৫০তম সালানা জলসা, যুক্তরাজ্য ২০১৬ - জুমুআর খুতবা । 50th Jalsa Salana U.K. 2016 - Friday Sermon

৫০তম সালানা জলসা, যুক্তরাজ্য ২০১৬

রোজ শুক্রবার, ১২ই আগস্ট, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১২ই আগস্ট, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “৫০তম সালানা জলসা, যুক্তরাজ্য ২০১৬”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর বলেন, আজ আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় আহমদীয়া জামাত, যুক্তরাজ্যের বার্ষিক জলসা শুরু হতে যাচ্ছে, ইনশাআল্লাহ। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) জলসায় অংশগ্রহণকারীদের নিকট যে প্রত্যাশা রেখেছেন আল্লাহ্ তা’লা করুন এই জলসায় আগমনকারীরা যেন তা পুরোপুরি পূর্ণ করতে পারে এবং তারা যেন সেই দোয়ার ভাগীদার হতে পারে যা তিনি (আ.) তাদের জন্য করে গেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই জলসা কোন জাগতিক মেলায় অংশগ্রহণ করার মত নয়। অতএব এ দিনগুলোতে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী যেন কেবল ধর্মীয় জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতিই তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে।

অতএব প্রত্যেকের একথা দৃষ্টিতে রাখা উচিত যে, বক্তারা অনেক সময় ব্যয় করে, পরিশ্রম করে যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন তা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং স্মরণ রাখা আবশ্যক।

হুযূর বলেন, আমি মনে করি কোন পুরুষ বা মহিলা এসব বক্তৃতার অর্ধেকও যদি মনে রাখে তবে নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক মানকে তারা অনেক গুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক স্থানে বলেন, প্রত্যেকের মনোযোগের সাথে বক্তৃতামালা শ্রবণ করা উচিত। তিনি (আ.) আরো বলেন, পূর্ণ মনোযোগ এবং অভিনিবেশ সহকারে শোন কেননা এটি ঈমানের বিষয়। এক্ষেত্রে আলস্য প্রদর্শন এবং উদাসীনতা মন্দ পরিণতি সৃষ্টি করে।

অতএব জলসায় আগমনকারী প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজের হৃদয়ে এ কথা বদ্ধমূল করে যে, তাকে তিন দিনের জন্য জাগতিক বিষয়াদি ভুলে গিয়ে নিজের ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক মানকে বৃদ্ধি করতে হবে। আল্লাহ্ তা’লা সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন।

হুযূর বলেন, এখানে আমি জলসায় অংশগ্রহণকারী সবার দৃষ্টি এদিকেও আকর্ষণ করতে চাই যে, অতিথিদের সেবার জন্য যেসব পুরুষ ও মহিলা কর্মি নির্বাচন করা হয়েছে, বরং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর অতিথিদের সেবা করার জন্য যারা এদিনগুলোতে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেছেন, যাদের মাঝে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছে এবং এমন লোকের সংখ্যাও অনেক যারা ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরী-বাকরী করে। এছাড়া কতক লোক এমনও রয়েছেন যারা বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত আছেন, কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর অতিথিদের সেবা করার যে স্পৃহা তা এক স্কুল ছাত্র, এক শ্রমিক, এক ব্যবসায়ী, এক উচ্চ পদস্থ কর্মচারী মোটকথা সবাইকে এক কাতারে বা লাইনে নিয়ে এসেছে। তাই যেসব অতিথি কর্মীদের সাথে অসদাচরণ করে তাদের নিজ আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত এবং কর্মীদের সম্মানের প্রতি দৃষ্টি রাখা উচিত। যদিও কর্মীদেরকে এই নসীহত করা হয় যে, আপনারা সর্বাবস্থায় ধৈর্য এবং উৎসাহের সাথে কাজ করবেন কিন্তু মানবীয় দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে কোন কোন কর্মী কঠোর জবাবও দিয়ে বসে। অতএব অতিথিদেরও উচিত কর্মীদের প্রতি সম্মান এবং মর্যাদা প্রদর্শন করা এবং এমন কোন আচরণ না করা যাতে বিবাদ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একবার এ ধরণের লোক যারা বিভিন্ন জিনিসের চাহিদা ব্যক্ত করে তাদের সম্বন্ধে বলেন, দেখ! কোন অতিথি যদি এজন্য এখানে আসে যে, এখানে সে আরাম পাবে, ঠান্ডা শরবত খেতে পারবে অথবা সুস্বাদু খাবার দেয়া হবে, তবে সে নিতান্তই বাহ্যিক জিনিসের জন্য এসে থাকে। যদিও অতিথি সেবকদেরই এটি দায়িত্ব যে, যতদূর সম্ভব আতিথেয়তায় যেন কোন ঘাটতি না থাকে এবং অতিথিদের জন্য যেন যথাসম্ভব আরামের ব্যবস্থা করা হয় কিন্তু অতিথিদের এমন ধারণা নিয়ে আসা তাদের জন্যই ক্ষতির কারণ। অতিথিদের উচিত সুযোগ সুবিধা যেমনই থাকুক না কেন আল্লাহ্ তা’লার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা এবং প্রত্যেক বিভাগের কর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা যারা দিনরাত এক করে আতিথেয়তার চেষ্টা করছে। আর জলসার এই তিনদিনে অতিথিদেরও খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টায় রত থাকা উচিত। আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহ যাচনা ও কৃপা কামনা করে, প্রত্যেক মন্দ কাজ থেকে আশ্রয় প্রার্থনার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করা উচিত। মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোন স্থানে অবস্থান করতঃ অথবা সাময়িক অবস্থানরত অবস্থায় এই দোয়া করে যে, আমি আল্লাহ্ তা’লার পূর্ণাঙ্গীন আদেশের আশ্রয়ে আসছি এবং সকল মন্দ বিষয় থেকে আল্লাহ্ তা’লার আশ্রয় চাইছি, এমন লোকের সেই আবাসস্থল ছেড়ে যাওয়া অথবা যদি অস্থায়ী আবাস হয়ে থাকে তাহলে সেখান থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত কোন জিনিসই ক্ষতি সাধন করবে না।

