মাহ্‌মুদ মসজিদ বা মালমো মসজিদ - জুমুআর খুতবা । Mahmood Mosque: The Malmo Mosque - Friday Sermon

মাহ্‌মুদ মসজিদ বা মালমো মসজিদ

রোজ শুক্রবার, ১৩ই মে, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৩ই মে, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার সুইডেনের মালমোতে মাহ্‌মুদ মসজিদে “মাহ্‌মুদ মসজিদ বা মালমো মসজিদ”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) সূরা তওবার ১৮ নম্বর এবং সূরা হাজ্জ এর ৪২ নম্বর আয়াত পাঠ করার পর বলেন, আলহাম্দুলিল্লাহ্! আল্লাহ্ তা’লা আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত সুইডেনের মালমোতে তাদের দ্বিতীয় মসজিদ নির্মাণের তৌফিক দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সব নারী-পুরুষ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এ মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সুইডেন জামা’তের জন্য খুবই দুরূহ কাজ ছিল। এখানে অনেক বেকার, গৃহিনী, শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছেন। আর মোটের ওপর জামাতের সদস্য সংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। তা সত্ত্বেও উপার্জনশীলদের পাশাপাশি অন্যরাও সাধ্যমতো এই নির্মাণ কাজে অংশ নিয়েছেন।

এরপর হুযুর (আই.) আহমদীদের আর্থিক ত্যাগের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, প্রত্যেকেরই কোন না কোন ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা থাকে, কিন্তু আহমদীদের আর্থিক ত্যাগ দেখে অবাক হতে হয়। আর্থিক দিক থেকে তুলনামুলকভাবে সচ্ছল আহমদীরা আর্থিক ত্যাগের পাশাপাশি দরিদ্র দেশগুলোর আহমদীদের এবং সেখানে যেসব কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এতেও সাহায্য করে।

এ প্রসঙ্গে হুযুর (আই.) আরও বলেন, অনেক আহমদী এমনও আছেন যারা আর্থিক কুরবানীর জন্য সদা উদগ্রীব থাকেন। এই বিশেষত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিষ্ঠাবান দাস হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-ই আমাদের ভেতর সঞ্চার করেছেন। আমাদের জামা’তে ওয়াকারে আমল করার রীতি রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অনেকেই অনেক কাজ করে থাকেন। কিছু লোক আমাকে বলেছেন, তারা গত কয়েক মাস যাবত এই মসজিদ নির্মাণের জন্য লাগাতার কাজ করেছেন। এ মসজিদ নির্মাণে যারা যেভাবেই অংশ নিয়েছেন আল্লাহ্ তা’লা তাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।

এরপর হুযুর (আই.) মসজিদ নির্মাণে স্থানীয় আহমদীদের আর্থিক ত্যাগের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করেন।

  • ১১ বছর বয়সের ছোট্ট একটি মেয়ে মসজিদ নির্মাণের জন্য মাত্র কয়েকশ’ ক্রোন দিয়েছে আর জানিয়েছে, সে এই টাকা বেশ কিছুদিন যাবত জমা করেছে তার হাত খরচ বাঁচিয়ে।
  • আরেকটি ১২-১৩ বছর বয়সের ছোট মেয়ে মসজিদ নির্মাণের জন্য ৫০০ ক্রোন দিয়েছে নিজের পোষা দু’টি টিয়ে পাখি বিক্রি করে।
  • হুযূর (আই.) বলেন, পাশ্চাত্ব্য সমাজে পশু-পাখি পালার বেশ প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটি পার্থিব শখের বিপরীতে খোদার রাস্তায় কুরবানীকে প্রাধান্য দিয়েছে।

  • আরেক মেয়ে এতেকাফে বসেছিল, সে তার সব গয়না মসজিদের জন্য দিয়ে দিয়েছে। যদিও তা পরিমাণে খুব একটা বেশি নয় কিন্তু তার কাছে যা ছিল সব সে দিয়ে দিয়েছে।
  • অনেকে এমনও রয়েছে, যাদের সদ্য বিয়ের পর গয়নার শখ পুরো হওয়ার আগেই তারা তাদের ব্যবহার্য গয়না মসজিদের জন্য দান করেছে।
  • অনেক মহিলা এমনও আছেন যাদের স্বামী মোটা অংকের অর্থ মসজিদের জন্য দেয়া সত্ত্বেও তারা ব্যক্তিগত কুরবানী করেছেন।
  • একজন তার স্ত্রী-র পক্ষ থেকে ওয়াদা করার পর তার সংসার ভেঙ্গে যায়। তালাকের পরও সেই যুবক তার সাবেক স্ত্রী’র পক্ষ থেকে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেন।
  • মালমো জামাতের একজন অস্থায়ী চাকরীজীবি যুবককে তার ওয়াদা বৃদ্ধি করতে বলা হলে তিনি দশ হাজার এর পরিবর্তে একলক্ষ ক্রোন ওয়াদা করেন এবং নিজের গাড়ী বিক্রি করে তখনই পঞ্চাশ হাজার ক্রোন চাঁদা দেন পরে বাকীটা পরিশোধ করেন। আল্লাহ্‌র ফযলে সেই যুবকের এখন ভালো চাকরী হয়েছে নতুন গাড়ী কেনারও সৌভাগ্য হয়েছে। এই হলো আহমদী জামাতের সদস্যদের আল্লাহ্‌র রাস্তায় কুরবানী করার ব্যাকুলতা। তারা জানেন যে, যারা এই পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র জন্য গৃহ নির্মাণ করে আল্লাহ্ জান্নাতে তাদের জন্য ঘর বানাবেন।

