বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আহমদীয়া জামাতের সদস্যদের করণীয় - জুমুআর খুতবা । In light of current world situation, duties and responsibilities of Ahmadiyya Muslim Jama'at - Friday Sermon

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আহমদীয়া জামাতের সদস্যদের করণীয়

রোজ শুক্রবার, ২৯শে জুলাই, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২৯শে জুলাই, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আহমদীয়া জামাতের সদস্যদের করণীয়”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর বলেন, বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমশঃ অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষভাবে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। মুসলমান রাষ্ট্রপ্রধানগণ বা নেতৃবৃন্দরা এ বিষয়ে ভ্রক্ষেপহীণ। তারা কুরআনের শিক্ষা কি তা জানে না আর এর ওপর আমলও করছে না, ফলে সর্বত্র নৈরাজ্য ও হানাহানি দেখা দিয়েছে। যদি তারা ইসলামী শিক্ষা বা কুরআন না বুঝে বা বুঝতে না চায় তাহলে অন্তত তাদের বিবেক-বুদ্ধি খাঁটানো উচিত। কিন্তু তারা তাও করছে না ফলে, ইসলাম বিরোধী শক্তি এত্থেকে ফায়দা লুফে নিচ্ছে। আর ইসলামের দুর্নাম হচ্ছে সর্বত্র।

হুযূর বলেন, প্রজা বা সাধারণ জনগণও তাদের দায়িত্ব পালন করছে না। ফলে তারা বিভিন্ন প্রকার যুলুম-নির্যাতনের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামের নামে স্বদেশে ও বহির্বিশ্বে বিভিন্ন আত্মঘাতি আক্রমণ চালিয়ে নিরীহ ও নিষ্পাপ লোকদের হত্যা করছে নির্বিচারে। এরফলেও লাভবান হচ্ছে ইসলামের শত্রুরা আর ইসলাম হচ্ছে দুর্নামের শিকার।

হুযুর আরো বলেন, এমনও হতে পারে ইসলামের শত্রুরাই এ ধরণের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের দ্বারা এমন বর্বর আক্রমণ চালাচ্ছে যাতে ইসলামের দুর্নাম হয়। আর তখন তারা সহানুভূতির নামে উভয়পক্ষের কাছে সহমর্মীতা প্রদর্শনের চেষ্টা করে আর অস্ত্র-বাণিজ্য আরম্ভ করে। হুযূর বলেন, ইসলাম শব্দের অর্থই হচ্ছে, নিজে শান্তিতে থাকা এবং অপরকে শান্তিতে রাখা। আর পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ্‌ তা’লা বলেছেন, “আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে শান্তির নিবাসের প্রতি আহ্বান করেন”। হুযূর বলেন, ইসলাম সন্ত্রাসের নয় বরং শান্তির ধর্ম। মহানবী (সা.) যুদ্ধ অভিযানে প্রেরণের সময়ও বিশেষভাবে নির্দেশ দিতেন যেন কোন বৃদ্ধ, শিশু ও নারীকে হত্যা করা না হয় এবং যারা যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় তাদেরকেও হত্যা না করা হয়। অতএব কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দ্বারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা বা ইসলামের প্রচার-প্রসার সম্ভব নয় বরং ইসলামের আকর্ষণীয় ও অনুপম শিক্ষার মাধ্যমে এর প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর বর্তমান যুগে ইসলাম প্রচার করতে হলে এ যুগের হাকাম ও আদাল অর্থাৎ হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর জামাতভুক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বেই এ কাজ করা সম্ভব। কেননা এ কাজ তিনিই সম্পাদন করতে পারেন, যাকে আল্লাহ্‌ তা’লা এর দায়িত্ব দিয়েছেন। আর এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দায়-দায়িত্ব সন্ত্রাসবাদীদের উপরই বর্তায়, এজন্য কোনক্রমেই ইসলাম দায়ি নয়।

হুযুর আরো বলেন, আমরা আহমদীরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, যাদেরকে আল্লাহ্ তা’লা যুগ-মসীহকে মানার সৌভাগ্য দিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের ওপর তাঁর মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও বর্তায়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একস্থানে তাঁর জামাতকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমরা আল্লাহ্‌ ও বান্দার প্রাপ্য অধিকার প্রদান কর। ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হলেই যে তাকে কষ্ট দিবে এমন শিক্ষা ইসলাম দেয় না বরং সবার প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মীতা প্রদর্শন আবশ্যক। তাই আমাদের সবাইকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তি- নিরাপত্তা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

