মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- বিশ্ব বাসীর জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন - জুমুআর খুতবা । The Holy Prophet (sa) - Mercy for all the worlds - Friday Sermon

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- বিশ্ব বাসীর জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন

রোজ শুক্রবার, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- বিশ্ব বাসীর জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন,

এখন আরবী বছরের হিসেবে রবিউল আউয়াল মাস চলছে। মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে এর ১২ তারিখে আমাদের নেতা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন পালন করা হয়। যদিও গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে আসলে মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন ৯ রবিউল আউয়াল, তথাপি এই মাস মহানবী (সা.)-এর জন্মের মাস হওয়ার কারণে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল মুসলমানদের বৃহৎ অংশ যদিও মানবতার প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহকারী মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন ঘটা করে উদযাপন করে, তথাপি তাদের নিজেদের অবস্থা হল ‘ক্বুলুবুহুম শাত্তা’ অর্থাৎ তাদের নিজেদের হৃদয় পরস্পর দ্বিধাবিভক্ত। যেভাবে কুরআনে মুসলমানদের পরিচয় বলা হয়েছে যে, তারা ‘রুহামাউ বায়নাহুম’ অর্থাৎ পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র- সেরকম তো নয়ই, বরং তারা পরস্পরের রক্তপিপাসু। প্রতিদিন তাদের হাতে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ ও রাহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মদ (সা.)-এর নামে শত-শত মুসলিম নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেন, জেনেশুনে একজন মুসলমানকেও হত্যা করার শাস্তি হল জাহান্নাম; কোন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করলেও তোমরা জাহান্নামে যাবে। ইসলামকে তারা এতটা দুর্নাম করেছে যে, আজ অমুসলিম বিশ্বে ইসলামের নাম শুনলেই তাদের মনে যে চিত্র ভেসে ওঠে তা হল অত্যাচার ও বর্বরতা। তবে একটি বিষয়ে এসব নামধারী মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও উলামারা একমত ও একজোট এবং তা হল আল্লাহ ও রসূল (সা.)-এর একটি নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, যখন মুসলমানরা পরস্পর দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একে অন্যের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে, উলামাদের অবস্থাও এতটা খারাপ হবে যে তারা আকাশের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব হবে এবং লড়াই-ঝগড়ার উৎস হবে। সেই সময় প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী আগমন করবেন এবং মুসলিম-অমুসলিম সকলের সামনে ইসলামের প্রকৃত ও অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা উপস্থাপন করে পুরো বিশ্বকে এক উম্মতে পরিণত করার কাজ করবেন। আজ উলামারা এই বিষয়টিকেই অস্বীকার করছে। শুধু তা-ই নয়, বরং সাধারণ মুসলমানদের মিথ্যা বলে তারা বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যে উস্কে দেয়।

হুযুর (আই.) বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের বিশ্বাস যা ছাড়া কোন মুসলমান নিজেকে মুসলমান দাবীই করতে পারে না তা হল মহানবী (সা.) হলেন খাতামুন্নাবিয়্যীন এবং তাঁর মাধ্যমে শরীয়ত পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু এসব মিথ্যাবাদী মৌলভীরা জনগণের আবেগ নিয়ে খেলা করে আর বলে আহমদীরা নাকি খাতমে নবুওয়ত মানে না। হুযুর বলেন, তাদের এই মিথ্যার প্রেক্ষিতে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে ‘লা’নাতুল্লাহি আলাল কাযিবীন’ পড়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। কেননা আহমদীদের মতে যে ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে খাতামুন্নাবিয়্যীন মান্য করে না সে ইসলামের গন্ডি বহির্ভূত এবং এমন ব্যক্তির সাথে জামাতের কোন সম্পর্কই নেই। হ্যাঁ, একথা সত্য যে আহমদীরা আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল (সা.)-এর বক্তব্য অনুসারে এটি মান্য করে যে মহানবী (সা.)-এর দাসত্ব ও আনুগত্যে এই উম্মতের মাঝে উম্মতি নবী আসতে পারেন, কিন্তু তাঁর (সা.) শিক্ষা ও শরীয়তকে বাদ দিয়ে বা এর বাইরে কিছু আসতে পারে না। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ.)-কে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হবার কারণে যদি নবী মেনেও থাকি, তবে তাঁকে মহানবী (সা.)-এর পরিপূর্ণ দাস হিসেবেই আমরা তা মেনে থাকি। উম্মতের বিগত বুযুর্গরাও এই বিষয়ে সহমত পোষণ করতেন।

