ভালবাসার কারণে। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি তাঁর প্রেম ও ভালবাসার কয়েকটি উদাহরণ হুযুর উল্লেখ করেন। এক সাহাবী বর্ণনা করেন, একবার হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) মসজিদে মোবারকে পায়চারি করছিলেন আর গুনগুনিয়ে কিছু গাইছিলেন আর তাঁর চোখ থেকে অশ্রু বেয়ে পড়ছিল। যখন সেই সাহাবী জিজ্ঞেস করেন যে ‘আপনি কেন এত দুঃখভারাক্রান্ত’; তখন তিনি (আ.) বলেন, আমি হাসসান বিন সাবেতের সেই পঙক্তি পড়ছিলাম যা তিনি রসূল (সা.)-এর মৃত্যুতে রচনা করেছিলেন, যার অর্থ হল, হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনি ছিলেন আমার চোখের মণি। আজ আপনার মৃত্যুতে আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। এরপর যে খুশি মরে মরুক, আমি তো কেবল আপনার মৃত্যু নিয়েই ভীত ছিলাম! তিনি (আ.) বলেন, যখন আমি এই পঙক্তি পড়ছিলাম তখন আমার মনে হচ্ছিল, হায়, যদি এই পঙক্তি আমি রচনা করতাম! সাহেবযাদা মির্যা বশীর আহমদ (রা:)ও উল্লেখ করেন যে তাঁর (আ.) অনেক কষ্টের মাঝেও, প্রিয়জনদের, বন্ধুদের, আত্মীয়-স্বজনদের এমনকি সন্তানদের মৃত্যুতেও তাঁর চেহারায় কষ্টের কোন লক্ষণ প্রতীয়মান হতো না, কিন্তু যখন রসূলপ্রেমের কোন প্রসঙ্গ আসত তখন তাঁর চোখ ভেঙে অশ্রু নেমে আসত। তিনি (আ.) তাঁর লেখার মাঝেও এর উল্লেখ করেছেন যে যারা রসূলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে হাসি-বিদ্রুপ করে, তারা যদি আমার সমস্ত সন্তান ও প্রিয়জনদেরও চোখের সামনে হত্যা করতো আর আমাকেও নিতান্ত যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করতো তবু সেই কষ্ট ঐ কষ্টের সমান হতো না যতটা কষ্ট রসূল (সা.)-কে তাদের গালিগালাজের কারণে আমি পাই। হুযুর (আই.) বলেন, এগুলো তাঁর বুলিসর্বস্ব কথা ছিল না, বরং তাঁর নিকটজনেরা এটি খুব ভালভাবে জানতেন। তথাকথিত রসূলপ্রেমের দাবীদাররা এরকম কিছু করতে পেরেছে কি?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মৃত্যুতে অ-আহমদীরাও একথার স্বীকৃতি প্রদান করেছিল যে, তাঁর মৃত্যুতে ইসলামের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকার উদ্ধৃতিও হুযুর উল্লেখ করেন। হুযুর (আই.) বলেন, তিনি (আ.) সারা পৃথিবীর সামনে এটি স্পষ্ট করে গিয়েছেন যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মের মত কোন ধর্মই নেই। তাঁর (আ.) নিজের পদমর্যাদা সম্পর্কেও তিনি এটি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেছেন যে ‘আমি এই সবকিছু আমার নেতা ও মনীব মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর কল্যাণে ও আনুগত্যে লাভ করেছি। তিনি আরও বলেন, যদি আমি তাঁর (সা.) উম্মত ও মান্যকারী না হতাম, তবে পর্বতসমান পুণ্য করলেও কিছুই লাভ করতে পারতাম না। এই ছিল তাঁর রসূলপ্রেমের অবস্থা।

হুযুর (আই.) বলেন, মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উদ্দেশ্য একদিকে ছিল সারা পৃথিবীকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করা, অন্যদিকে সৃষ্ট জীবের অধিকার প্রতিষ্ঠাও তাঁর দায়িত্ব ছিল। তিনি (আ.) নিজ লেখনীতেও এর উল্লেখ করেছেন, এবং তাঁর হাতে বয়আতের দশটি শর্তের মধ্যেও এটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বয়আতের ৪র্থ ও ৯ম শর্ত এর ভিত্তিতেই রাখা হয়েছে। তিনি (আ.) লিখেছেন যে ‘ইসলামের দুটিই অংশ- একটি হল খোদা তা’লাকে ভালবাসা, অন্যটি হল মানবজাতির প্রতি এতটা ভালবাসা রাখা যেন তাদের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করে এবং তাদের জন্য দোয়া করা।’ তিনি (আ.) একথাও স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে কোন বিধর্মীর প্রতি তাঁর কোন শত্রুতা নেই, তাঁর শত্রুতা হল সেসব মিথ্যা বিশ্বাসগুলোর সাথে। বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিও তাঁর কিরূপ ভালবাসা ছিল তার উল্লেখ করতে গিয়ে মৌলভী আব্দুল করীম সিয়ালকোটি সাহেব বলেন, একবার প্লেগের মহামারী চলাকালে আমি অত্যন্ত বেদনার্তভাবে মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে দোয়া করতে শুনি। তিনি এতটা কষ্ট নিয়ে কাঁদছিলেন যেমনটি প্রসববেদনায় মহিলারা করে থাকে। আমি যখন কান পাতলাম তখন শুনতে পেলাম তিনি এই দোয়া করছেন, ‘হে প্রভু! এই লোকেরা যদি প্লেগে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তোমার ইবাদত করবে কে?’ এই ছিল আল্লাহ্‌র সৃষ্ট জীবের প্রতি তাঁর ভালবাসার প্রকৃত চিত্র। প্লেগের মহামারী ছিল তাঁরই সত্যতার একটি নিদর্শন, অথচ তিনি স্বয়ং আল্লাহ্‌র কাছে এত্থেকে মানুষের মুক্তির জন্য এবং তাদের হেদায়াত লাভের জন্য দোয়া করেছেন। হুযুর (আই.) বলেন, আজ পৃথিবীতে যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হয় তবে তা এই আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব, তলোয়ার ও অস্ত্র-শস্ত্রের মাধ্যমে নিরীহ লোকদের হত্যা করার মাধ্যমে নয়। আর এই দায়িত্ব আহমদীদের উপরই রয়েছে।

হুযুর (আই.) খুতবার শেষদিকে বলেন, আহমদীয়াতের বৃক্ষ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি এই বৃক্ষের সবুজ শাখায় পরিণত হতে চাই তবে আমাদের দায়িত্ব হবে, যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর লেখনী ও কর্ম দ্বারা সাব্যস্ত, আমরা যেন আল্লাহ্ তা’লার সাথে ভালবাসা, রসূল (সা.)-এর প্রতি প্রেম এবং মানবজাতির প্রতি সহানুভূতি ও ভালবাসা ও নিজেদের কর্মকে সেরূপ বানাই। হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে এর তৌফিক দান করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।

Top