হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, মুসলমানদের ব্যবহারিক সংশোধন - জুমুআর খুতবা । The advent of the Promised Messiah (as) is for the reformation of Muslims - Friday Sermon

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য: মুসলমানদের ব্যবহারিক সংশোধন

রোজ শুক্রবার, ৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, মুসলমানদের ব্যবহারিক সংশোধন”- বিষয়ে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক জায়গায় বলেন, একবার হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যুগে জামাতের একজন বন্ধু জলসায় প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেন, আহমদীয়া জামাত এবং অন্যদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, অন্যরা মরিয়ম তনয় হযরত ঈসা (আ.)-এর স্বশরীরে আকাশে যাওয়ায় বিশ্বাস করে আর আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। এছাড়া তাদের আর আমাদের মাঝে অন্য কোন বিষয়ে মতবিরোধ নেই।

একথা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কানে গেলে তিনি শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও ১৯০৫ সনের ২৭শে ডিসেম্বর তারিখে একটি বক্তৃতা করেন এবং তাঁর আবির্ভাবের উদ্দেশ্য ও লক্ষণাবলী সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, শুধু ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণের জন্যই অধম প্রেরিত হয়নি। এমন ছোট্ট একটি কাজের জন্য আল্লাহ্‌র এই জামাত গঠনের কোন প্রয়োজন ছিল না। বরং এই জামাত প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানদের ব্যবহারিক সংশোধন। কেননা, মুসলমানদের আমল-আখলাক বা আচার-আচরণে বিকৃতি দেখা দিয়েছিল। আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে মিথ্যা দূর করে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করেন।

এরপর হুযূর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর ভাষায় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্ট সমস্যাদি এবং তা সমাধানকল্পে গুরুত্বপূর্ণ হিতোপদেশ প্রদান করেন।

হুযূর আকদাস (আ.) বলেন, তোমরা নিজেদের সত্যের মানকে উন্নত করো আর নিজেদের ও অন্যদের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য করে দেখাও।

আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে মুমিনের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তারা মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেয় না। এরপর মিথ্যা ও র্শিক সম্পর্কে তিনি (আ.) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ মিথ্যার জন্য ‘যুর’ শব্দ বলেছেন। মিথ্যা, ভুল বলা, মিথ্যা স্বাক্ষী দেয়া, খোদা তা’লার সাথে কাউকে শরীক করা, এমন বৈঠক বা স্থান যেখানে মিথ্যার বেসাতী করা হয়, গান-বাজনা এবং অনর্থক ও মিথ্যা বলার বৈঠক- এগুলোই হলো ‘যুর’ শব্দের অর্থ। যারা এসব মিথ্যা ও বেহুদা কাজকর্ম থেকে নিজেদের মুক্ত রাখে আর নিজেদের মাঝে পবিত্র পরিবর্তন সাধন করে তারাই সত্যিকার অর্থে মু’মিন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, মুসলমানদের মাঝে এই ভেদাভেদের কারণ হচ্ছে, জগতের প্রতি ভালোবাসা বা মোহ। কেননা, যদি শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিই লক্ষ্য হতো তাহলে সহজেই বুঝা যেত যে, অমুক ফির্কার নীতি বেশি সুস্পষ্ট এবং তা গ্রহণ করে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতো। এখন যেহেতু জগত পূজার কারণে এসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তাই এমন লোকদের কীভাবে মুসলমান বলা যেতে পারে। কেননা, এরা মহানবী (সা.)-এর পদাঙ্গ অনুসরণ করছে না। অথচ আল্লাহ্ বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহ্‌কে ভালোবাসতে চাও তাহলে এই রসূলের অনুসরণ করো তাহলে তিনিও তোমাদের ভালোবাসবেন।” অথচ এরা রসূলের অনুসরণ করার পরিবর্তে জগত পূজায় রত। এটিই কি রসূলের অনুসরণ? মহানবী কি একজন দুনিয়াদার মানুষ ছিলেন? তিনি কি সুদ খেতেন? আবশ্যক এবং খোদার নির্দেশাবলী পালনের ক্ষেত্রে তিনি আলস্য প্রদর্শন করতেন কি? আল্লাহ্ ক্ষমা করুন, তাঁর মাঝে কি কপটতা ছিল? তিনি কি (আল্লাহ্‌) প্রশংসাকারী ছিলেন না? ধর্মকে পার্থিবতার ওপর অগ্রাধিকার প্রদান করতেন না? অভিনিবেশ করো, আনুগত্যের দাবী হল, মহানবীর পদাঙ্গ পূর্ণরূপে অনুসরণ করা। তারপর দেখ! খোদা তা’লা কীভাবে কৃপা করেন। সাহাবীগণ নবীর সেই চাল-চলন বা আচার-ব্যবহার অবলম্বন করেছিলেন ফলে দেখ! আল্লাহ্ তাদেরকে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছিয়েছেন। তারা জগতকে হেলাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আর একেবারেই দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। নিজেদের আশা-আকাঙ্খার ওপর এক মৃত্যু আনয়ন করেছিলেন। এখন তোমরা নিজেদের অবস্থা তাদের সাথে তুলনা করে দেখো যে, তোমরা তাদের পথে আছো কি-না? পরিতাপ! এখন মানুষ জানে না যে, খোদা তা’লা তাদের কাছে কি প্রত্যাশা করেন।

