যুক্তরাজ্যের বার্ষিক জলসার কর্মী ও অতিথির দায়-দায়িত্ব - জুমুআর খুতবা । Duties and responsibilities of volunteers and guest - Jalsa Salana U.K. 2016 - Friday Sermon

যুক্তরাজ্যের বার্ষিক জলসার কর্মী ও অতিথির দায়-দায়িত্ব

রোজ শুক্রবার, ৫ই আগস্ট, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৫ই আগস্ট, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “যুক্তরাজ্যের বার্ষিক জলসার কর্মী ও অতিথির দায়-দায়িত্ব”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর বলেন, আগামী শুক্রবার থেকে যুক্তরাজ্য জামাতের বার্ষিক জলসা আরম্ভ হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ্। হাদীকাতুল মাহদীতে ইতিমধ্যেই জলসার কাজ আরম্ভ হয়েছে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে যেখানে মানুষ জগত পূজায় রত সেখানে শুধুমাত্র হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাতের নিষ্ঠাবান সদস্যরা ধর্মের খাতিরে অহোরাত্র স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে অস্থায়ীভাবে জলসার পুরো অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা করছেন। এটি একমাত্র আহমদীয়া জামাতেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য অন্য কোথাও এর তুলনা পাওয়া যায় না।

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন উন্নত দেশে বড় বড় ‘হলে’ জলসার আয়োজন করা হলেও যুক্তরাজ্যের জলসা এমন এক স্থানে অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সব আয়োজনই করতে হয় অস্থায়ীভাবে। এবং মাত্র ২৮দিন আমরা এই স্থানটি জলসার জন্য ব্যবহার করতে পারি আর সবকাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র এই কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হয়। তাই এ স্বল্প সময়ের মধ্যে পুরো আয়োজন সম্পন্ন করতে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হয়। আল্লাহ্‌র ফযলে ধর্মসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জামাতের কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ এবং নারীরা স্বানন্দ্যে এই দায়িত্ব পালন করছেন।

হুযূর বলেন, রীতি অনুসারে সকল কর্মকর্তা, কর্মী ও স্বেচ্ছা সেবককে অতিথি সেবার গুরুত্ব এবং অতিথিকে সম্মান করার আবশ্যকতা সম্পর্কে কয়েকটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

পবিত্র কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর অতিথিসেবার বিবরণ রয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) অতিথির সম্মান করতেন এবং অতিথিসেবায় সদা অগ্রগামী থাকতেন। তিনি তাঁর ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত দ্বারা সাহাবী এবং উম্মতকে কীভাবে অতিথিসেবা করতে হয় তাও শিখিয়ে গেছেন। মহানবী (সা.) অতিথির সংখ্যা বেশি হলে সাহাবীদের মাঝে তাদেরকে ভাগ করে দিতেন এবং নিজেও কিছু অতিথি নিয়ে বাড়ীতে যেতেন আর অকৃত্রিমভাবে তাদের সেবাযত্ন করতেন। সাহাবীরাও তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের সন্তানদের অভুক্ত রেখে যা আছে তাই দিয়ে অতিথিসেবা করেছেন। এমনকি কোন এক সাহাবীর এমন আচরণ দেখে ঊর্ধ্বলোকে খোদা তা’লাও মুচকি হেসেছেন।

আর এ যুগে তাঁরই নিবেদিতপ্রাণ দাস হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) অতিথি সেবার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেন নি এবং তিনি তাঁর জামাতকে অতিথি সেবার জন্য বিভিন্ন মূল্যবান নসীহত করে গেছেন। এমনকি তাঁর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যাবলীর মধ্যে একটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, ধর্মের খাতিরে যারা দূর-দূরান্ত হতে সফর করে তার কাছে আছেন সেসব মানুষের অতিথিসেবা করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শাখা হল, অতিথিগণ এবং সত্যের অন্বেষণে আগত ব্যক্তিবর্গ, যারা এ স্বর্গীয় প্রতিষ্ঠানের সংবাদ পেয়ে নিজ নিজ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রেরণায় সাক্ষাৎ করতে আসেন তাদের আতিথ্য করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ্ আগেই বলে দিয়েছেন যে, দূর-দূরান্ত হতে ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ তোমার কাছে আসবে, অতিথির আধিক্য দেখে তাদের সাথে কঠোর ব্যবহার করবে না আর তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে তুমি ক্লান্তও হয়ো না।

