অভিভাবকত্ব – সন্তানের তরবীয়তে - জুমুআর খুতবা । Parenthood - Moral upbringing of Children - Friday Sermon

অভিভাবকত্ব – সন্তানের তরবীয়ত

রোজ শুক্রবার, ১৮ই মার্চ, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৮ই মার্চ, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “অভিভাবকত্ব – সন্তানের তরবীয়তে”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, সন্তানদের দ্বারা কোন ভুল হয়ে গেলে পিতামাতা তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করেন। অকারণে অনেক বেশি কঠোরতা প্রদর্শন করেন। আবার অনেকে সন্তানদের ভুল-ত্রুটিকে এতটাই উপেক্ষা করে যে, তারা ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতেই ভুলে যায়। অনেকে আবার ছোট-খাটো বিষয়েও অনেক বেশি বকাঝকা করে। একটা বয়স পর্যন্ত সন্তানরা এই আচরণ সহ্য করলেও কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখতেই তারা অবাধ্য হতে আরম্ভ করে এমনকি আবশ্যক নির্দেশও অমান্য করে। কাজেই পিতামাতার উচিত সন্তানদের সাথে যুক্তি দিয়ে এবং স্নেহের সাথে কথা বলা। অনর্থক সব কাজে নাক না গলানো এবং অন্যায়ভাবে সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। বিশেষ করে সন্তানের তরবীয়তের ক্ষেত্রে পিতার অগ্রণী ভূমিকা আবশ্যক কেননা; তিনিই পরিবারের কর্তা হয়ে থাকেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) সন্তানদের কীভাবে তরবীয়ত করতেন সে সংক্রান্ত একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেন, শৈশবে আমি একবার একটি তোতা পাখি শিকার করে আনি। তা দেখে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, স্মরণ রাখা উচিত, আল্লাহ্ তা’লা বিভিন্ন পশু-পাখি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ও কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কতক সৌন্দর্যের জন্য কেননা তা দেখে মানুষের খুব ভালো লাগে। কোন প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন তার সুরেলা কন্ঠের জন্য। কোন কোন প্রাণী সৃষ্টি করেছেন মানুষের আহারের জন্য কেননা; এর মাংস মানুষের জন্য উপাদেয়। আবার কোন কোনটি রোগ-ব্যাধির ঔষধ হিসেবে। শুধু প্রাণী এবং হালাল দেখলেই তা খাওয়া উচিত নয়। কেননা, সেই প্রাণীর মাংস হালাল এবং রূচিকর হলেও তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া কোন কোন পাখি ফসলের ক্ষেতের পোকা-মাকড় খায় তাই এগুলো হালাল হলেও মারা উচিত নয়। তাই সব পশু-পাখির মাংস না খেয়ে যে কাজের জন্য আল্লাহ্ তাদের সৃষ্টি করেছেন তার জন্য এদের বাঁচিয়ে রাখা আবশ্যক। নিজের ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর মানুষের সামগ্রীক কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। এই তোতা পাখি খোদার এক অপরূপ সৃষ্টি যা দেখে মানুষের নয়ন জুড়িয়ে যায়। কোন কোন পাখির কন্ঠ এতই সুরেলা যে তার সুমধুর কন্ঠে মানুষের কান প্রশান্তি লাভ করে।

হুযূর বলেন, তরবীয়তের এই অনিন্দ্য সুন্দর রীতি সত্যিই মানুষের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

এরপর হুযূর হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর বরাতে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যাপিত জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও উপদেশ তুলে ধরেন। সমাজ-সংসারকে বিদাতমুক্ত করার জন্যই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আবির্ভুত হয়েছেন। তাহলে তাঁর মাধ্যমে বিতাদের প্রসার বা প্রচার কি করে হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) স্বয়ং নিজের ছবি তুলিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর ছবি সম্বলিত একটি পোস্ট কার্ড তাঁর সামনে পেশ করা হয় তখন তিনি তা খুবই অপছন্দ করেন এবং বলেন, এই কার্ড তোমরা কেউ কিনবে না, ফলে ভবিষ্যতে একাজ করার ধৃষ্টতা আর কারো হয়নি। তাঁর ছবি তোলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের বাসিন্দারা মানুষের ছবি দেখে তার চরিত্রে ও গুণাগুণ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। তাই তিনি তবলীগের উদ্দেশ্যে ছবি তুলিয়েছিলেন। অনেকেই আজকাল আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মসীহ্ মওউদ (আ.) ছবি রঙ্গীন করার চেষ্টা করে, এটি ঠিক নয়। তাঁর কোন রঙ্গীন ছবি ছিল না। আবার অনেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ছবি প্রিন্ট করে বা কার্ড বানিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আপলোড করে। এগুলো থেকে তাদের থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়া খলীফাদের ছবির ক্ষেত্রেও সাবধানতা আবশ্যক।