সম্প্রতি ফ্রান্সে একজন পাদ্রিকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, এর সাথে ইসলামের দূরতম কোন সম্পর্কও নাই। আর আজ একথা শুধু আমরাই বলছি বা বরং তাদের লোকেরাই বলছে, এমনকি পোপও বলেছেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে নিঃসন্দেহে কিন্তু এটি কোনভাবেই ধর্মীয় যুদ্ধ নয়। কেননা, কোন ধর্মই যুদ্ধের শিক্ষা দেয় না।

হুযূর বলেন, যারা ইসলামী শিক্ষামালা নিয়ে কটূক্তি করে বা কটাক্ষ করে তাদের আপত্তির উত্তর দেয়াও আজ আহমদীয়া জামাতের দায়িত্ব। বিরোধিতার এই যুগে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে। মনে রাখবেন, ইসলামের বিশ্ববিজয় অবধারিত আর আহমদীয়াতের মাধ্যমেই ইসলামের পুনর্জাগরণ ও বিশ্ববিজয় হবে কিন্তু তাই বলে আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। আমাদের দোয়া করা উচিত, আমাদের জীবদ্দশায়ই যেন এই বিজয় আসে। আমাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা যেন আমাদেরকে এই বিজয় থেকে দূরে ঠেলে না দেয়।

হুযুর বলেন, পৃথিবীর সর্বত্র আজ এই প্রশ্ন করা হয় যে, তোমরা নিজেরাই তো হুমকিগ্রস্ত, তাহলে তোমরা কি করে ইসলাম প্রচার করবে। নিঃসন্দেহে আমরা আপন-পর সবার পক্ষ থেকে হুমকির সম্মুখীন কিন্তু তারপরও আজ আমাদেরকেই দোয়ার সাথে এই কাজ করতে হবে। এছাড়া সকল অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য আমাদেরকে নিয়মিত সদকা ও দোয়া করতে হবে। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সদকা-খয়রাত আবশ্যক কিন্তু যারা সদকা করার সামর্থ্য রাখে না তারা যেন সকল পুণ্যকাজ করে। আর যারা আর্থিক কুরবানী করে তাদের জন্যও পুণ্যকর্ম আবশ্যক, নতুবা তাদের এই দান-খয়রাত কোন কাজে আসে না।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার জন্য দোয়ার দ্বার উম্মুক্ত করা হয় তার জন্য রহমতের দ্বার খুলে দেয়া হয়। আর বান্দার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা লাভের দোয়া খোদার খুবই প্রিয়।’

হুযূর বলেন, সকল পূর্বাপর বিপদ থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করা একান্ত আবশ্যক। কেননা, খোদার দৃষ্টিতে দোয়ার চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই। মনে রাখবেন, দোয়া ও সদকার মাধ্যমে সকল বিপদাপদ দূরে হয়ে যায়। আর দোয়া গৃহীত হওয়ার জন্য নিজের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন আবশ্যক। আর আত্মিক পবিত্রতার ফলেই খোদার কৃপা ও অনুগ্রহরাজি লাভ হয়।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, আমি দোয়া করি আর তোমাদেরও দোয়ায় লেগে থাকা উচিত। নিয়মিত নামায পড় আর দোয়ায় রত থাক। মনে রাখবে, পুরো ঘরে যদি একজনও খোদার নির্দেশ অনুসারে পুণ্যকাজ করে তাহলে সেই ঘরে আল্লাহ্ রহমত বর্ষণ করেন।

এরপর হুযূর কুরআন, হাদীস ও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন দোয়া পাঠ করে জামাতের সদস্যদের নিয়মিত তা পাঠ করার জন্য অনুরোধ জানান।

কুরআনের একটি অনুপম দোয়া যা মহানবী (সা.) এবং মসীহ্ মওউদ (আ.)ও নিয়মিত করতেন তাহল, (“রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়াকীনা আাযাবান নার”) অর্থাৎ, হে আমাদের আল্লাহ্! আমাদেরকে পার্থিব কল্যাণরাজি দান কর আর পারলৌকিক কল্যাণেও ভূষিত কর এবং আগুনের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা কর।

আরেকটি দোয়া হল, (“রাব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইকা মিন খাইরিন ফাকির”) অর্থাৎ, হে আল্লাহ্! আমাদের প্রতি তোমার কল্যাণরাজি থেকে যা কিছু নাযিল করতে চাও আমি তার ভিখারী।

মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর একটি ইলহামী দোয়া হল, রাব্বি কুল্লু শাইঈন খাদিমুকা রাব্বি ফাহফাজনি ওয়ানসুরনী ওয়ার হামনী।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে দোয়া করার তৌফিক দিন। উম্মতে মুসলমাকে বিবেক-বুদ্ধি দিন যাতে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে আর খোদার পক্ষ থেকে আবির্ভূত মহাপুরুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। আমীন।

Top