বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাবলী ও এর ইসলামী সমাধান - জুমুআর খুতবা । Matrimonial Issues and it's Islamic Solution - Friday Sermon

বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাবলী ও এর ইসলামী সমাধান

রোজ শুক্রবার, ৩রা মার্চ, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৩রা মার্চ, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাবলী ও এর ইসলামী সমাধান”- বর্ণনা করে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদি এবং বিয়ে-পরবর্তী দাম্পত্য সমস্যাদি- এগুলো এমন বিষয় যা বাড়িতে দুশ্চিন্তা-অস্থিরতা-উৎকন্ঠার কারণ হয়ে থাকে। বিয়ের পর যখন দাম্পত্য-কলহ দেখা দেয়, তখন তা কেবল স্বামী-স্ত্রী পর্যন্তই সীমিত থাকে না, বরং উভয়পক্ষের পিতা-মাতার জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; আর যদি তাদের সন্তানাদি থাকে তবে তাদের জন্যও এগুলো অস্থিরতা ও উৎকন্ঠার কারণ হয় এবং অনেক সময় এর ফলে সন্তানরা জাগতিক ও আধ্যাত্মিক- উভয় দিক থেকে বিনষ্ট হয়। হুযুর (আই.) প্রতিদিন তাঁর কাছে আসা বিভিন্ন পত্রাদি এবং তাঁর সাথে মানুষের ব্যক্তিগত সাক্ষাতের আলোকে এসব সমস্যাদি তুলে ধরেন। উদাহরণস্বরূপ, মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকে, পড়াশোনার ছুতোয় সঠিক বয়সে বিয়ে দেয়া হয় না, ফলে সমস্যাদি সৃষ্টি হয়। কখনো বা বোঝা-পড়ার সমস্যার কারণে সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। কখনো বা মেয়েদের বান্ধবীদের উল্টোপাল্টা পরামর্শের কারণে সমস্যা দেখা দেয়, কখনো বা স্বয়ং মেয়ের পিতা-মাতা এমন কিছু শেখান যা স্বামী-স্ত্রীর বিশ্বাসে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে। এরকম বিভিন্ন কারণে দেখা যায় যে মেয়েরা বিয়ে ভেঙে দেয়। আর কেবল মেয়েরাই নয়, অনেক সময় ছেলেরাও একাজ করে বসে; তবে জামাতের বিচার বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে মেয়েদের পক্ষ থেকেই এটি বেশি হয়। ছেলে বা মেয়ে উভয়েই কখনো কখনো ‘কওলে সাদীদ’ বা সোজাসুজি ও সত্য কথা বলে না, তাদের নিজস্ব কোন পছন্দ হয়তো থেকে থাকে কিন্তু পরিবারের চাপে অন্যত্র বিয়ে করে ফেলে, আর এরপর দাম্পত্য-কলহে জড়িয়ে পড়ে আর বিয়ে ভেঙে দেয়, কখনো বা দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পর হঠাৎ স্বামীর মাথায় দ্বিতীয় বিয়ের পোকা ঢুকে এবং এর ফলে বিভিন্ন ছুতো-নাতায় সে আগের বিয়ে ভেঙে দেয় অথবা স্ত্রী স্বামীর এহেন আচরণে খোলা চেয়ে বসে, অনেক সময় মেয়ের পিতা-মাতার সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যাদির কারণে আবার কখনো তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অন্যায় আচরণের কারণে বিয়ে ভেঙে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি; এসব ক্ষেত্রে কখনো ছেলে দায়ী থাকে, কখনো বা মেয়ে দায়ী হয়ে থাকে। হুযুর (আই.) বলেন, দায়ী যে-ই হোক না কেন, যদি আমাদের এসব সমস্যার সমাধান করতে হয় তবে তা ধর্মীয় শিক্ষার আলোকেই করতে হবে বা করা সম্ভব। আমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং একইসাথে যুগের ইমাম হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কেও মেনেছি, যিনি আমাদের কাছ থেকে সর্বক্ষেত্রে ধর্মকে জাগতিকতার উপর প্রাধান্য দেয়ার অঙ্গীকার নিয়েছেন, তা সত্ত্বেও আমরা যদি মুখে ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দেবার কথা বলে কার্যত জাগতিকতাকে প্রাধান্য দিই- তাহলে তখনই সমস্যা দেখা দেয়। মহানবী (সা.) বলেন, চারটি বিষয়কে সামনে রেখে একজন মহিলাকে বিয়ে করা হয়- তার সম্পদের জন্য, তার বংশ-মর্যাদার জন্য, তার সৌন্দর্যের জন্য অথবা তার ধার্মিকতার জন্য; একইসাথে তিনি (সা.) এই নির্দেশও প্রদান করেন যে, তোমরা ধার্মিক নারীকে নির্বাচন কর, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের মঙ্গল করবেন। যদি তাঁর (সা.) এই বাণীটিকে ছেলেপক্ষ দৃষ্টিপটে রাখে তাহলে মেয়ের পরিবারও এটিকেই অগ্রগণ্য করবে, আর এর ফলে অসংখ্য জটিলতা আপনা-আপনিই দূর হয়ে যাবে। আর যে ছেলে ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দিবে, তার নিজের কাজও ধর্মসম্মত হতে হবে; আর এমনটি হলে তার পরিবারও ছোটখাটো ব্যাপারে সমস্যা সৃষ্টি হবে না।