এরপর হুযূর (আই.) মসজিদ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিতে গিয়ে বলেন, এ মসজিদের পরিকল্পনা করা হয় ১৯৯৯ সালে। এ জন্য মোহতরম এহসান উল্লাহ্ সাহেব রাজপথ সংলগ্ন ৫০০০ বর্গ মিটার জমি ক্রয় করে জামাতকে দেন। এতে দু’টি নামাযের হল এবং একটি স্পোর্টস হল রয়েছে আর এতে সাকুল্যে ১৭০০জন মুসল্লী নামায পড়তে পারবে। এছাড়া লাইব্রেরী, অতিথিশালা, মুরব্বী কোয়ার্টার এবং বিভিন্ন অফিস রয়েছে এই কমপ্লেক্সে। এই মসজিদ নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩২লক্ষ পাউন্ড।

এরপর হুযূর (আই.) সুইডেনের আহমদীদের উদ্দেশ্যে বলেন, সুইডেনের সব আহমদী একত্র হলেও এ মসজিদ পরিপূর্ণ হবে না। তাই আপনারা নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। স্থানীয় লোকদের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে যে সব ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে সেগুলোকে দূর করুন এবং একত্ববাদের দিকে তাদের আহ্বান করুন। তারা আপনাদেরকে এখানে বসবাস করার সুযোগ দিয়ে আপনাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তার প্রকৃত এবং যথাযথ প্রতিদান দিতে হলে, তাদেরকে এক আল্লাহ্র দিকে আহ্বান করুন। স্থানীয় জনগণ এই মসজিদ নির্মাণে আনন্দিত। প্রচার মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে এই মসজিদ। একজন বলেছে, এই মসজদি আমাদের এলাকার সৌন্দর্য বর্দ্ধনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মসজিদের অধিকার রক্ষা করা সম্পর্কে হুযূর (আই.) বলেন, একে যথাযথভাবে আবাদ করলেই এর প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন সম্ভব হবে। নিজেরা মসজিদে আসুন এবং এর পাশাপাশি স্থানীয় লোকদেরকে তবলীগের উদ্দেশ্যে এখানে নিয়ে আসুন।

এরপর হুযূর (আই.) মসজিদের অধিকার রক্ষা সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উক্তি বর্ণনা করেন,

তিনি (আ.) বলেন, এ সময় আমাদের জামা’তের অনেক মসজিদের প্রয়োজন। এটি খোদার ঘর। যে গ্রাম অথবা শহরে আমাদের মসজিদ নির্মিত হবে, জেনে রাখো যে, সেখানে আমাদের উন্নতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় গেছে। যদি কোন গ্রাম অথবা শহর এমন হয় যেখানে মুসলমান কম বা কোন মুসলমান নেই আর সেখানে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্য থাকে তবে সেখানে মসজিদ নির্মাণ কর। এরপর খোদা স্বয়ং মুসলমানদের সেখানে নিয়ে আসবেন। শর্ত হল, নিষ্ঠাপূর্ণ সংকল্প হতে হবে, ব্যক্তিস্বার্থ ও অনিষ্টের উদ্দেশ্যে নয় বরং এ কাজ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করতে হবে, তবেই আল্লাহ্ এতে বরকত দিবেন।”

তিনি আরো বলেন, জামাতের নিজস্ব মসজিদ থাকা উচিত। যাতে নিজ জামাতের ইমাম থাকবেন এবং ওয়ায-নসীহত করবেন। আর জামাতের লোকদের উচিত সবাই সম্মিলিতভাবে যেন এই মসজিদে বাজামাত নামায পড়ে। জামাত এবং ঐক্যের মাঝে অনেক বরকত আছে। বিভেদের ফলে ফাটল দেখা দেয় আর এখন এমন সময় যখন ঐক্য ও একতার বাঁধন আরো মজবুত করা উচিত। এবং ছোট-খাটো বিষয়কে উপেক্ষা করা উচিত যা মূলত চির ধরানোর কারণ হয়।

এরপর হুযুর (আই.) সুইডেনের আহমদীদের উদ্দেশ্যে বলেন, মসজিদ নির্মাণের পর আপনাদের দায়িত্ব কমেনি বরং আসল কাজ এখন আরম্ভ হবে। মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আমাদের সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে। যেমনটি আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, (ওয়া মা খালাক্বতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিয়া’বুদূন) অর্থাৎ, জ্বিন ও ইনসানকে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন।

এরপর হুযূর (আই.) মসজিদে বাজামাত নামায পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে হাদীসের উল্লেখ করেন যাতে বলা হয়েছে যে, মসজিদে গিয়ে নামায পড়ার সওয়াব ঘরে বা বাজারে নামায পড়ার চেয়ে ২৫ অথবা ২৭ গুণ বেশি।

অতএব আমাদেরকে তাক্বওয়ার ওপর পরিচালিত হয়ে খোদার সন্তুষ্টির জন্য তাঁর ইবাদত করতে হবে। তৌহিদ বা খোদার একত্ববাদের বাণী দেশবাসীর কাছে পৌঁছাতে হবে। এই সুন্দর মসজিদ নির্মাণের পর আমাদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে আল্লাহ্ আমাদেরকে তা যথাযথভাবে পালনের তৌফিক দিন, আমীন।

Top