খিলাফত দিবসের তাৎপর্য এবং সম্প্রতি তাঁর স্ক্যান্ডিনেভিয়া সফরে খোদার অপরীসীম সাহায্য ও সমর্থন - জুমুআর খুতবা । Importance of Khilafat Day and the Blessed Scandinavian tour - Friday Sermon

খিলাফত দিবসের তাৎপর্য এবং সম্প্রতি তাঁর স্ক্যান্ডিনেভিয়া সফরে খোদার অপরীসীম সাহায্য ও সমর্থন

রোজ শুক্রবার, ২৭শে মে, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২৭শে মে, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “খিলাফত দিবসের তাৎপর্য এবং সম্প্রতি তাঁর স্ক্যান্ডিনেভিয়া সফরে খোদার অপরীসীম সাহায্য ও সমর্থন”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আজ ২৭শে মে, এ দিনটি বিশ্ব জামাতে আহমদীয়া খিলাফত দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকে কেননা; আজ থেকে ১০৮ বছর পূর্বে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তিরোধনের পর এদিনে আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী এবং হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) প্রদত্ত শুভসংবাদের পূর্ণতা স্বরূপ আমাদের মাঝে পুনরায় ঐশী খিলাফত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তাই খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমরা এ দিবসটি পালন করি। এর পাশাপাশি এদিনে আমরা এই অঙ্গীকারও করি যে, খিলাফতের দৃঢ়তা ও একে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আমরা সব ধরণের ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত থাকব। আহমদীয়া জামাতের গত ১০৮ বছরের ইতিহাস এ কথার সাক্ষী যে, আহমদীরা প্রজন্ম পরম্পরায় একান্ত অবিচলতার সাথে এ লক্ষ্যে ত্যাগ স্বীকার করছে ও করছে।

এরপর হুযূর (আই.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হল; বান্দাকে আল্লাহ্‌র সাথে নিবিড় সম্পর্ক বন্ধনে আবদ্ধ করা। আল্লাহ্‌র প্রাপ্য অধিকার প্রদান এবং বান্দাদের পরষ্পরের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

অতএব আমাদের সবাইকে খোদার নৈকট্য লাভের জন্য এবং অন্যদেরও খোদার সাথে নিগুঢ় সম্পর্ক বন্ধনে আবদ্ধ করানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে।

আল্ ওসীয়্যত পুস্তিকায় খিলাফত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার সংবাদ দেওয়ার পর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেন,

এ আয়াতে মু’মিনদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে চিন্তামুক্ত হয়ে যেও না, বরং মৃত্যুকাল পর্যন্ত শয়তানের আক্রমনের আশংকা রয়েছে। শয়তান যেভাবে সাধারণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করে সেভাবে মু’মিনকেও পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম।

“তোমরা যদি সম্পূর্ণরূপে খোদার প্রতি অবনত হও, আমি খোদার ইচ্ছানুসারে বলছি তবে দেখবে, তোমরা খোদার এক মনোনীত জাতিতে পরিণত হবে। খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমা তোমাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করো। তাঁর তৌহিদ কেবলমাত্র মুখেই স্বীকার করবে না বরং ব্যবহারিক জীবনেও তা প্রকাশ করবে যেন খোদাও কার্যতঃ তাঁর করুণা ও অনুগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে বিরত থাকবে এবং মানব জাতির প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতিসুলভ ব্যবহার করবে। পুণ্যের প্রতিটি পথ অবলম্বন কর। বলা যায় না, কোন পথে তোমরা তাঁর কাছে গৃহীত হবে।”

অতএব আমরা যদি খোদার একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হই এবং মানব জাতীর প্রতি সত্যিকার সহানুভূতি প্রদর্শন করি, আহমদীয়া খিলাফতের সাথে বিশ্বস্ততাপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করি তাহলে সেসব উন্নতি যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ তা’লা দিয়েছেন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে তাও আমরা দেখতে সক্ষম হবো।

এরপর হুযূর (আই.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামাত যে উন্নতি করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এ জামাত যে উন্নতি করবে তা খোদার অমোঘ সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমাদের সবাইকে আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে যে, আমরা আল্লাহ্ ও তার বান্দাদের প্রাপ্য অধিকার কতটুকু প্রদান করছি। আমরা এই উন্নতির অংশ হওয়ার জন্য নিজেরা কতটুকু চেষ্টা করছি। আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে খিলাফতরূপী এই নিয়ামতের মূল্যায়ন করার এবং এর সাথে সর্বাবস্থায় সম্পৃক্ত থাকার তৌফিক দিন।

এরপর হুযূর (আই.) তাঁর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দু’টি দেশ অর্থাৎ ডেনমার্ক ও সুইডেন সফরের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ সফরে বেশ কয়েকটি সংবাদ পত্র ও প্রচার মাধ্যমে সাক্ষাতকার প্রদানের সুযোগ ঘটে। এছাড়া দু’টি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এবং ‘মালমো’তে নবনির্মিত মসজিদে মাহমুদ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার এবং স্থানীয় সাংসদ ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গের সামনে সত্যিকার ইসলামী শিক্ষামালা তুলে ধরার সুযোগ ঘটে। প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে দু’দেশের প্রায় কোটি মানুষের কাছে ইসলাম ও আহমদীয়াতের বাণী পৌঁছানো সক্ষম হয়েছে। এরপর হুযূর একাধারে বিভিন্ন অতিথি যারা এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে হুযূরের মূল্যবান বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তাদের অভিব্যক্তি ও মন্তব্য তুলে ধরেন।

