আত্মবিশ্লেষণ: আমাদের কথা ও কাজ - জুমুআর খুতবা । Self-Reflection: Our Practice and Decisions - Friday Sermon

আত্মবিশ্লেষণ: আমাদের কথা ও কাজ

রোজ শুক্রবার, ৮ই এপ্রিল, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৮ই এপ্রিল, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “আত্মবিশ্লেষণ: আমাদের কথা ও কাজ”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেছেন, আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করে দেখা উচিত, আমাদের কথা-কাজ কুরআন, সুন্নাহ্ এবং হাদীস সম্মত কি-না? যদি কোন বিষয় সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস থেকে না জানা যায়, তাহলে অতীতের আলেম-উলামার সমামত গ্রহণ করা উচিত। কেউ একবার হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে জিজ্ঞেস করেন যে, মাসলা-মাসায়েলের সমাধান আমরা কীভাবে করবো? তিনি বলেন, প্রথমে দেখ কুরআনে এ সম্পর্কে কি বলা আছে। যদি কুরআনের এ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পাও তাহলে সুন্নত ও হাদীসের দ্বারস্থ হও আর এতেও যদি কোন সমাধান না হয় তাহলে দেখ, অতীতের উম্মতরা এ ব্যাপারে কি করেছেন বা বলেছেন।

হুযূর বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে সুন্নতের স্থান হাদীসের ওপরে। সুন্নত হলো তাই যা মহানবী (সা.) স্বয়ং করে দেখিয়েছেন এবং তাঁর দেখাদেখি সাহাবীগন এবং তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনগণ করেছেন। হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.) বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল যার অনুমতি দেয় তা আমাদের করা উচিত এর বাইরে নয়।

এরপর হুযূর হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর ভাষায় বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করেন যার মধ্যে মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ঘটনাও রয়েছে।

তিনি (রা.) বলেন, অনেকেই স্বপ্নকে খুব গুরুত্ব প্রদান করে। একবার তিনি (রা.) যখন অসুস্থ ছিলেন তখন কাদিয়ান নিবাসী একজন মহিলা স্বপ্নে দেখেন যে, মসীহ্ মওউদ (আ.) তাকে স্বপ্নে নির্দেশ দিচ্ছেন, যদি তুমি লাগাতার ছয় মাস রোযা রাখো তাহলে মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ আহমদ (রা.) সাহেব আরোগ্য লাভ করবেন।

হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.) বলেন, আমি আপনাকে লাগাতার ছয় মাস রোযা রাখার অনুমতি দিতে পারি না। কারণ হাদীস থেকে এভাবে লাগাতার রোযা রাখার বিষয়টি সাব্যস্ত নয়। তাই মহানবীর নির্দেশ পরিপন্থী কোন কিছু স্বপ্নে দেখলে তাকে শয়তানের প্ররোচনা মনে করবে।

প্রশ্ন জাগে যে, মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজেও তো লাগালার ছয় মাসের বেশি রোযা রেখেছেন। এর উত্তর স্বয়ং মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা খোদার মা’মুর তাদের বিষয় ভিন্ন। তিনি খোদার বিশেষ পরিকল্পনার অধীনে এবং তাঁর অভিপ্রায় অনুসারে রোযা রেখেছেন আর এই রোযা রাখার ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে বিভিন্ন কাশ্ফ দেখিয়েছেন এবং ইলহাম করেছেন। আধ্যাত্মিক জগতের অনেক সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম বিষয় তার সামনে উম্মুক্ত করা হয়েছে। আর এটি নবীদের চিরন্তন রীতিও বটে। যতদিন আল্লাহ্‌র নির্দেশ ছিল তিনি ততদিনই রোযা রখেছেন এর চেয়ে বেশি নয়। তাই নবীদের আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

হুযূর বলেন, আমাদের জামাতের ওপর একটি অপবাদ আরোপ করা হয় যে, মির্যা সাহেব আরেকটি নতুন ফির্কা গঠন করে নৈরাজ্য বা অশান্তি সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি কোন নৈরাজ্য বা ফাসাদ সৃষ্টি করেন নি। বরং ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন। খোদার নির্দেশ অনুসারে তিনি সদাত্মাদের সমন্বয়ে একটি ঐশী জামাত গঠন করেছেন যারা জাগতিক অন্যসব ফির্কা বা দলের চেয়ে ভিন্ন। তিনি যদি আলাদা জামাত গঠন না করতেন তাহলে ভালো ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ কি তা জানাই যেত না।