এরপর একাধারে হুযূর চলচ্চিত্রের ভালোমন্দ দিক, পর্দার গুরুত্ব ও তত্ব, আরোগ্য লাভের জন্য শুধুমাত্র ডাক্তারের চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করা, সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি, খোদাভীতি, মানুষের কথা না ভেবে খোদার নির্দেশ পালনের জন্য কাজ করা এবং খোদা ও রসূলের আহ্বানে কীভাবে সাড়া দিতে হয় সে সম্পর্কে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বক্তব্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ডাক্তারী চিকিৎসা ছাড়াও এমন অনেক কবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি আছে যা রোগ নিরাময়ের জন্য খুবই কার্যকরী, তারও ব্যবহার আবশ্যক। কালের প্রবাহে আজকাল অনেক পুরনো চিকিৎসা পদ্ধতি আর দেখতে পাওয়া যায় না। এর কারণ হচ্ছে, সেযুগে এ বিষয়ে কেউ অভিজ্ঞতা অর্জন করলে তা অন্য কাউকে শেখাতো না, এমনকি নিজের সন্তানকেও; ফলে তাদের তিারোধানের সাথে সাথে সেই পরীক্ষিত ব্যবস্থাপত্রও হারিয়ে গেছে। আমাদের আহমদীদের কোন ক্ষেত্রেই এমনটি করা উচিত নয়।

পর্দার জন্য আল্লাহ্‌র নির্দেশ মান্য করা আবশ্যক। যদি শারীরিক সমস্যা থাকে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এবং বাধ্যবাধকতা থাকলে পর্দার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল হওয়া যেতে পারে তবে, এটি সবার জন্য নয়। কিন্তু অকারণে এবং স্বাধীনতার নামে নারীর নির্লজ্জ হওয়ার অনুমতি নেই।

একবার একজন ডাক্তার হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আমি কীভাবে ধর্মসেবা করতে পারি। তিনি বলেন, রোগীদের তবলীগ করুন। কেননা, রোগীর মন কোমল ও নরম হয়ে থাকে, তখন ধর্মের কথা বললে তা তার ওপরে বেশি প্রভাব বিস্তার করে।

হুযূর বলেন, বিশ্বাসীরা খোদার ইশারা বুঝেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এমনকি তাদের মধ্যে আবেগের কারণে এক প্রকার উম্মাদনাও দেখা যায়। তাহলে আল্লাহ্ এবং রসূলের যেসব স্পস্ট নিদের্শনা রয়েছে তা পালনের প্রতি আমাদের কত বেশি যত্নবান হওয়া উচিত তা সহজেই অনুমেয়। আমরা আল্লাহ্‌র নিদের্শাবলী ও ইশারা কতটুকু বুঝতে সক্ষম তা যাচাই করে দেখা উচিত।

আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি এবং তাঁর নির্দেশ অনুসারে আমাদের প্রতিটি কাজ করা উচিত। মানুষের মনজয় করার জন্য কোন কাজ করা উচিত নয়।

একবার কোন এক বৈঠকে একজন বলেন, আমাদের জামাতের অধিকাংশ মানুষ দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে। মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, আসল বিষয় হলো, খোদার ভালোবাসা। এসব মানুষের হৃদয়ে যখন খোদার ভালোবাসা সৃষ্টি হবে তখন তারা আপনা-আপনি আমাদের অনুকরণ করতে আরম্ভ করবে।

হুযূর বলেন, আমি দোয়া করি, আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে সত্যিকার অর্থেই হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কথামালা বুঝার তৌফিক দান করেন আর সত্যিকার খোদার ভালোবাসা আমাদের মাঝে যেন জন্ম নেয় আর আমাদের প্রতিটি কথা ও কাজ যেন খোদার নির্দেশ অনুসারে সম্পাদিত হয়।

Top