এদের মধ্য হতে সবাই বিনাব্যতিক্রমে বলেন, আজ আমরা সত্যিকার ইসলাম কি তা জানতে পেরেছি। আইসিস এর সাথে বা উগ্রপন্থীদের সাথে ইসলামী শিক্ষার যে দূরতম কোন সম্পর্কও নেই তা জেনে আমাদের ভালো লেগেছে। অনেকে হুযূরের বক্তব্য শুনে কুরআন পাঠে আগ্রহী হয়েছেন। আর মহানবী (সা.)-এর আদর্শ জেনে তাঁর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পেয়েছে।

একজন বলেন, আমার স্বামী আমাকে এই অনুষ্ঠানে আসতে বারণ করেন এবং এই বলে বাধা দেন যে, সেখানে অবশ্যই বোমা বিষ্ফোরণ ঘটবে আর হতাহতের ঘটনা ঘটবে তাই তুমি সেখানে যেও না। কিন্তু আমি তার কথায় কর্ণপাত না করে প্রাণের টানে এখানে আসি। আমার স্বামীও এসেছেন এবং এখন বলছেন আজ আমরা এখানে না এলে এবং খলীফার কথা না শুনলে বড় ভুল করতাম।

কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, এরূপ অশান্ত ও বিপদসঙ্কুল যুগেও লক্ষ লক্ষ মানুষের একটি দল আলোর মশাল নিয়ে বিশ্বময় ঘুরে বেড়াচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তা আমাদের অজানা ছিল।

উপস্থিত সবাই হুযূরের বক্তব্য, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং মানব জাতীর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম সহানুভূতির চেতনা দেখে অভিভূত। তারা হুযূরের বক্তব্যের অনুবাদ ছাপিয়ে দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানান এবং বলেন, আমরা যেন খলীফার একটি কথা থেকেও বঞ্চিত না হই তাই আমাদেরকে এর অনুবাদ সরবরাহ করুন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, সত্যিকার খিলাফত শুধুমাত্র নিজ অনুসারীদেরই নয় বরং অন্যদের ভয়-ভীতিকেও নিরাপত্তা ও শান্তিতে রূপান্তরিত করে দেয়। অভ্যাগত অতিথিদের অনেকেই বলেন, খলীফার এই কথাগুলো আজ বিশ্বের বড়ই প্রয়োজন। আমাদের দেশবাসীদের উচিত এসব মূল্যবান কথা ও উপদেশের প্রতি কর্ণপাত করা।

অনেকে প্রচার মাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, এরা নেতিবাচক সংবাদ যত দ্রুত ও গুরুত্বের সাথে প্রচার করে ততটা গুরুত্ব দেয়না এসব ইতিবাচক কথার প্রতি। তাদের উচিত ইসলামের সত্যিকার শিক্ষামালা প্রচার করা যাতে সাধারণ মানুষের মন থেকে ইসলাম ভীতি দূরীভূত হয়।

হুযূর আরো বলেন, এ যুগে যারাই খোদার মনোনীত মহাপুরুষ হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে ছেড়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে তারা ব্যর্থ হবে এবং কোনভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এ যুগে খিলাফতের নামে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাও এখন দুর্বল হয়ে একটি নামসর্বস্ব সংগঠনে রূপ নিয়েছে। তারা নিজেদের শান্তিও বিনষ্ট করেছে, অন্যদেরও শান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরাতো আপনজনদেরও শান্তি দিতে পারে না অপরকে কীভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা দিবে? যারা আইসিসের প্রলোভনে সাড়া দিয়ে ইসলাম সেবার মনমানসিকতা নিয়ে এসব দেশ থেকে সেখানে গিয়েছিল তারাও আজ বুঝতে পারছে যে, বড় ভুল হয়ে গেছে কিন্তু তাদের ফিরে আসার পথ রূদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এদের যুলুম ও বর্বরতার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে হুযূর বলেন, এদেরই অনুসারী একজন মা যখন লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুর ক্ষুধা নিবারণের জন্য তাকে দুধ পান করাচ্ছিলেন তখন পর্দাহীণতার দোহাই দিয়ে সেই মায়ের কোল থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নেয় এই যালেমরা এবং মাকে সেখানেই গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হলো নামধারী ইসলাম সেবকদের আচরণ।

খুতবার শেষে হুযূর (আই.) আহমদীদের নসীহত করে বলেন, প্রত্যেক আহমদীর এই দোয়া করা উচিত, আমরা যেন যেকোন মূল্যে সদা-সর্বদা খিলাফতের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারি এবং খিলাফতের কল্যাণরাজি থেকে অংশ লাভ করতে পারি। আল্লাহ্ সবাইকে এর তৌফিক দান করুন।

খুতবার শেষ দিকে হুযূর গত ২৪শে মে, ২০১৬ তারিখে পাকিস্তানের করাচিতে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির গুলিতে শাহাদতবরণকারী মোহতরম দাউদ আহমদ সাহেবের স্মৃতিচারণ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য দোয়া করেন।

Top