জুমুআর নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য - জুমুআর খুতবা । Significance of Jumu'ah Prayers - Friday Sermon

জুমুআর নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

রোজ শুক্রবার, ১লা জুলাই, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১লা জুলাই, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “জুমুআর নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) সূরা জুমুআর ১০ থেকে ১২ নাম্বার আয়াত পাঠ করেন। এরপর তিনি বলেন, আজ ২৫ রোযা। কুরআনে আল্লাহ্ বলেছেন, রমযানের দিনগুলো মূলতঃ হাতে গোনা কয়েকটি দিন। এবার রমযান শুরু হওয়ার পূর্বে আমাদের মধ্য হতে অনেকেই হয়ত ভেবেছিলেন যে, একেতো গ্রীষ্মকাল তার ওপর আবার দিনও অনেক বড়, কীভাবে রোযা রাখা সম্ভব হবে? কিন্তু আল্লাহ্‌র ঘোষণা অনুসারে দেখুন! দেখতে দেখতে আজ ২৫ রোযা আমরা পার করছি। যদি নিয়্যত স্বচ্ছ হয় তাহলে আল্লাহ্ মানুষকে তৌফিক দেন।

হুযূর বলেন, আজ রমযানের শেষ জুমুআ, এদিনটি অ-আহমদী সমাজে জুমুআতুল বিদা বলে প্রসিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে জুমুআতুল বিদা বলে কিছু নেই। অ-আহমদীরা মনে করে, সারা বছর নামায না পড়ে বা ইবাদত না করে শুধুমাত্র আজকের জুমুআ পড়লেই তাদের সারা বছরের পাপ ক্ষমা হয়ে যাবে। কিন্তু যুগ ইমামকে মানার কল্যাণে আমরা আহমদীরা এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত। তবে কেউ যদি অনুশোচনার সাথে এদিন জুমুআর নামাযে আসে, তওবা করে এবং আগামীতে আর কোন নামায পরিত্যাগ না করার অঙ্গীকার করে তাহলে হয়ত আল্লাহ্ তার দোয়া গ্রহণ করবেন।

হুযূর বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক জুমুআর গুরুত্বই সমান। আর কুরআন ও হাদীস থেকেও একথাই প্রমাণিত। কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, “হে যারা ঈমান এনেছো! জুমুআর দিনের একটি অংশে যখন নামাযের জন্য তোমাদের ডাকা হয় তখন আল্লাহ্‌কে স্মরণ করতে দ্রুত এগিয়ে আস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দাও। তোমাদের জন্য এটিই উত্তম, যদি তোমরা তা জানতে”।

আর নামায শেষ হয়ে গেলে তোমরা (কাজকর্মের জন্য) পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের সন্ধান কর এবং আল্লাহ্‌কে বেশি বেশি স্মরণ কর যাতে তোমরা সফল হতে পার।

আর তারা যখন কোন ব্যবসায়িক কাজ অথবা আমোদ-প্রমোদের (বিষয়) দেখতে পাবে তখন তারা তোমাকে একাকী রেখে এর দিকে ছুটে যাবে। তুমি বল, ‘আল্লাহ্‌র কাছে যা আছে তা আমোদ-প্রমোদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চেয়ে অনেক উত্তম। আর আল্লাহ্ সর্বোত্তম রিয্‌কদাতা’।

এছাড়া হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমুআর দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন আল্লাহ্ বান্দার দোয়া গ্রহণ করেন। তবে, সেই মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। এরপর আরেকস্থলে বলেছেন, জুমুআর দিন মসজিদের প্রত্যেক দরজায় ফিরিশ্তারা দন্ডায়মান হন এবং যে আগে মসজিদে আসে তার নাম আগে লিখে এরপর পর্যায়ক্রমে মুসল্লীদের নাম লিপিবদ্ধ করে। আর খুতবা আরম্ভ হলে রেজিষ্টার বন্ধ করে তারা নামাযে শামিল হয়ে যায়। আরেক জায়গায় বলেন, যে জুমুআর নামাযের জন্য আগে মসজিদে আসে তার পুরস্কার হল উট আর সে শেষে আসে তার পুরস্কার হচ্ছে ডিম। মহানবী আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি অকারণে লাগাতার তিনটি জুমুআ পরিত্যাগ করে আল্লাহ্ তার হৃদয়ে মোহর মেরে দেন। উপরোক্ত কুরআনের আয়াত ও হাদীসের নির্দেশাবলী থেকে রমযানের গুরুত্ব সুস্পষ্ট। তাই জুমুআর নামাযের জন্য আগেভাগে এসে ইমামের কাছাকাছি বসার চেষ্টা করা উচিত। খুতবার শেষ দিকে এসে নামাযে যোগ দেওয়া কোন ভাবেই যথেষ্ট নয় কারণ খুতবাও জুমুআর নামাযেরই অংশ। মানুষ যখন জুমুআ থেকে পিছু হটতে আরম্ভ করে তখন ধীরে ধীরে সে জান্নাত থেকেই পিছিয়ে যায়, অথচ সে জান্নাতী ছিল।

