In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত

খন্দকার আজমল হক

এ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে খিলাফত কি সে বিষয়ে জানা প্রয়োজন। ‘খিলাফত’ আরবী শব্দ। এর অর্থ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান। যাঁরা কারও কারও প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের খলীফা বলা হয়। কুরআন পাকে তিন ধরনের খিলাফতের উল্ল্যেখ আছে।

(১) হুয়াল্লাযী খালাকাকুম খালায়েফা ফিল আরযে” অর্থাৎ তিনিই তোমাদের পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত করেছেন। (সূরা ফাতিরঃ ৪০)

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টির সবকিছুই তাদের সেবায় নিয়োজিত। এজন্যই আয়াতটিতে মানুষকে সৃষ্ট বস্তুর মাঝে আল্লাহ্‌র স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিনিধি বলা হয়েছে।

(২) আল্লাহ্‌ বলেছেন, ইন্নি জায়েলোন ফিল আরযে খলীফা, অর্থাৎ নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করতে চলেছি।” (সূরা আল্‌ বাক্বারাহ্‌ঃ ৩১)

প্রাথমিক যুগের মানুষ সভ্যতা বর্জিত ছিল। এদের সভ্য করার এবং এদের নিকট আল্লাহ্‌র হেদায়াত পৌঁছানোর জন্য হযরত আদম (আঃ)-কে মনোনীত করার কথা এখানে বলা হয়েছে। আল্লাহ্‌র তরফ হতে আসার কারণে তিনি আল্লাহ্‌র খলীফা। আল্লাহ্‌র বাণীপ্রাপ্ত হবার কারণে তিনি নবী নামেও আখ্যায়িত। অন্যান্য নবীগণও আল্লাহ্‌র তরফ হতে আসেন। তাই তাঁরাও আল্লাহ্‌র খলীফা।

(৩) কুরআন পাকে তৃতীয় ধরনের যে খিলাফতের কথা বলা হয়েছে, তা’ কোন নবীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেমন বলা হয়েছে,

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্‌ তাদের সাথে ওয়াদা করেছেন যে তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করবেন যেভাবে তিনি তাদের পূর্ববতীগণকে খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন।”

আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ সৎকর্মশীল মু’মিন মুসলমানদের সাথে ওয়াদা করেছেন, তিনি অবশ্যই হযরত রসূল করীম (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাদের মাঝে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করবেন, যাঁরা সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে মুসলমানদের হেদায়াতের পথে পরিচালিত করবেন।

হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত নবী করীম (সাঃ) বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে নবুওয়ত ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাহেন। এরপর আল্লাহ্‌ তা তুলে নিবেন। এরপর নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা ততক্ষণ বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন। এরপর তিনি তা তুলে নিবেন। তখন যুলুম অত্যাচার ও উৎপীড়নের রাজত্ব কায়েম হবে। তা’ ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন। এরপর আল্লাহ্‌ তা’ তুলে নিবেন। তখন তা’ অহংকার ও জবরদস্তিমূলক সাম্রাজ্যে পরিণত হবে এবং তা’ ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন। এরপর আল্লাহ্‌ তা’ তুলে নিবেন। তখন নবুওয়তের পদ্ধতিতে পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।” (আহ্‌মদ, বায়হাকী)

হাদীসটিতে “খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত” দু’বার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। প্রথম খিলাফত হযরত রসূলে পাক (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর এবং দ্বিতীয় খিলাফত মুসলমানদের চরম অবনতির পর।

রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর পর প্রতিষ্ঠিত খিলাফতকে খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত বা নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত বলায় প্রতীয়মান হয় উভয় খিলাফতই নবুওয়তের পর প্রতিষ্ঠিত হবে।

সবাই জানেন, ইসলামের প্রথম খিলাফত হযরত রসূলে করীম (সাঃ)-এর নবুওয়তের পরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় খিলাফতও যে কোন নবীর পরই প্রতিষ্ঠিত হবে তাতে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। এজন্যই নবী করীম (সাঃ) বলেছেন,

“তখন নবুওয়তের পদ্ধতিতে পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।”

এখন প্রশ্ন “নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত” কখন ও কার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে?

হযরত হুযায়ফা (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস হতে জানা যায়, প্রথম খিলাফত কিছু দিন শরীয়ত মোতাবেক চলার পর রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তখন ইসলামী খিলাফত থাকবে না। থাকলেও এর কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ থাকবে। মুসলমানদের ঈমানী আকিদার দুর্বলতার কারণেই এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হবে। তখনই নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।

আবার কুরআন পাকের সূরা জুমুআর একটি আয়াতের ব্যাখ্যায়ও হুযূর (সাঃ) বলেছেন, ঈমান যখন সূরাইয়া নক্ষত্রে উঠে যাবে, তখন পারশ্যবংশীয় এক বা একাধিক ব্যক্তি ঈমানকে ফিরিয়ে আনবেন। তফসীরকারদের মতে হাদীসটিতে হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর আগমনের কথা বলা হয়েছে।

অতএব দেখা গেল, নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সময় মুসলমানদের ঈমানী আকিদার যেরূপ অবস্থা হবে, হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর অবির্ভারের সময়ই একই অবস্থা বিরাজ করবে। এতে কি এটাই প্রমাণিত হয় না যে, নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর আবির্ভাব একই সময়ে ঘটবে।

এখন দেখা যাক এই সময় কখন আসবে?

