নামায: ইবাদতের অন্ত:সার - জুমুআর খুতবা । Salat: The core of worship of God - Friday Sermon

নামায: ইবাদতের অন্ত:সার

রোজ শুক্রবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৫ই এপ্রিল, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “নামায: ইবাদতের অন্ত:সার”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে নামায পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও নামাযের সুরক্ষা আবার কোথাও নিয়মিত ও সময়মত নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে। মু’মিনদের এই নির্দেশটি যথাযথভাবে পালন করা উচিত। মোটকথা নামায পড়া এবং এর আবশ্যকীয়তা সম্পর্কে খোদা তা’লা বারবার বিশ্বাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এমনকি মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যও হচ্ছে ইবাদত। যেমনটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, ‘আমি জ্বিন ও ইনসানকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’। কিন্তু মানুষ তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে যায় বা একে উপেক্ষা করে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একস্থানে বলেন, “আল্লাহ্ তা’লা তোমাদের সৃষ্টির যে মূল উদ্দেশ্য নির্ণয় করেছেন তাহলো, তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে। কিন্তু যারা এই মূল ও প্রকৃতিগত উদ্দেশ্যকে পরিত্যাগ করে জীব-জন্তুর মত শুধু পানাহার ও নিদ্রাকেই জীবনের সবকিছু মনে করে তারা খোদার কৃপা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়। তখন তাদের প্রতি আর খোদার কোন দায়িত্ব থাকে না।

হুযূর বলেন, অতএব এহলো মানব জীবনের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। যারা বিশ্বাসী বা ঈমানদার হওয়ার দাবী করে তাদের সানন্দে খোদার ইবাদত করা আবশ্যক।

হুযূর বলেন, আজকাল পাশ্চাত্যে দিন বড় হচ্ছে এবং রাত ছোট হয়ে যাচ্ছে। এবং ফজরের নামাযে এর প্রভাব পড়তে আরম্ভ হয়েছে। অনেকে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কর্মব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফজরের নামাযের ব্যাপারে আলসেমী করে। অনেকে আবার যোহর ও আসরের নামায জমা করে পড়ে। আবার অনেকে আছে যারা নামাযই পড়ে না। কোন বিশ্বাসী বা সচেতন আহমদীর কোনমতেই এমনটি করা সাজে না।

হুযুর আরো বলেন, জামাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও যদি এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয় তাহলে মসজিদে নামাযীর সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেতে পারে।

এরপর হুযূর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর রচনাসমগ্র হতে বিভিন্ন নির্বাচিত অংশ উপস্থাপন করেন যাতে তিনি নামাযের গুরুত্ব ও কল্যাণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

হুযূর বলেন, মনে রাখবেন নামায কখনো মাফ হয় না, এমনকি নবীদের জন্যও নামায মাফ করা হয়নি। যার আদেশে এই পৃথিবীতে সবকিছু সংঘটিত হয় তাঁর সাথে মু’মিনের নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা আবশ্যক। বেশি ইস্তেগফার পাঠ করা উচিত। যারা জাগতিক কাজকর্মে বেশি ব্যস্ত তাদেরও এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগি হওয়া চাই।

হুযূর বলেন, শুধু ফরয নামাযই নয় বরং মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের কাছে নফলেরও প্রত্যাশা রেখেছেন। সাধ্যমত তাহাজ্জুদ পড়ারও চেষ্টা করা উচিত।

অনেকেই নামাযের মূল তাৎপর্য কি তা জানেন না। নামায আসলে খোদার জন্য নয় বরং মানুষের নিজেরই কল্যাণের জন্য। প্রত্যেক জিনিষের মধ্যেই আল্লাহ্ তা’লা স্বাদ রেখেছেন। কিন্তু অনেক সময় সুস্বাদু খাবারও রোগীর কাছে বিস্বাদ লাগে। তাই একজন রোগীকে মুখের রুচি ফিরিয়ে আনার জন্য আরোগ্যের চিন্তা করা উচিত। অনুরূপভাবে মানুষ যখন নামাযে স্বাদ পায় না তখন তার নিজের দুর্বলতা এবং আত্মিক রোগ নিয়ে চিন্তা করা উচিত যে, কীভাবে নামাযে স্বাদ পাওয়া যায়।

