হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যাপিত জীবনের আলোকে বিভিন্ন মূল্যবান উপদেশ - জুমুআর খুতবা । Valuable advice based on the life of Promised Messiah (as) - Friday Sermon

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যাপিত জীবনের আলোকে বিভিন্ন মূল্যবান উপদেশ

রোজ শুক্রবার, ২২শে জুলাই, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২২শে জুলাই, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যাপিত জীবনের আলোকে বিভিন্ন মূল্যবান উপদেশ”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.)-এর ভাষায় বর্ণিত ঘটনাবলী উল্লেখ করেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) কোনভাবেই অলস ছিলেন না। তিনি কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। নিভৃতচারী হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রমের কোন কাজ থেকে পিছিয়ে থাকতেন না। কোথাও যেতে হলে অধিকাংশ সময় তিনি সেবককে বাহনে বসিয়ে নিজে পদব্রজে যেতেন, খুব কমই তিনি বাহন ব্যবহার করতেন এমনকি ২০/২৫ মাইল দূরত্ব তিনি অনায়াসে পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতেন। জীবন সায়াহ্নে অসুস্থ থাকা সত্বেও তিনি প্রতিদিন হাঁটতে যেতেন এবং ৪-৫ মাইল হাঁটতেন। এমনকি কোন কোন দিন ফজরের আগেই হাঁটতে বের হতেন এবং বাটালা যাওয়ার পথিমধ্যে অবস্থিত একটি গ্রাম যা কাদিয়ান থেকে সাড়ে পাঁচ মাইল দূরত্বে ছিল সেখানে পৌঁছার পর ফজরের নামাযের সময় হত।

হুযূর বলেন, এ কথার মধ্যে আমাদের জামাতের মুরব্বী এবং ওয়াকেফে যিন্দেগীদের শিক্ষণীয় রয়েছে। যাদের ওপর জামাতের গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব অর্পিত তারা যদি স্বাস্থ্য সচেতন না হন তাহলে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। প্রতিদিন শরীরচর্চা করা বা হাঁটার অভ্যাস রপ্ত করা উচিত। এছাড়া পাশ্চাত্বের যেসব অস্বাস্থ্যকর খাবার রয়েছে তাও পরিহার করা উচিত। প্রয়োজনে মুরুব্বীকে কিছুটা হলেও রান্না-বান্না শেখা উচিত।

হুযূর বলেন, আমি শুধু আপনাদের উপদেশই দিচ্ছি না বরং আমি নিজেও আল্লাহ্‌র ফযলে প্রতিদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করি।

এরপর হুযূর বলেন, জামাতের মুরব্বী এবং বক্তাদের উচ্চস্বরে কথা বলার চর্চা করা উচিত। কেননা এখনও দরিদ্র দেশগুলোতে সব জায়গায় মাইকের সুব্যবস্থা নাই। তাই আপনাদের কথা মানুষের কানে পৌঁছানোর জন্য উচ্চস্বরে কথা বলার অভ্যাস করা উচিত। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) সাধারণত নিম্নস্বরে কথা বলতেন কিন্তু লাহোরের প্রশস্ত হলে যখন তিনি বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করেন তখন অভ্যাসবশে শুরুতে কিছুটা নিম্নস্বরে কথা বললেও আস্তে আস্তে তিনি উচ্চকন্ঠ হন এমনকি তখন তাঁর বজ্র নিনাদ আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে ফিরিশতারা বিউগল বাজাচ্ছে। অতএব এদিকেও আমাদের মুরব্বীদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

হুযূর বলেন, অনেকেই নিজেদের পুণ্যের মান ধরে রাখতে পারেন না বলে উৎকন্ঠিত হন। এটি খুবই ভাল কথা। এরফলে মানুষ আত্মবিশ্লেষণ করার সুযোগ পায়। মহানবীর যুগেও সাহাবীদের এমনটি হত, যখন তারা নবীর সাহচর্যে থাকতেন তখন এক ধরনের ঈমানী উচ্ছাস বা আবেগ কাজ করত আর তাঁর থেকে দূরে তা কমে যেত। অতএব, সর্বদা আত্মবিশ্লেষণ করতে থাকা মু’মিনের কাজ। তাহলে যদি কোথাও দুর্বলতা বা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় তা দূর করার জন্য চেষ্টা করতে পারবে। কোনভাবই উদাসীন হওয়া উচিত নয় তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় এবং আধ্যাত্মিক রোগ-ব্যাধির শিকার হয়ে যায়।

এরপর হুযূর বলেন, মানুষের সুখ-দুঃখের বিষয়টি অনুভূতির সাথে সম্পর্ক রাখে। কারো বাড়ীতে বিয়ে হলে সে বাড়ীর মানুষ আনন্দিত হবে এটিই স্বাভাবিক কিন্তু যারা এর সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এই আনন্দ তাদের ভেতর কোন প্রভাব ফেলে না। প্রিয়জনের আনন্দের মুহূর্ত হলে মানুষের হৃদয়ে বিশেষভাবে ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে কেউ মারা গেলে সেই বাড়ীর লোকেরা বা তার আত্মীয়-স্বজন শোকাভিভূত হয় আর এটি স্বাভাবিক হলেও অন্যদের এতে কিছুই যায় আসে না।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, অন্যের জন্য যদি মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতির চেতনা থাকে তাহলে মানুষ তার সুখ-দুঃখে ভাগী হতে পারে আর এভাবেই জামাতের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি হয়।

এরপর খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর খোদাভীতি ও ধর্মীয় আত্মাভিমান সম্পর্কে হুযূর একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। এর প্রেক্ষাপটে হুযূর বলেন, জামাত যখন কাউকে শাস্তি দেয় তখন সে বলে জামাতের এই সিদ্ধান্ত ভুল। জামাত অন্যের পক্ষ নিয়ে আমাদেরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিয়েছে।

আসল কথা হল, কোন বিষয় যত ছোটই হোক না কেন তা যদি নৈরাজ্য সৃষ্টির কারণ হয় তাহলে ব্যবস্থাপনা তাকে শাস্তি দেয় আর কোন বিষয় যত বড়ই হোক না কেন তা যদি সার্বজনীন ফিতনার কারণ না হয় তাহলে সেক্ষেত্রে শাস্তি দেওয়া হয় না।

কাজেই, যাদের শাস্তি দেওয়া হয় তাদের হঠকারী না হয়ে অনুশোচনা করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এমন আছে যারা ক্ষমা প্রত্যাশী হলেও নিজেদের সংশোধনের ব্যাপারে খুবই উদাসীন।

এরপর হুযূর তবলীগের জন্য অধুনা প্রচার মাধ্যমের ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে কীভাবে তবলীগ করা হত তা বর্ণনা করেন। হুযূরের বিভিন্ন দেশে সফরের ফলে প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে সেসব দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে ইসলাম ও আহমদীয়াতের সংবাদ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া জামাতের কেন্দ্রীয় প্রেস বিভাগও এক্ষেত্রে মূল্যবান ভূমিকা রাখছে।

খুতবার শেষদিকে হুযূর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর লেখা একটি শিক্ষামূলক গল্পের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ওপর নির্ভরতা ও আস্থার গুরুত্ব এবং এর উপকারীতা বর্ণনা করেন।

Top