নেক ও পুণ্যবানদের উপর আল্লাহ্‌র হিফাযতের ছায়া - জুমুআর খুতবা | Allah safegurds virtuous and rectitudinous - Friday Sermons

নেক ও পুণ্যবানদের উপর আল্লাহ্‌র হিফাযতের ছায়া

রোজ শুক্রবার, ১৫ই জানুয়ারী, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১৫ই জানুয়ারী, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “নেক ও পুণ্যবানদের উপর আল্লাহ্র হিফাযতের ছায়া”- বিষয়ে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তা’লা তাঁর ওলীদের সম্মানের হিফাযত করেন এবং তাদের সন্তান-সন্ততি এবং বংশধরদের সম্মানেরও হিফাযত করেন তবে শর্ত হচ্ছে, তারাও যেন নেকী বা পুণ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) হযরত আলী (রা.)-এর দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, নবুয়ত লাভের পর পরিবারের অন্যরা যখন মহানবী (সা.)-কে পরিত্যাগ করেন তখন অল্প বয়স্ক হযরত আলী তাঁকে গ্রহণ করেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করেন। দেখুন! এরপর হিজরতের সময় মহানবী (সা.) তাকে নিজের বিছানায় শোয়ার দায়িত্ব প্রদান করেন। কোন এক অভিযানে যাওয়ার সময় তাকে মদিনার নারী ও শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান আর বলেন, আল্লাহ্ আমাকে ইলহাম করে জানিয়েছেন তোমার অবস্থা হযরত হারুন (আ.)-এর অনুরূপ যাকে হযরত মূসা (আ.) নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।

হুযূর বলেন, হযরত আলী (আ.) কোন সম্মান লাভের বাসনায় এমনটি করেন নি আর তিনি জানতেনও না যে, ভবিষ্যতে তিনি খোদার ভালোবাসায় সিক্ত হবেন। তিনি শুধুমাত্র খোদার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই এসব পুণ্য কাজ করেছিলেন। তবে, তিনি ও তাঁর বংশধররা যে সম্মান লাভ করবেন একথা আল্লাহ্ অবশ্যই জানতেন। আজ দেখুন! হযরত আলীর এই পুণ্যের কারণে পৃথিবীতে যত ওলী-আউলিয়া এবং সূফীগণ অতীত হয়েছেন তারা সবাই ছিলেন হযরত আলীর বংশধর।

হুযূর বলেন, অনেক দিন পর খলীফা হারূন অর রশীদের যুগে ইমাম মূসা রেজাকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দী করা হয়। সেদিন রাতে খলীফা হারূন অর রশীদ স্বপ্নে দেখেন যে, মহানবী (সা.) তাকে বলছেন, তুমি আমাকে ভালোবাসার দাবী করো অথচ আমার এই প্রিয়ভাজনকে তুমি বন্দী করে রেখেছো? সেই গভীর রাতেই তিনি স্বয়ং জেলখানায় যান এবং ইমাম মূসা রেজাকে মুক্ত করে দেন। তিনি বলেন, এত রাতে আপনি স্বয়ং এসে আমাকে মুক্তি দিচ্ছেন ব্যাপার কি? তিনি বলেন, আমি আপনার সম্পর্কে জানতাম না, তাই ভুলে এমনটি হয়ে গেছে।

হুযূর বলেন, দেখুন! এতকাল পার হওয়ার পর হযরত আলীর এক বংশধরকে বন্দীর কারণে আল্লাহ্ স্বপ্নের মাধ্যমে সে সময়ের বাদশাহ্কে ভয় দেখান; এসবের মূল কারণ হলো, হযরত আলী সব কিছুই আল্লাহ্র ভালোবাসার আতিশয্যে করেছেন।

হুযূর বলেন, ওলীদের ধংশধর হওয়া বা মুরব্বীদের সন্তান-সন্ততি হওয়া তখনই মানুষের জন্য কল্যাণকর হয় যখন তারা স্বয়ং নেক ও পুণ্যবান হয়।