হুযূর বলেন, যারা জুমুআর নামাযের জন্য নিজেদের জাগতিক ব্যবসা-বাণিজ্য বা ক্রীড়া-কৌতুককে উপেক্ষা করে আল্লাহ্ তাদের পার্থিব কর্মকান্ডেও অনেক বরকত দেন। তাদের রিযক এ প্রাচুর্য দেন। মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগের সাথে জুমুআর বিশেষ সম্পর্ক আছে আর এ যুগের প্রতিই কুরআন ইঙ্গিত করেছে।

হুযূর বলেন, এমটিএর কল্যাণে এ যুগে আল্লাহ্ আমাদের জন্য যুগ খলীফার খুতবা শোনার সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ইউরোপ এবং আফ্রিকার সাথে এখানকার সময়ের সামঞ্জস্য রয়েছে। তাই তাদেরকে এমটিএর মাধ্যমে সরাসরি জুমুআর খুতবা শোনা উচিত। এছাড়া অন্যান্য দেশেও সরাসরি না হলেও পরবর্তীতে জুমুআর খুতবা শোনা উচিত এবং মুরব্বীদের এই খুতবার আলোকেই স্থানীয় জামাতে খুতবা প্রদান করা উচিত।

হুযূর বলেন, যদি রমযানের বিদায়ের কারণে মু’মিনের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয় তাহলে এ দৃষ্টিকোন থেকে এই জুমুআ তার জন্য জুমুআতুল বিদা হতে পারে। অর্থাৎ, রমযানে আল্লাহ্ আমাদের যেসব ইবাদত করার সুযোগ দিয়েছিলেন, যেসব কল্যাণ অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তা রমযান চলে যাচ্ছে বলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এই কষ্টে যদি কেউ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে রমযানকে বিদায় জানায় এবং অর্জিত নেককর্মগুলো ধরে রেখে আগামী রমযানকে স্বাগত জানানোর প্রত্যয় করে তাহলে তা তার জন্য কল্যাণকর হতে পারে।

কাউকে বিদায় জানানোর অর্থ এই নয় যে, আমরা তাকে ভুলে যাব। তার স্মৃতি আমরা মনে রাখব না। বরং কোন প্রিয়ভাজনের বিদায় আমাদেরকে তার স্মরণ থেকে বিস্মৃত করে না। অনুরূপভাবে রমযান বিদায় নিলেও এর স্মৃতি এবং এতে যেসব পুণ্যকর্ম করার সৌভাগ্য হয়েছে তা স্মরণ রাখার চেষ্টা করা উচিত। সেসব পুণ্যকর্ম জারী রাখা উচিত।

হুযূর এরপর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর লেখা হতে জুমুআর গুরুত্ব বর্ণনা করেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ইংরেজ সরকারের কাছে জুমুআর দিনকে ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য আর একান্ত সম্ভব না হলে অন্ততঃ জুমুআর নামায পড়ার জন্য ২ ঘন্টার ছুটি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভাইসরয়ের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছিলেন। এত্থেকেও তিনি জুমুআর গুরুত্ব আমাদের সামনে সুস্পষ্ট করেছেন।

হুযূর বলেন, রমযানের আর মাত্র ৪/৫ দিন বাকী আছে, যদি বিগত দিনগুলোতে আমাদের ইবাদত-বন্দেগী ও নেককর্মে কোন ঘাটতি, আলস্য, দুর্বলতা বা ত্রুটি থেকে থাকে তাহলে এই অবশিষ্ট দিনগুলোতে আমাদেরকে তা দূর করার বা পূর্ণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ্ আমাদেরকে এর তৌফিক দিন, আমীন।

Top