নববর্ষ উদযাপনে একজন আহ্‌মদীর করণীয় - জুমুআর খুতবা । New Year Celebration: The Ahmadi Perspective - Friday Sermon

নববর্ষ উদযাপনে একজন আহ্‌মদীর করণীয়

রোজ শুক্রবার, ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “নববর্ষ উদযাপনে একজন আহ্‌মদীর করণীয়”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

দু’দিন পর ইংরেজি নতুন বছর শুরু হতে যাচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জাতির মাঝে বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমানে সর্বত্র হিসেবের জন্য গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন এবং পরিচিতি বেশি থাকায় পহেলা জানুয়ারী সারা বিশ্বেই নববর্ষ হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। বছর আসে আর বার মাস পর তা শেষও হয়ে যায়, তা সে চান্দ্রবছরই হোক বা সৌরবছরই হোক। বিশ্ববাসী বিভিন্ন দিবস, মাস বা বছরকে জাগতিক গাল-গল্প, হৈ-হুল্লোড় বা আমোদ-প্রমোদে ব্যয় করার মাধ্যমে আনন্দ লাভের চেষ্টা করে, তা সে মুসলমানই হোক বা অ-মুসলমানই হোক না কেন। ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে অর্ধেক রাত বা হয়তো পুরো রাতই জেগে থেকে হৈ-হুল্লোড়, গান-বাজনা, মদ্যপান ইত্যাদিতে তারা ব্যয় করে। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের যেহেতু ধর্মের চোখ অন্ধ, তাই তাদের দৃষ্টি সেই স্থান পর্যন্ত পৌঁছায় না যেখানে একজন মুমিনের দৃষ্টি পৌঁছে। একজন মুমিন এ ধরনের বৃথা উদযাপন করা তো দূরের কথা, বরং এ ধরনের উদযাপনের প্রতি ঘৃণা রাখে। আর সে আত্মবিশ্লেষণে ব্যস্ত থাকে যে আমাদের জীবনে একটি বছর এসে চলে গেল; এটি আমাদের কী দিয়ে গেল আর নিয়ে গেল বা এই বছরে আমরা কী পেলাম আর কী হারালাম? আর এটি সে জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে।

হুযুর (আই.) বলেন, আমরা আহমদীরা সৌভাগ্যবান যে আমরা প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী (আ.) কে মান্য করার সৌভাগ্য লাভ করেছি, যিনি আমাদের সামনে আল্লাহ ও রসূল (সা.)-এর শিক্ষার সারমর্ম উপস্থাপন করেছেন যা দৃষ্টিপটে রাখলে আমরা বুঝতে পারব যে আমরা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূর্ণ করার চেষ্টা করেছি কি-না। তিনি (আ.) বয়াতের অঙ্গীকারের যে শর্তাবলী নির্ধারণ করেছেন তার মাধ্যমে তিনি আমাদের কর্মপন্থা বাতলে দিয়েছেন যার উপর আমল করে প্রতিটি দিন, সপ্তাহ, মাস বা বছর শেষে আমাদের আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান যাচাইয়ের তিনি (আ.) প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাই আমরা যদি নতুন বছরের এই রাতকে আত্মবিশ্লেষণ ও দোয়ার মাধ্যমে পার করি তাহলে আমরা আমাদের পরকালকে সুন্দর করতে পারব। নতুবা আমরাও যদি বাহ্যিক মোবারকবাদ ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে এটি পার করি তাহলে আমরা কিছু তো পাব না, বরং হারাবো অনেক কিছু।

