নতুন বর্ষ ও আহ্‌মদীদের দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য - জুমুআর খুতবা | The Year 2016 and our Responsibilities - Friday Sermons

নতুন বর্ষ ও আহ্‌মদীদের দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য

রোজ শুক্রবার, ১লা জানুয়ারী, ২০১৬ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১লা জানুয়ারী, ২০১৬ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ্ মসজিদে “নতুন বর্ষ ও আহ্‌মদীদের দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য”- বিষয়ে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আজ নববর্ষের প্রথম দিন এবং পবিত্র জুমুআর দিনও বটে। জামাতের সদস্যরা পরষ্পরকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এবং আমার কাছেও মানুষের কাছ থেকে শুভেচ্ছা-পত্র আসছে। পাশ্চাত্বের অনুকরণে বিভিন্ন মুসলমান দেশও বিভিন্ন হৈ-হুল্লোর, বেলেল্লাপনা ও আতশবাজী পুড়িয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়েছে। নববর্ষের প্রাক্কালে গতকাল দুবাইয়ের একটি বড় হোটেলে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে কিন্তু তারপরও সেখানে তারা বাজী পুড়িয়ে বিভিন্ন বেহুদা কাজ করে বর্ষবরণ করেছে। অথচ এই বেহুদা কাজে অর্থ অপচয় না করে দরিদ্র দেশের অভাবী মুসলমানদের পেছনে তাদের এই অর্থ ব্যয় করা উচিত ছিল।

হুযূর বলেন, অপরদিকে আহমদীরা ব্যক্তিভাবে এবং জামাতবদ্ধভাবে তাহাজ্জুদ নামাযের মাধ্যমে রাত কাটিয়েছে এবং বর্ষবরণ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন নেক কাজেও তারা অংশ নিয়েছে। তাসত্ত্বেও অন্যান্য মুসলমানদের দৃষ্টিতে আহমদীরা মুসলমান নয়। কারো কাছ থেকে মুসলমানীত্বের সনদ নেওয়ার আমাদের প্রয়োজন নেই আমাদের জন্য শুধু আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সনদই যথেষ্ট।

হুযূর বলেন, আমাদের এই ইবাদত ও পুণ্যকাজ ১/২দিনের জন্য হওয়া উচিত নয় বরং বছরের বারো মাসই আমাদের সৎকাজে রত থাকা উচিত। এক রাতের ইবাদত দিয়ে খোদার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে অবিচলতা প্রয়োজন।

এরপর হুযূর যুগের সংস্কারক হিসেবে প্রেরিত হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজ অনুসারীদের কাছে কিরূপ নেকী ও পুণ্যকর্মের প্রত্যাশা রেখেছেন এবং এ লক্ষ্যে জামাতের সদস্যদের কি কি নসীহত করেছেন তা তাঁর রচনাবলী হতে স্ববিস্তারে তুলে ধরেন।

তিনি (আ.) মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের বাঁচা-মরা সবই আল্লাহ্‌র জন্য না হবে ততদিন সে খোদার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। পার্থিবতার পিছনে না ছুটে ধর্মকে পার্থিবতার ওপর প্রাধান্য দেয়া উচিত। আমাদের জাগতিকতা অর্জনের মূল উদ্দেশ্যও যেন হয় পরকালীন কল্যাণ। যেমনটি আল্লাহ্ আমাদের দোয়া শিখিয়েছেন, হে আল্লাহ্ আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ এবং পারলৌকিক কল্যাণ দান করো। জাগতিক উপার্জন বা পার্থিব নিয়ামতরাজি ভোগ করতে আল্লাহ্ বারণ করেন না বরং তিনি বলেন, এই নিয়ামত যেন ধর্মের সেবক হয়।

আজ মুসলমান দেশগুলো অর্থের অহংকারে খোদা ও রসূলের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শয়তানের পথ অনুসরণ করছে। অথচ মানুষের মাঝে খোদাভীতি ও খোদাপ্রেমের ফলেই সৎকর্ম করার আগ্রহ সৃষ্টি হয় আর পবিত্র পরিবর্তন সাধিত হয়।

রাগ,ক্রোধ, অহংকার, বিদ্বেষ, আত্মশ্লাঘা পরিহার করার আহবান জানিয়ে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, যারা বিচক্ষণ ও খোদাভীরু তারা কখনো ক্রোধান্বিত হয় না এবং অহংকারবশে কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হেয় করে না। যারা তাক্বওয়ার পথে বিচরণ করে তারা অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখে, নামায কায়েম করে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত ধন-সম্পদ হতে তাঁর রাস্তায় খরচ করে। আর এরাই হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং এক্ষেত্রে ক্রমশঃ উন্নতি করতে থাকে। তাই আমাদের জামাতের প্রত্যেক সদস্যের আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন যে, তার মাঝে কতটা তাক্বওয়া আছে।

তিনি (আ.) বলেন, আমার জামাতের সদস্যরা পরষ্পরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞা করবে এটি আমি চাই না। কেউ নিজেকে বড় মনে করলেই অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে পারে আর এমনটি মানুষের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে। আসল বড় সে-ই যে, দীনহীনের কথাও পুরো মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে শোনে আর তাকে সম্মান করে, তার কথার মূল্য দেয় এবং তাকে আন্তরিকতার সাথে সহযোগিতা করে।

হুযূর বলেন, আজকাল শিক্ষিত সমাজ ধর্মের প্রতি দৃষ্টি দেয় না। ফলে জীবনের কোন এক মোড়ে গিয়ে এরা জ্যোতির্বিদ বা দার্শনীকদের কোন লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয় এবং নাস্তিক হয়ে যায়। তাই পিতামাতার দায়িত্ব হলো, শৈশবেই সন্তানদের ধর্মের মর্ম শেখানো এবং তাদের ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আবির্ভাবে মূল দু’টি উদ্দেশ্য হলো, খোদার তৌহিদ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করা আর পরষ্পরের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা। আমাদের জামাতের প্রতিটি সদস্যের এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া উচিত নতুবা তিনি (আ.) জামাতের সদস্যদের অনুকূলে যেসব দোয়া করেছেন আমরা তা হতে বঞ্চিত থেকে যাবো।

আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর প্রত্যাশা পূরণ করার এবং তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন।

খুতবার শেষে হুযূর বিশ্ব জামাতে আহমদীয়াকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।

Top