হুযূর বলেন, নামাযের জন্য সময়মত আসবেন কোন কারণে আমার আসতে বিলম্ব হলে ধৈর্য ধরে দোয়া দরূদ পাঠ করতে থাকুন।

জলসার সময় ইতিহাস এবং আর্কাইভ বিভাগের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া রিভিউ অব রিলিজিয়ন্স গত বছরের মত এবারও পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন পুরনো কপি ও হযরত ঈসা (আ.)-এর কাফনের বরাতে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। এই উভয় প্রদর্শনী নিজ নিজ গন্ডিতে খুবই তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ। পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সময় নির্ধারিত রয়েছে, এত্থেকেও লাভবান হওয়ার চেষ্টা করুন।

হুযূর আরো বলেন, বিশেষভাবে পার্কিং ও স্ক্যানিং-এর জায়গা এবং জলসাগাহে সব সময় সবার সতর্ক থাকা আবশ্যক ও চারপাশে দৃষ্টি রাখা উচিত। কোথাও কোন অস্বাভাবিক জিনিস দৃষ্টিগোচর হলে অথবা কোন অস্বাভাবিক কর্মকান্ড দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপনাকে অবহিত করুন আর নিজেও সতর্ক হয়ে যান। কিন্তু কোন অবস্থাতেই উদ্বিগ্ন বা ভীত হওয়া উচিত নয়। যারা নিজেদের প্রাইভেট তাবুতে অথবা সমষ্টিগত আবাসস্থলের মার্কীতে রয়েছেন তারা এই বিষয়টিও খেয়াল রাখবেন যে, নিজেদের মূল্যবান জিনিস-পত্র ও টাকা পয়সা ইত্যাদি নিজেদের সাথে রাখুন। বিশেষভাবে মহিলারা স্মরণ রাখবেন, নিজেদের অলংকার ইত্যাদি যা রয়েছে তা পরিধান করে থাকুন। প্রথমত জলসাতে অলংকার ইত্যাদি নিয়ে আসাই উচিত নয়। এখানে ধর্মীয় পরিবেশে দিন অতিবাহিত করার জন্য এসেছেন, কোন জাগতিক অনুষ্ঠানের জন্য আসেন নি। নিজেদের জামা কাপড় ও অলংকারাদীর পরিবর্তে নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত।

খুতবার শেষদিকে হুযূল বলেন, আমি পুনরায় বলছি, এই দিনগুলোতে দোয়ার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দিন। নামায এবং নফল ছাড়াও যিকরে ইলাহী এবং দরূদ শরীফ পাঠ এবং অন্যান্য দোয়ায় রত থেকে সময় অতিবাহিত করুন।

আল্লাহ্ তা’লা এই জলসাকে সবদিক থেকে আশিসমন্ডিত করুন, আমাদের সবার দোয়া গ্রহণ করুন এবং সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে আমাদেরকে সুরক্ষিত রাখুন। (আমীন)

Top