এরপর হুযূর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জীবন চরিত থেকে বিভিন্ন ঘটনা উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি কোন ক্ষেত্রেই সত্যের আঁচল পরিত্যাগ করেন নি। ভয়াবহ বিপদের সময়ও বুক ফুলিয়ে তিনি সত্য বলতেন আর আল্লাহ্‌র ফযলে সত্যের কল্যাণে তিনি সম্মানিত হতেন। বিধর্মীরা পর্যন্ত সত্যের কারণে তাঁকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। এখানে হুযূর তাঁর বিরুদ্ধে রালিয়া রামের ডাক খানার মোকদ্দমার কথা উল্লেখ করেন।

হুযূর বলেন, অনেকইে বলে, মিথ্যা ছাড়া জীবন অচল। এটি একেবারেই অনর্থক ও বাজে কথা। এটি জগতপূজারী এবং দুনিয়ার কীটদের দৃষ্টিভঙ্গি। আসল কথা হল, সত্য ছাড়া এক মুহূর্তও জীবন কাটানো সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি সত্য বলে সে লাঞ্ছিত হবে এটি খোদার আত্মাভিমান কখনো সহ্য করে না।

অনেকেই বলে, সত্য বলার কারণেই মানুষ শাস্তি পায়। আসলে সত্য বলার কারণে কেউ শাস্তি পায় না বরং তাদের গুপ্ত ও প্রচ্ছন্ন অপরাধের কারণে খোদা তাদের শাস্তি দেন। খোদা শাস্তি প্রদানে ধীর কিন্তু মানুষ সীমা ছাড়িয়ে গেলে তিনি তাদের শক্ত হাতে ধরেন আর কঠিন শাস্তি দেন।

কাজেই আমাদের প্রত্যেক আহমদীকে আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে যে, মামলা-মোকদ্দমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-শাদী, সরকারের কাছ থেকে বেনিফিট গ্রহণ এবং এসাইলেম করার ক্ষেত্রে আমরা যেন কোনভাবেই মিথ্যার আশ্রয় না নেই।

জামাতের কর্মকর্তাদের রিপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে রিপোর্ট দেয়া উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেন বাদ পড়ে না যায়। আমিত্ব পরিহার করে খোদাভীতির চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে সত্য ও সঠিক রিপোর্ট প্রদান করা আবশ্যক। মনে রাখবেন, সত্যিকার আহমদী সে যে রসূলের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে খোদার প্রকৃত বান্দা হওয়ার চেষ্টা করে।

হুযূর বলেন, জাগতিক স্বার্থ উপেক্ষা করে আর স্বল্পেতুষ্ট থেকে খোদার নির্দেশ অনুসারে আল্লাহ্ আমাদের পবিত্র জীবন যাপনের তৌফিক দিন।

Top