আবার সব ছেলে সব মেয়ের জন্য বা সব মেয়ে সব ছেলের জন্য মঙ্গলজনক না-ও হতে পারে, তাই বিয়ের পূর্বে ইস্তেখারা করা উচিত যেন সেই সম্বন্ধ ক্ষতিকর হলে আল্লাহ্ তা’লা কোন বাধা সৃষ্টি করে দেন। পবিত্র কুরআনে বিয়ের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে তার একটি হল প্রশান্তি ও ভালবাসা সৃষ্টি হওয়া। যদি ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দেয়া হয় এবং অনেক দোয়া ও ইস্তেখারা করা হয়, তাহলে বিবাহিত জীবন সফল হয়। তবে এটিও স্মরণ রাখতে হবে, অনেক সময় বিয়ের পরও শয়তান আক্রমণ করে, তাই অনেক দোয়া করা উচিত যেন প্রশান্তি ও ভালবাসা লাভ হয়। হযরত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রা.) এ বিষয়ে অনেক বিস্তারিত নসীহত করেছেন যা হুযুর (আই.) উল্লেখ করেন। প্রথমত তিনি ইস্তেখারার গুরুত্ব তুলে ধরেন, এরপর বিয়ের পর যেভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা.) দোয়া দানের শিক্ষা দিয়েছেন তার দিকেও তিনি (রা.) মনোযোগ আকর্ষণ করেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ‘কুফুভ’ বা উভয় পরিবারে সমতা বিষয়ে মন্তব্য করেন যে এটি হলে ভালো, কিন্তু তা আবশ্যক নয়। বংশের গর্ব করা উচিত নয়, বরং প্রকৃত মঙ্গল ও ধার্মিকতা খোঁজা উচিত। হুযুর (আই.) হাদীসের আলোকে বিয়ের আগে মেয়েকে দেখার অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, কখনো কখনো কোন ছেলেপক্ষ অযথা মেয়েকে দেখতে যায়, কিন্তু পরবর্তীতে অদ্ভুত সব ছুতো-নাতায় মেয়েকে বাতিল করে দেয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে বিয়ের উদ্দেশ্য হল পরহেযগারী লাভ, স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সন্তান-সন্তনি লাভ। যদি বস্তুবাদিতার পরিবর্তে এগুলোকে দৃষ্টিপটে রাখা হয়, তবে সমস্যা হয় না।