হুযুর (আই.) এরপর বয়াতের বিভিন্ন শর্তাবলীর আলোকে আমাদের আত্মবিশ্লেষণ কেমন হওয়া উচিত তা তুলে ধরেন। আমরা কি শিরক না করার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছি? আমাদের যাবতীয় বাহ্যিক পুণ্যকর্মসমূহ আল্লাহ তা’লাকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে লোকদেখানোর জন্য করা হয়নি তো? আমরা কি পুরো বছর পূর্ণ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম? নিজেদের জাগতিক ক্ষতির আশংকা দেখে মিথ্যার আশ্রয় নেই নি তো? টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের অশ্লীলতা থেকে কি আমরা নিজেদের দূরে রেখেছিলাম? কুদৃষ্টি থেকে আমরা বিরত ছিলাম তো? সর্বপ্রকার যুলুম থেকে আমরা কি বিরত থেকেছি? সব রকম বিশ্বাসঘাতকতা ও দুর্নীতি থেকে কি আমরা বিরত থেকেছি? ফিতনা-ফাসাদ থেকে কি আমরা বিরত ছিলাম? বিদ্রোহ থেকে আমরা কি দূরে ছিলাম? প্রবৃত্তির তাড়নার শিকারে আমরা পরিণত হইনি তো? পাঁচ বেলার নামায কি আমরা একাগ্রতার সাথে আদায় করেছি? তাহাজ্জুদ নামায যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, তা পড়ার ব্যাপারে আমাদের মনোযোগ ছিল তো? আমরা কি প্রতিনিয়ত মহানবী (সা.) এর প্রতি দরূদ পাঠ করেছি? নিয়মিত ইস্তেগফার কি আমরা করেছি? আমরা কি সবসময় খোদা তা’লার হামদ বা প্রশংসা করার ব্যাপারে মনোযোগী ছিলাম? আপন-পর সবাইকে আমরা সর্বপ্রকার কষ্ট প্রদান থেকে বিরত ছিলাম তো? বিনয় ও নম্র্রতা আমাদের বৈশিষ্ট্য ছিল কি? সুখ-দুঃখ সর্বাবস্থায় আমরা খোদার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম তো? সামাজিক কদাচার থেকে আমরা দূরে ছিলাম তো? কুরআনের অনুশাসনকে কি আমরা শিরোধার্য করেছিলাম? অহংকার ও গর্ব পরিহার করেছিলাম তো? ধর্মের সম্মান প্রতিষ্ঠা, ধর্মকে জাগতিকতার উপর প্রাধান্য দেয়া, ইসলামের সম্মান প্রতিষ্ঠাকে নিজেদের সম্মান ও পরিবার-পরিজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছি কি? সৃষ্টির সেবা ও সহানুভূতিতে আমরা নিজেরা মগ্ন ছিলাম কি? হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) সাথে ভ্রাতৃত্ব ও আনুগত্যের দাবী কি পূর্ণ করেছি? নিজ সন্তানদেরকে খেলাফতের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার নসীহত কি করেছি? খলীফায়ে ওয়াক্তের ও জামাতের জন্য নিয়মিত দোয়া কি করেছি? হুযুর (আই.) বলেন, যদি বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হয় আর এভাবে যদি বছর কেটে থাকে, তবে কিছু দুর্বলতা থাকলেও আমরা অনেক কিছুই লাভ করেছি। আর যদি অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে তা আমাদের জন্য সত্যিই চিন্তার বিষয়। আর এর চিকিৎসা হল এ রাতগুলোতে দোয়া করা, অঙ্গীকার ও দৃঢ়সংকল্প করা যেন খোদা তা’লা আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করেন এবং নতুন বছরে এগুলো বেশি বেশি পালনের তৌফিক দান করেন।

খুতবার শেষদিকে হুযুর (আই.) হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর একটি উক্তি পাঠ করেন যেখানে তিনি (আ.) তাঁর জামাতের সদস্যদের করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং যেসব অন্যায় আচরণ করলে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সতর্কবাণী তিনি শুনিয়েছেন। এরপর হুযুর (আই.) দোয়া করেন যে আল্লাহ যেন আমাদেরকে মসীহ মাওউদ (আ.)-এর এই নসীহত ও সতর্কবাণীকে সামনে রেখে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করার তৌফিক দান করেন, আমরা যেন বয়াতের অঙ্গীকার রক্ষাকারী হই, আমাদের জীবন যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে অতিবাহিত হয়, আমরা যেন মসীহ মাওউদের আকাংখা অনুসারে নিজেদের জীবনে পরিবর্তন করে মানুষের সামনে উন্নত দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারি। আল্লাহ তা’লা আমাদের ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্বলতা ঢেকে রাখুন এবং তাঁর নেয়ামতরাজিতে ভূষিত করুন, হযরত মসীহ মাওউদের জামাতের জন্য যেসব সফলতা নির্ধারিত আছে তা তিনি আমাদের প্রদর্শন করুন। নববর্ষ কল্যাণরাজি নিয়ে আসুক আর শত্রুর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হোক যাতে তারা ক্রমশঃ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান ও আলজেরিয়ার আহমদীদের জন্য বিশেষভাবে হুযুর দোয়া করেন। আমরা যেন দোয়ার দিকে বেশি মনোযোগী হই সেজন্যও হুযুর দোয়া করেন। আল্লাহুম্মা আমীন। সুম্মা আমীন।

Top