হুযূর বলেন, এখানে যুগ খলীফার উপস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে আহমদীরা জলসায় আসেন আর আজকে মসীহ্‌র এই দাস কোনরূপ ভ্রুকুঞ্চিত না করে হাসিমুখে সবার সেবা করে যাচ্ছে।

হুযূর বলেন, প্রত্যেকের স্বভাব ও অভ্যাস ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, তাই ব্যবস্থাপক এবং কর্তব্যরতদের দায়িত্ব হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে, হাসিমুখে সবাইকে সাদর সম্ভাসন জানানো এবং নিঃস্বার্থভাবে তাদের সেবা করা। তাদের জন্য আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের যথাসম্ভব উত্তম বিধান করা কর্তব্য।

অতিথিরা অনেক সময় কষ্টও দিয়ে থাকে। বিশেষ করে মানুষ যখন দীর্ঘ পথ ভ্রমন করে এখানে এসে পৌঁছেন তখন অভ্যর্থনার দায়িত্বে নিয়োজিতদের হাসিমুখে তাদের বরণ করা উচিত এমনকি প্রয়োজনে তাদের জিনিষপত্র আবাসনস্থল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া কর্তব্য।

মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ওপর একবার ইলহাম হয় যে, গতরাতে অতিথি শালায় অতিথিদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি। এই ইলহামের পর তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ছয়মাসের জন্য শাস্তিস্বরূপ কাদিয়ান থেকে বহিস্কার করেন। এবং তিনি স্বয়ং অতিথিদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।

হুযূর বলেন, এই আদর্শ ও শিক্ষা যাতে আমরাও জলসায় আগত অতিথি সেবার ক্ষেত্রে অবলম্বন করতে পারি সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করুন এবং বেশি বেশি দোয়া করুন।

হুযূর বলেন, আজ আহমদীয়া জামাতের সদস্যরা ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও শুধুমাত্র ধর্মের খাতিরে মানুষ এরূপ অতিথিসেবা করে না। জলসার একটি বড় কাজ অতিথি সেবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই এ বিভাগকে আলস্য বা উদাসিনতা দেখালে চলবে না।

আবাসন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, পার্কিং এর সুব্যবস্থা করা, খাবার সরবরাহ্, জলসার অনুষ্ঠানাদি শোনানোর ব্যবস্থা করা এসবই অতিথিসেবা বিভাগের কাজ। কাজেই আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে নিষ্ঠার সাথে অতিথিদের সেবা করা, তাদের সম্মান করা এবং দায়িত্ববোধের চেতনা নিয়ে নিজ নিজ কাজ করার তৌফিক দিন।

হুযূর বলেন, আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের সেবা দেখে আপন-পর সবাই মুগ্ধ হয়। গতবার উগান্ডার একজন মন্ত্রী আমাদের কর্মীদের সেবা দেখে বলেন, মানুষ এভাবে মানুষের সেবা করতে পারে তা আমি জানতাম না। আমি ভাবতেও পারতাম না যে, আমি ফিরিশতাদের জলসায় যাচ্ছি। বিশ বারও কোন জিনিষ চাইলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে তা হাসিমুখে হাজির করত।

ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে সবাইকে পানি পান করায়, আমাদের সকল বিভাগের সব কর্মীর মাঝেই এই বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত আর আল্লাহ্‌র কৃপায় এখন পর্যন্ত এই বৈশিষ্ট্যই দেখা যাচ্ছে।

মহানবী (সা.)-এর হাদীসের আলোকে হুযূর বলেন, ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলা একটি পুণ্য কাজ। কোনভাবেই কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। অতিথিকে সম্মান করলে মানুষ পুণ্যের ভাগী হয়। আগত অতিথির সাথে হাসিমুখে কথা বলা এক প্রকার সদকা। কাউকে পথ দেখানোও পুণ্যের কাজ। অতএব জলসায় আগত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর অতিথিদের সেবা প্রদানের জন্য আমাদের সব কর্মীকে এ বিষয়গুলো দৃষ্টিপটে রাখতে হবে। আর দোয়া করতে হবে, যেন আল্লাহ্ এই তুচ্ছ সেবা গ্রহণ করে আমাদের ধন্য করেন।

হুযূর সকল কর্মীকে এবং জামাতের সকল সদস্যকে জলসার সার্বিক সফলতার জন্য দোয়ার অনুরোধ জানান।

Top