হুযুর (আই.) বলেন, সাধারণ মানুষের উচিত উলামাদের কথা না শুনে যুগের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যে এই যুগ কি একজন সংস্কারকের দাবী করে না যার ভবিষ্যদ্বাণী মহানবী (সা.) করেছিলেন? নিঃসন্দেহে এটিই সেই যুগ, কিন্তু উলামারা তো তা স্বীকার করবে না, কারণ স্বীকার করলে তাদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। আর পাকিস্তানে তো সরকারি আইন তাদেরকে আরও লাগামহীন করে দিয়েছে। হুযুর (আই.) চারদিন পূর্বে পাকিস্তানের দোলমিয়ালে মিলাদুন্নবীর মিছিল থেকে আহমদীদের মসজিদে হামলার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, আহমদীরা তো মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল; কিন্তু পুলিশ আহমদীদেরকে মিথ্যা বলে দরজা খুলিয়েছে এবং এরপর মসজিদকে অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে, যার পরিণামে হামলাকারীরা মসজিদের জিনিসপত্র বের করে অগ্নিসংযোগ করে। হুযুর বলেন, আহমদীরা তো কলেমার জন্য, আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদ ও মহানবী (সা.)-এর সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত, জাগতিক ক্ষয়-ক্ষতি কোন বিষয় নয়। এদের মিলাদ পালন তো কেবল প্রথাগত আচার এবং আহমদীদেরকে গালিগালাজ করা যেটিকে তারা ইসলাম-সেবা মনে করে, কিন্তু প্রকৃত সেবার দায়িত্ব তো আহমদীরা পালন করছে, আর এই দায়িত্ব তখন থেকে পালন করে আসছে যখন থেকে হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) বলেন যে, ‘প্রকৃত একত্ববাদ ও মহানবী (সা.)-এর সম্মান পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য আমি এসেছি’।

এরপর হুযূর আনোয়ার (আই.) মহানবী (সা.)-এর সম্মানহানী করার যে ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছিল তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.) কর্তৃক মহান সীরাতুন্নবী (সা.) জলসা প্রবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। আর এসব জলসার মাধ্যমে সে যুগের অমুসলমানরাও মহানবী (সা.)-এর পবিত্র পবিত্র জীবন-চরিত জেনে প্রভাবিত হন আর তা তারা অকোপটে স্বীকারও করেন। এমনকি এসব সীরাতুন্নবী (সা.) জলসার কার্যকারীতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে সে সময়ের বিভিন্ন অ-আহমদী পত্র-পত্রিকা অর্থাৎ, আল্ মাশরেক এবং সুলতান পত্রিকা প্রভৃতি খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-এর এই মহতি উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে।

হুযুর (আই.) বলেন, হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) সারা মহানবী (সা.)-এর সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গিয়েছেন। হুযুর (আই.) মসীহ মাওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন লেখনী ও জীবনের বিভিন্ন ঘটনার আলোকে তুলে ধরেন যে তিনি (আ.) মহানবী (সা.)-এর কতটা অনুগত দাস ছিলেন এবং কিভাবে নিজ মনীবের জন্য উৎসর্গীকৃত ছিলেন এবং তাঁর (সা.) সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য কতটা আকুল ছিলেন।

খুতবার শেষদিকে এসে হুযুর (আই.) দোয়া করেন যে, আমরা যেন শত্রুর প্রতিটি আক্রমণ ও অত্যাচারের পর পূর্বের তুলনায় আরও বেশি নিজেদেরকে ঈমানে সমৃদ্ধ করতে থাকি এবং মহানবী (সা.)-এর উপর আরও বেশি বেশি দরূদ পাঠ করতে থাকি যেন মুসলমানদেরও মহানবী (সা.) প্রকৃত মর্যাদার জ্ঞান লাভ হয় আর বিকৃতির শিকার মুসলমানরা যেন সঠিক পথে আসে এবং বিশ্ববাসীর সামনে যেন ইসলামের অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটে। আমীন। সুম্মা আমীন।

Top