ক্ষমা ও শাস্তির প্রকৃত তাৎপর্য - জুমুআর খুতবা । Essence of forgiveness and punishment - Friday Sermon

ক্ষমা ও শাস্তির প্রকৃত তাৎপর্য

রোজ শুক্রবার, ২২শে জানুয়ারী, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২২শে জানুয়ারী, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “ক্ষমা ও শাস্তির প্রকৃত তাৎপর্য”- বিষয়ে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) সূরা শূরার ৪১ নাম্বার আয়াত পাঠ করেন এবং বলেন, এতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন, “অন্যায়ের প্রতিশোধ ততটুকুই যতটুকু সেই অন্যায়টি হয়ে থাকে। কিন্তু সংশোধনের জন্য যে ক্ষমা করে তার প্রতিদান আল্লাহ্‌র কাছে রয়েছে। নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।”

ইসলামী শিক্ষা খুবই অনুপম। কেউ যদি অন্যায় করে তাহলে তাকে শাস্তি দিতে হলে অন্যায় অনুপাতে দিতে হবে। কিন্তু যদি ক্ষমা করলে অপরাধীর সংশোধনের সম্ভাবনা থাকে তাহলে ক্ষমা করাই শ্রেয়। আর যদি ক্ষমা করলে অপরাধী আরো হঠকারী হয়ে উঠে বা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া আবশ্যক। তাই কাউকে শাস্তি দেওয়ার ওপর জোর না দিয়ে তার সংশোধনের এবং নৈতিক উন্নতির ওপর জোর দেওয়া উচিত।

ইসলামের এই মহান শিক্ষার ওপর অনুশীলন করে দেখিয়েছেন আমাদের নবী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। যখন তিনি দেখেছেন যে, অপরাধীর সংশোধন হয়ে গেছে তখন তিনি তাঁর চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ওপর এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি এবং সাহাবীদের সর্বপ্রকার অত্যাচার ও নির্যাতন করা হয়েছে, কিন্তু অপরাধীরা যখনই ক্ষমার প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর কাছে এসেছে এবং খোদা ও রসূলের শিক্ষা অনুসরণের অঙ্গীকার করেছে তখন তিনি সবকিছু ভুলে গিয়ে তাদের ক্ষমা করে দেন। উদাহরণ স্বরূপ হুযূর হিজরতের সময় তাঁর স্নেহের দুলালী হযরত যয়নবের গর্ভপাত এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী হাব্বার বিন আসওয়াদকে ক্ষমা করে দেন। এমনকি তাঁর প্রিয় চাচার হত্যাকারী ও এবং যে তাঁর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল তাকেও মহানবী (সা.) ক্ষমা করে দেন।

আরেক ব্যক্তি ছিল কা’ব বিন জহির, যিনি মক্কা বিজয়ের আগে মুসলমান নারীদের নিয়ে নোংরা কবিতা রচনা করতো। তার বিরুদ্ধেও হত্যার রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুশোচনার পর তিনি মহানবীর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে হুযূর তাকে ক্ষমা দেন এবং তাকে সুন্দর একটি চাদরও উপহার দেন।

এরপর হুযূর পূর্বে পঠিত আয়াতের সূত্র ধরে বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর ১৩টি গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন বেশ কয়েক জায়গায়।

তিনি (আ.) বলেন, চোখ বন্ধ করে ক্ষমা করবে না বরং সংশোধনের সম্ভাবনা এবং অনুশোচনা দেখলেই ক্ষমা করবে কেননা, ইসলাম কারো প্রতি শত্রুতা পোষণের শিক্ষা দেয় না, বরং ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশোধন তাই কারো ভেতর অনুতাপ, অনুশোচনা এবং সংশোধন দেখলে তাকে ক্ষমা করাই উত্তম।

মনে রাখতে হবে, ক্ষমা অনেক সময় পুণ্যের কারণ হয় আবার অনেক সময় শাস্তিও পুণ্যের কারণ। অপরাধীকে শাস্তি দেয়া এটিও তার প্রতি অুনগ্রহ বৈ-কি। কারণ এই শাস্তি তাকে পাপ থেকে রক্ষা করবে। শাস্তি দেওয়ার ফলে সে পাপাচার থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জীবন বিনাশ করা থেকে রক্ষা করে।

হুযূর বলেন, আজকাল পাশ্চাত্ব্যের মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানবাধিকারের নামে অপরাধীদের এতটাই ছাড় দেয় যে, তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে আরম্ভ করে। যদি কেউ পেশাদার অপরাধী হয় তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া এমনকি মৃত্যুদন্ড দেওয়াও আবশ্যক। অথচ এসব দেশে মৃত্যুদন্ডের বিধানই নেই।

কাজেই শাস্তি সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষা হলো, স্থান-কাল ও পাত্র ভেদে শাস্তির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। সবাইকে গণহারে ক্ষমা করাও বৈধ নয় আবার সবাইকে গণহারে শাস্তি দেওয়াও যুক্তিযুক্ত নয়। শাস্তি ও ক্ষমার ক্ষেত্রে অসমতা মানুষকে অন্যায়ে প্ররোচিত করে।

এরপর আল্লাহ্র ওপর নির্ভরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে হুযূর তুর্কির বাদশাহ্ আব্দুল হামীদ খানের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। মানুষ কোন কাজই শতভাগ নিঁখুত করতে পারে না। তাই সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর আল্লাহ্র ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।

ইসলাম এমন এক ধর্ম যার শিক্ষামালা সর্বযুগে সমানভাবে গুরুত্ব বহন করে। অথচ এত অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা থাকা সত্বেও আজ মুসলমান দেশগুলো একে উপেক্ষা করছে। ফলে প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিকদের মাঝে অসন্তোষ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে আর নির্বিচারে সাধারণ মানুষ মারা পড়ছে।

অতএব অবস্থা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যদি কাউকে শাস্তি দেয়া আবশ্যক হয় তাহলে তাকে শাস্তি দাও আর যদি ক্ষমা করলে তার সংশোধন হবে বলে মনে হয় তাহলে ক্ষমা করাই উত্তম।

হুযূর জামাতের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মনে রাখবেন কাউকে শাস্তি দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয় বরং সংশোধনই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। তাই আপনারা কারো বিষয়ে সুপারিশ করার আগে ভালভাবে ভেবেচিন্তে এবং দোয়া করে মতামত দিবেন।

আল্লাহ্ তা’লা আমাদের সবাইকে ইসলামী শিক্ষামালা অনুধাবন করার এবং আমল করার তৌফিক দিন।

Top