কুরআনী শিক্ষার আলোকে এটি সাব্যস্ত হয় যে বিয়ের পর নতুন পরিবার ও ঘর হওয়া উচিত, ছেলের পিতা-মাতার বার্ধক্য বা অসুস্থতার ছুতোয় এটিকে উড়িয়ে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু যদি মেয়েকে কোন কারণে ছেলের পরিবারের সাথে থাকতে হয়, তবে সেই কারণে বিয়ে ভেঙে দেয়া বা এটি নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ করা একেবারেই অনুচিত। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কুরআনের আলোকে স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারের এবং তাদের কোন কথা অপছন্দ হলেও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নেয়ার ব্যাপারটি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং স্ত্রীদের আবেগ-অনুভূতির প্রতি সচেতন হবার নির্দেশ প্রদান করেছেন। একইসাথে তিনি (আ.) মহিলাদেরকেও স্বামীর যৌক্তিক কারণে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়কে অপছন্দের দৃষ্টিতে দেখাকে বারণ করে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করেন। তবে তিনি (আ.) এক্ষেত্রে পুরুষদেরকে খুব সতর্ক করেছেন যে এটি যেন প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য না হয় এবং আল্লাহ্‌র একটি আইনকে আল্লাহ্ তা’লারই ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঢাল বানিয়ে ব্যবহার না করা হয়। তিনি (আ.) খুব স্পষ্টভাবে বলেন, কেবলমাত্র ব্যভিচার করাই পাপ নয়, বরং হৃদয়ে যৌন কামনা-বাসনার রাজত্ব থাকাও পাপ। যদি কেউ সারাক্ষণ স্ত্রী নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাহলে তার চোখে পানি আসবে কোত্থেকে আর সে আল্লাহ্‌র ভালবাসায় মগ্ন হবে কিভাবে?

হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ্‌ তা’লা জামাতের পুরুষ-নারী সব সদস্যকে বুদ্ধি দিন, এবং তাদেরকে তৌফিক দিন যেন তারা আল্লাহ্‌ তা’লার শিক্ষাসম্মতভাবে নিজেদের দাম্পত্য সমস্যার সমাধান করতে পারে, জাগতিক কামনা-বাসনার পরিবর্তে ধর্মকে যেন তারা অগ্রাধিকার দেয়, আল্লাহ্‌ তা’লার ভীতি ও তাকওয়া যেন সর্বদা তাদের দৃষ্টিতে থাকে; অনুরূপভাবে বিয়ে-শাদি নিয়ে যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, আল্লাহ্ তা’লা ছেলে-মেয়েদেরকে একথা বোঝার তৌফিক দিন যে বিয়ে-শাদি কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য নয়, বরং তা ধর্মকে অগ্রাধিকার প্রদান করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য এবং পবিত্র প্রজন্ম সৃষ্টি করার জন্য- যেন আগামী প্রজন্ম ইসলামের সেবা করে এবং আল্লাহ্ তা’লার কল্যাণ ও আশীষের অধিকারী হয়। আল্লাহুম্মা আমীন।

হুযুর (আই.) এরপর চারটি জানাযারও উল্লেখ করেন, যার মধ্যে দুটি হাযের জানাযা ও দুটি গায়েবানা জানাযা। হাযের জানাযা দুটি মোকাররম নওয়াজ মোমেন সাহেব ও মোকাররম সৈয়দ রফিক আহমদ সফীর সাহেবের, আর গায়েব জানাযা দুটির একটি হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.)-এর পৌত্র মোকাররম ডা. মির্যা লায়িক আহমদ সাহেবের, দ্বিতীয়টি মোকাররম আমানুল্লাহ খান সাহেবের। হুযুর (আই.) মরহুমদের সংক্ষিপ্ত যিকরে খায়ের করেন এবং তাদের সকলেরই ক্ষমা লাভের ও আত্মিক পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন। আমীন।

Top