শালীনতা ও পর্দা সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষা - জুমুআর খুতবা । Islamic Teaching about Modesty and Pardha - Friday Sermon

শালীনতা ও পর্দা সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষা

রোজ শুক্রবার, ১৩ই জানুয়ারী, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৩ই জানুয়ারী, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “শালীনতা ও পর্দা সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষা”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

অনেকেই মনে করে যে ধর্ম তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করে এবং তাদের উপর অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করে। অথচ আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ওয়া মা জা’আলা ’আলাইকুম ফিদ্দীনে মিন হারাজ’ (হাজ্জ: ৭৯) অর্থাৎ তিনি ধর্মের শিক্ষায় তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা বা কাঠিন্য আরোপ করেন নি। ইসলাম ধর্মে এমন কোন নির্দেশ নেই যা তোমাদেরকে বিপদে ফেলতে পারে, বরং এর ছোট-বড় সকল নির্দেশ কেবলই মঙ্গলের জন্য। মানুষ যদি আল্লাহর এই বাণীতে বিশ্বাস না করে আর শরীয়তের নির্দেশাবলী পালন না করে, তবে শয়তান মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে ফেলবে।

হুযুর (আই.) বলেন, কিছু কিছু বিষয় এমন থাকে যা বাহ্যত ছোট মনে করা হয়, কিন্তু সময়ের আবর্তে যখন সেগুলোকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয় তখন তা ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে। তাই একজন মুমিনের কখনোই কোন নির্দেশকে তুচ্ছ জ্ঞান করা উচিত নয়। হুযুর উদাহরণস্বরূপ ফ্যাশনের নামে নারী-পুরুষের মাঝে নির্লজ্জতা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন, যেটিকে মানুষ আজকাল উন্নত হবার লক্ষণ বলে মনে করে। হুযুর (আই.) বলেন, স্বাভাবিকভাবেই এর কিছুটা প্রভাব আমাদের ছেলে-মেয়েদের উপরও পড়ে এবং কোন কোন মেয়ে এ প্রসঙ্গে প্রশ্নও করে যে আমরা কেন ইউরোপের স্বাধীন মেয়েদের মত পোশাক পরে পর্দা ছাড়াই চলতে পারব না?

এধরনের প্রশ্নের উত্তরে হুযুর (আই.) বলেন, আমাদেরকে সর্বপ্রথম যে কথাটি স্মরণ রাখতে হবে তা হল যদি ধর্মের উপর আমাদের প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয় তাহলে আমাদেরকে ধর্মীয় অনুশাসন মানতে হবে। যদি আমরা দাবী করি যে আমরা মুসলমান ও ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত, তবে আমাদেরকে আল্লাহ ও রসূল (সা.)-এর নির্দেশাবলী মানতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, লজ্জা ঈমানের অংগ। সুতরাং শালীন পোশাক ও পর্দা আমাদের ঈমান রক্ষা করার জন্য আবশ্যক। উন্নত দেশগুলো যে স্বাধীনতার নামে লজ্জা ও শালীনতা হারিয়ে বসেছে সেটি তাদের ধর্মহীনতার প্রমাণ। আহমদীরা তো এমন করতে পারে না, কারণ তারা ধর্মকে জাগতিকতার উপর প্রাধান্য দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) এ বিষয়টিকে নারী-স্বাধীনতার নামে পাপাচারের মূল আখ্যা দিয়ে বলেন, যেসব দেশে এমন স্বাধীনতার প্রচলন আছে তাদের নৈতিকতার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ! যদি এই স্বাধীনতা ও পর্দাহীনতার ফলে তাদের সম্ভ্রম ও পবিত্রতা বৃদ্ধি পেত, তাহলে আমরা মেনে নিতাম যে আমরা ভুল। কুদৃষ্টি দেয়া আর প্রবৃত্তির তাড়নার শিকার হওয়া মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। তিনি (আ.) আরও প্রশ্ন তোলেন, পুরুষদের কি এতটা সংশোধন হয়ে গিয়েছে যে মেয়েরা তাদের সামনে পর্দাহীন অবস্থায় থাকতে পারে? আগে পুরুষদের নৈতিক অবস্থার সংশোধন কর যেন তারা পর্দাহীন মেয়েদের দেখেও নিজেদের পশুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, তারপর পর্দাপ্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোল। হুযুর (আই.) বলেন, প্রত্যেক আহমদী ছেলে-মেয়েকে নিজের লজ্জা-সম্ভ্রমের মানকে উন্নত করে সমাজের নোংরামি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। পিতা-মাতা এবং বিশেষ করে মায়েদের দায়িত্ব হল ছোটবেলা থেকেই তাদের সন্তানদের, বিশেষ করে মেয়েদেরকে এই সুশিক্ষা প্রদান করা যেন তারা সমাজের কুপ্রভাব থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