হুযূর উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, অনেক সময় রোগীর সাথে থাকলে ভালো মানুষেরও রোগাক্রান্ত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তখন সুস্থ মানুষের মঙ্গলার্থে ডাক্তার রোগীদের থেকে তাদের পৃথক রাখে।

হুযূর এখানে ডাক্তার এবং অত্যাচারীর মাঝেও তুলনা করেন। উভয়েই আঘাত করে, একজন আঘাত করে মানুষের ক্ষতির জন্য আর ডাক্তার সেই ক্ষত বা আঘাত সারিয়ে তোলার জন্য রোগীকে বিস্বাদ ঔষধ খাওয়ায়। কিন্তু ডাক্তারের এই পদ্ধতি অবলম্বন মূলতঃ রোগীর কল্যাণার্থেই হয়ে থাকে। তাই ঐশী জামাতের স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের থেকে তাদের পৃথক হওয়া প্রয়োজন। আর এ উদ্দেশ্যেই অর্থাৎ মুসলমানদের নৈরাজ্যমুক্ত করার জন্যই আমরা পৃথক জামাত গঠন করেছি। যদি আজ কেউ নৈরাজ্য বা অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে চায় তাহলে যুগ ইমামকে মানা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

এ প্রসঙ্গে হুযূর, আহমদীরা কেন অ-আহমদী ইমামের পেছনে নামায পড়ে না তার কারণও বর্ণনা করেন। এছাড়া আহমদী ছেলে-মেয়েদের অ-আহমদীদের সাথে বিয়ে না দেওয়ার কারণ কি তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এরফলে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। আহমদী ছেলেদের বিয়ের সময় আহমদী মেয়েই নির্বাচন করা উচিত আর মেয়েদেরও উচিত আহমদী ছেলেদের বিয়ে করা, নতুবা ঐশী জামাতের সাথে মানুষের বানানো জামাতের কোন আর পার্থক্য থাকবে না। ভবিষ্যৎ বংশধররাও জামাতের রীতি-নীতি থেকে দূরে সরে যাবে।

কাজেই যেসব মেয়ে বা মায়েরা অ-আহমদীদের সাথে বিয়ে করতে বা দিতে চায় তাদের এ বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। এছাড়া হুযূর বলেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ওলীর অনুমতি প্রয়োজন। কোন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে যদি নিজেদের ইচ্ছামত বাইরে গিয়ে বিয়ে করে তাহলে তা অবৈধ। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে দুজন ছেলে-মেয়ে এভাবে নিজেদের ইচ্ছায় বাইরে গিয়ে মৌলভী দিয়ে বিয়ে পড়ায় ফলে মসীহ্ মওউদ (আ.) তাদের দু’জনকে কাদিয়ান থেকে বহিস্কার করেছিলেন।

হুযূর আরো বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে পিতামাতাকেও সন্তানের মতামতের মূল্য দিতে হবে। জার্মানির এক পরিবারের উদাহরণ টেনে হুযূর বলেন, পরিবারের মতামত না মানার কারণে এক মেয়েকে তার পিতামাতা হত্যা করেছিল এবং এখন তারা জেল খাটছে। অতএব পিতামাতারও এত কঠোর হওয়া উচিত নয় আর সন্তানদেরও সাময়িক আবেগের বশে বিয়ের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে, বিশেষ কোন পরিবেশ বা পরিস্থিতি দেখা দিলে খলীফার অনুমতি নেওয়া যেতে পারে।

বিয়ে-শাদীর ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েকে দেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া ছবিও দেখা উচিত, না হলে পরষ্পরের প্রতি ভালোবাসা কীভাবে সৃষ্টি হতে পারে। হুযূর এ বিষয়টিকে যিকরে এলাহীর সাথে যুক্ত করেন। যদি কেউ খোদার গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে না জানে এবং সেভাবে খোদার অস্তিত্বের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিজের সামনে না রাখলে সে সত্যিকার অর্থে খোদার ইবাদত করতে পারে না। তাই উপাসনা করার পূর্বে উপাস্যের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের একটি পূর্ণ চিত্র মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি হওয়া চাই।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে এসব বিষয় বুঝার এবং মানার তৌফিক দিন।

Top