মসীহ্ মওউদ (আ.) আরো বলেন, একজন নেশাখোর ততক্ষণ পর্যন্ত মদ খেতে থাকে যতক্ষণ সে মাতাল না হয়। তাই যে নামাযে স্বাদ পায় না তারও স্বাদ না পাওয়া পর্যন্ত নামাযে রত থাকা উচিত। আর নামাযের বিষয়ে মানুষের আলসেমির মূল কারণই হচ্ছে তাদের নামাযে স্বাদ না পাওয়া।

হুযূর বলেন, অনেকে আছে রীতিমত নামায পড়ে আবার অপকর্মও করে বেড়ায়, কারণ তাদের আত্মা মৃত। তারা লৌকিকতা হিসেবে নামায পড়লেও এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে এরা অনবহিত। কারণ আল্লাহ্ বলেছেন, নামায মানুষকে অশ্লীলতা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আরেকস্থানে আল্লাহ্ বলেন, নিশ্চয় পুণ্য মন্দকে দূর করে দেয়। অতএব নামায পড়া সত্বেও যাদের মাঝে মন্দ ও অন্যায় কাজ বিদ্যমান থাকে তাদের আত্মশুদ্ধির প্রতি মনোযোগি হওয়া প্রয়োজন।

এরপর হুযূর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ভাষায় নামাযের দর্শন ও এর মর্ম বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নামায পড়ার ক্ষেত্রে মানুষের তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করা অন্যায়। মানুষের সব শক্তি-সামর্থ আল্লাহ্‌র অধীনে। কাজেই মানুষ যতক্ষণ খোদাকে পাওয়ার জন্য নিজের সব শক্তি-সামর্থ দিয়ে চেষ্টা না করে ততক্ষণ কীভাবে তাঁকে পাবে। মানুষ খোদাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো প্রতি সমর্পিত হবে এটি আল্লাহ্ কখনো পছন্দ করেন না। উদাহরণ টেনে হুযূর বলেন, কারো স্ত্রী যদি পর পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখে তাহলে সেই পুরুষের আত্মাভিমান কখনো তা পছন্দ করবে না। অনুরূপভাবে সর্বশক্তির আধার আল্লাহ্‌কে ছেড়ে বান্দা অনের পেছনে ছুটবে এটিও খোদার আত্মাভিমান কখনো সহ্য করে না।

হুযূর বলেন, অনেকেই আছে যারা বলে, দোয়া করা এবং খোদার কাছে কান্নাকাটি করা এগুলো বেহুদা কাজ। আমরা অনেক দোয়া করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এমন লোকদের জিজ্ঞাসা করা দরকার যে, তারা খোদার আদেশ-নিষেধ কতটা মানে। খোদার নির্দেশের কতটা তারা অনুসরণ করে। যদি তারা খোদার আদেশ-নিষেধের প্রতি মনোযোগ না দেয় তাহলে তাদের দোয়া শুনতে খোদার কি দায় পড়েছে! এরপরও আমাদের খোদা বড়ই কৃপালু ও অনুগ্রহশীল। তিনি মানুষের শত দুর্বলতা সত্বেও তার দোয়া শোনেন। অনেকে আছে যারা ঠিকমত নামাযও পড়ে না কিন্তু তারপরও খোদা তাদের আহ্বানে সাড়া দেন এবং তাদের দোয়া গ্রহণ করেন। তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন।

হুযূর বলেন, খোদার সত্যিকার বান্দা হওয়ার জন্য নামায নিয়মিত পড়া এবং খোদার নির্দেশের অধীনে থেকে তাঁর ইবাদত করা আবশ্যক। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে এর তৌফিক দান করুন।

Top