হুযুর (আই.) একজন মেয়ের চিঠির উল্লেখ করেন, যে জানতে চেয়েছে যে ব্যাংকে চাকরির ক্ষেত্রে পর্দায় শৈথিল্য করা যাবে কি-না, কেননা হুযুর কোন সময় বলেছেন যে চাকরির ক্ষেত্রে মেয়েরা চাকরিস্থলে পর্দা শিথিল করতে পারে। এর জবাবে হুযুর (আই.) বলেন, এমনটি হুযুর বলেছেন ডাক্তার মেয়েদের ক্ষেত্রে কারণ তাদের জন্য প্রচলিত বোরকা পরে সবসময় কাজ করা সম্ভব হয় না, যেমন অপারেশনের সময়; কিন্তু তখনও তারা যে পোশাক পরে তা-ও পর্দার শামিল। অন্যান্য সময় তারাও পর্দার মাঝে থেকে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ হুযুর রাবওয়ার ডা. ফাহমিদা ও ডা. নুসরাত জাহান সাহেবার উল্লেখ করেন। আর গবেষকদের ক্ষেত্রেও হুযুর বলেছেন যে, গবেষণাগারের বিশেষ পোশাক যেহেতু পরতে হয় তাই তারা তা করতে পারে, কেননা সে পোশাকও পর্দার অনুরূপ হয়ে থাকে; কিন্তু বাহিরে আসলেই তাদেরকেও প্রচলিত পর্দা অবলম্বন করতে হবে। ব্যাংকের চাকরি এমন কোন চাকরি নয় যার মাধ্যমে সরাসরি মানবতার সেবা হতে পারে। তাই এই জাতীয় যাবতীয় চাকরির ক্ষেত্রে পর্দায় শৈথিল্যের অনুমতি নেই। নতুবা সমাজের মাঝে যে নির্লজ্জতা ছড়িয়ে আছে, আমরাও তাতে আক্রান্ত হয়ে যাব। হুযুর আরও উল্লেখ করেন, যেসব স্কুলে সাঁতার শিখতে হয় তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন ছেলে-মেয়ে একত্রে তা না শিখে; আর যদি স্কুলের পক্ষ থেকে বাধ্য করা হয় তাহলে মেয়েরা যেন অবশ্যই বুর্কিনি, যা এ কাজের জন্য ন্যূনতম পর্দাশীল পোশাক, তা ব্যবহার করে। হুযুর (আই.) বলেন, বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলামবিরোধী শক্তিগুলো একজোট হয়ে ইসলামের সুন্দর ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত, যার একটি প্রচেষ্টা হল প্রগতিশীলতার নামে পর্দাহীনতা। আর আল্লাহ তা’আলা এ যুগে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করার মিশন দিয়ে হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-কে পাঠিয়েছেন। তাই আমরা যারা তাঁর জামাতের সদস্য, আমাদেরকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য সবরকম কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের তাদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া চলবে না, বরং বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির সাথে তাদের উত্তর দিতে হবে। একইসাথে দোয়াও করতে হবে যেন আল্লাহ পুণ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকরা সৌভাগ্য দেন। হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এসব শয়তানী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার তৌফিক দিন ও আমাদের সাহায্য করুন। (আমীন)

হুযুর (আই.) বলেন, ইসলামের শিক্ষা অন্যান্য ধর্মের মত সাময়িক নয়, বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত কার্যকর। তাই ইসলামী অনুশাসন পালন করতে গিয়ে আমাদের হীনম্মন্যতার শিকার হওয়া চলবে না যে এগুলো পুরনো বা সেকেলে হয়ে গিয়েছে। একথা ভাববেন না যে তারা উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছে; আসলে তাদের নৈতিক অবস্থা তাদেরকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পরিশেষে হঠাৎ একদিন তারা বুঝতে পারবে যে ইসলামী শিক্ষা ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই।

হুযুর (আই.) কুরআন শরীফের সূরা নূরের ৩২নং আয়াতের বরাতে পর্দার নির্দেশ বিস্তারিত তুলে ধরেন। হুযুর বলেন, পর্দার অর্থ নারীদেরকে বন্দী করে রাখা নয়; বরং পর্দার নির্দেশ প্রথমে পুরুষদেরকে দেয়া হয়েছে। পর্দাহীনতা ও লাগামহীন বন্ধুত্ব যেহেতু অনেক ধরনের বিপদ ডেকে আনে তাই ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়কেই পর্দার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এবং প্রথমে নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুরুষকে যেন তারা নিজেদের দৃষ্টিকে অবনত ও সংযত রাখে। মোটকথা, পর্দা নারীদের স্বাধীনতাকে হরণ করে নি, বরং তা তাদের সম্মান ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধান করেছে। হুযুর (আই.) খুতবার শেষদিকে মুরব্বী-মোয়াল্লেম ও তাদের স্ত্রীদের বিশেষভাবে নসীহত করেন যেন তারা পর্দাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নত মান প্রতিষ্ঠা করেন এবং অন্যদের জন্য আদর্শস্থানীয় হন। শেষে হুযুর দোয়া করেন- আল্লাহ করুন যেন আমাদের পুরুষ ও নারীরা লজ্জাশীলতার উন্নত মান প্রতিষ্ঠাকারী হয় আর আমরা সবাই যেন ইসলামী বিধি-নিষেধের উপর পুরোপুরি আমলকারী হই। আল্লাহুম্মা আমীন, সুম্মা আমীন।

Top