এরপর হুযূর হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর ভাষায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর নেকী, ধর্মসেবার ব্যাকুলতা এবং খোদার প্রতি গভীর আস্থা ও ভক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করেন।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর নামায এতটাই প্রিয় ছিল যে, অসুস্থতার কারণে কখনো তাঁকে ঘরে নামায পড়তে হলে তিনি বাজামাত নামায পড়তেন। কেননা, নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ্ মানুষকে একতার বাঁধনে আবদ্ধ করতে চান। বাজামাত নামাযের ফলে পরষ্পরের সাথে সাক্ষাত হয় এবং পরষ্পরের নেকী ও পুণ্যের ধারা অন্যের মাঝে সঞ্চারিত হয়। নামায মানুষকে এক আত্মায় রূপান্তরিত করেন এবং দুর্বলরা সবলদের কাছ থেকে শক্তি আহোরণ করে। এরফলে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়। নামায শুধু ইবাদতই নয় বরং পারষ্পরিক ভালোবাসা ও ঐক্যের মাধ্যম। তাই বাজামাত নামায পড়ার বিষয়ে আমাদের যত্নবান হতে হবে।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করে হুযূর বলেন, একদিন ফজরের নামাযের জন্য তিনি উঠতে পারেন নি বলে সারাদিন কান্নাকাটি করে কাটান। পরেরদিন রাতে স্বপ্নে দেখেন, কেউ এসে তাকে নামাযের জন্য ডাকছে, তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? সে বলে আমি শয়তান। গতকাল আমি তোমাকে নেকী থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে নামাযে উঠতে দেইনি কিন্তু তুমি সারাদিন অশ্রুপাত করেছ বলে খোদা তোমাকে বর্ধিত সওয়াব দিয়েছেন, তাই আজ আমি তোমাকে নামাযের জন্য ডাকছি যাতে তুমি বেশি সওয়াব লাভ করতে না পারো। কাজেই আমাদের উচিত, শয়তানকে ব্যর্থ করা এবং নিরাশ করা।

এরপর আল্লাহ্র ওপর নির্ভরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে হুযূর তুর্কির বাদশাহ্ আব্দুল হামীদ খানের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। মানুষ কোন কাজই শতভাগ নিঁখুত করতে পারে না। তাই সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর আল্লাহ্র ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।

হুযূর বলেন, শুধু আল্লাহ্র ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। এজন্য পরিশ্রমও করতে হবে। চেষ্টা-সাধনাও আবশ্যক। মহানবী (সা.)-কে আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, “তাঁকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করবেন” তারপরও তিনি যুদ্ধে যাওয়ার সময় বর্ম পরিধান করতেন এবং যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম সঙ্গে নিতেন।

কেউ যদি বলে যে, আল্লাহ্ বলেছেন, “আকাশে তোমাদের জীবিকা রয়েছে আর যা কিছুর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাও আকাশেই আছে”। তাই আমাদের কোন কাজ করার প্রয়োজন নেই, তাহলে সে চরম নির্বোধ। কেননা, পবিত্র কুরআনেই বলা আছে, ‘আল্লাহ্‌র ফযল অন্বেষণের জন্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়’। খোদার ফযল ছাড়া আমাদের কোন কাজই সফল হতে পারে না তাই মু’মিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখা।

এরপর হুযূর বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর প্রতি ইলহাম হয়েছিল, ‘বাদশাহ্ তোমার পোষাক থেকে কল্যাণ সন্ধান করবে’। আল্লাহ্ তা’লার ফযলে এই ইলহাম অচিরেই অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হবে। কিন্তু হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর রচনাবলী থেকে আমাদের বরকত লাভের সমূহ চেষ্টা করা আবশ্যক। তিনি অনেক কষ্ট করে এই আধ্যাত্মিক ভান্ডার আমাদের জন্য প্রস্তুত করে গেছেন, এত্থেকে লাভবান হওয়ার জন্য এসব গ্রন্থ পাঠ করা, অনুধাবন করা এবং এর প্রচার করা আমাদের জন্য আবশ্যক।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর তবারক সমূহের সুষ্ঠু সংরক্ষণের প্রতি হুযূর গুরুত্বারোপ করেন। এগুলোতে যেন পোকা না লাগে সেজন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠিয়ে হলেও এসব মূল্যবান জিনিষ শত শত বছর ধরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন। কেননা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব বস্তু থেকে লাভবান হবে।

Top