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খোলাফায়ে রাশেদার যুগ ছিল ইসলামে স্বর্ণ যুগ। এরপর উমাইয়া ও আব্বাসিয়দের সময় ইসলামী খিলাফত রাজতন্ত্রে রূপ নেয়। পরে তা’ হালাকু খাঁ কর্তৃক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশ ভিত্তিক রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। তখন ইসলামী খিলাফত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা’ তুরস্কে নিবু নিবু অবস্থায় টিকে থাকে। পরে কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক তা-ও নির্বাপিত হয়।

কিন্তু কুরআন হাদীস হতে জানা যায়, ইসলাম খিলাফতশূন্য হবে না। অতএব প্রথম খিলাফত নির্বাপিত হবার পূর্বেই অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতেই দ্বিতীয়বার নবুওয়তের ভিত্তিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হবার কথা।

কুরআন হাদীসও একই সময় নির্দেশ করে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

“আমার শতাব্দী উত্তম, তৎপর তৎসন্নিহিতগণ, তৎপর তৎসন্নিহিতগণ, তৎপর মিথ্যার প্রাদুর্ভাব হবে”। (নিসাঈ, মিশকাত)

কুরআনে বলা হয়েছে,

তিনি (আল্লাহ্‌) আকাশ হতে পৃথিবীর দিকে (কুরআনী শরীয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য) ব্যবস্থা পরিচালনা করেন। এরপর তা’ তাঁর দিকে উঠে যাবে একদিনে যা তোমাদের গণনায় এক হাজার বৎসর”। (সূরা আস্‌ সিজদাহঃ ৬)

উপরের উদ্ধৃতিদ্বয় হতে জানা যায় হুযূর পাক (সাঃ)-এর মৃত্যুর পরবর্তী তিনশ’ বছর মুসলমানদের উন্নতির যুগ এবং তৎপরবর্তী এক হাজার বৎসর অবনতির যুগ। অর্থাৎ হুযূর (সাঃ)-এর মৃত্যুর তেরশ’ বৎসরের ভিতর মুসলমানদের চরম অবনতি ঘটবে। এ সময়ই, হাদীসের ভাষায়, ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে উঠে যাবে। তখনই ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) আবির্ভূত হবেন। অর্থাৎ হিজরীর তেরশ’ বৎসর পর বা চতুর্দশ শতাব্দীই তাঁর আগমনের নির্দিষ্ট সময়।

অপর একটি হাদীস হতে জানা যায় ইসলামে ধর্মীয় সংস্কারকের আবির্ভাব প্রতি হিজরী শতাব্দীর শিরোভাগে হবে। অতএব হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর আবির্ভাব হিজরীর চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগেই নির্ধারিত ইংরেজী সন হিসেবে যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ।

পূর্বেই উল্ল্যেখ করা হয়েছে, মুসলমানদের হেদায়াতের জন্য শেষ জামানায় হযরত ঈসা (আঃ) ইমাম মাহ্‌দী রূপে আবির্ভূত হবেন। কিন্তু মুসলিম আলেমগণ প্রচার করে থাকেন, হযরত ঈসা (আঃ) ও ইমাম মাহ্‌দী দু’জন পৃথক ব্যক্তি। বস্তুত হাদীস শরীফে নাম দু’টি পৃথকভাবে উল্ল্যেখ থাকায় আলেমগণ ভ্রমে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ মনোযোগের সাথে পাঠ করলে জানা যায়, শেষ জামানায় আগমনকারী প্রতিশ্রুত মহাপুরুষকে কোন স্থানে ঈসা (আঃ), কোন কোন স্থানে ইমাম মাহ্‌দী (আঃ), আবার কোন কোন স্থানে উভয়ে একই ব্যক্তি বলা হয়েছে।

প্রকৃত কথা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথে হযরত মাহ্‌দী (আঃ)-এর কিছু গুণগত ও অন্যান্য সাদৃশ্য থাকার জন্যই হাদীস শরীফে ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-কে ঈসা ইবনে মরিয়ম বলা হয়েছে। যেমন কোন দানশীল ব্যক্তিকে হাতেম তাঈ বা কোন বদ মেজাজী মহিলাকে দজ্জাল মহিলা বলা হয়।

হযরত ঈসা (আঃ) ও ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) যে একই ব্যক্তি, নিম্নের হাদীসসমুহ হতেও এ প্রমাণ মিলে।

হযরত ঈসা (আঃ) ও ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) একই ব্যক্তি হওয়ায় সহী বুখারীতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উল্ল্যেখ থাকলেও হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর কোন উল্ল্যেখ নেই। বরং হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে,

“তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের ইমাম হবেন”। (বুখারী কিতাবুত্‌ তফসীর)

অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) মুসলমানদের মধ্য হতে হবেন, বাইরের কেউ নয়।

এ ছাড়া কুরআন পাক হতে জানা যায়, হযরত ঈসা (আঃ) বনী ইস্রাঈলের নবী ছিলেন, যিনি বহু পুর্বেই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। অতএব তিনি মুসলমানদের নবী হতে পারেন না। আর যেহেতু তিনি মৃত, সুতরাং তাঁর জীবিতাবস্থায় দুনিয়াতে ফিরে আসাও অবাস্তব।

বলা হয়ে থকে, হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) নবী হবেন না। কথাটি সঠিক নয়। কারণ ইমাম মাহ্‌দী বলার পর যারা তাঁকে নবী মানে না তারাও ‘আলায়হেস সালাম’ বলে থাকেন। কিন্তু একথা কারও অজনা নয়, আলায়হেস সালাম নবীদের নামের পরই ব্যবহৃত হয়। যেহেতু ইমাম মাহ্‌দী বলার পরও আলায়হেস সালাম বলা হয়, সুতরাং তিনি নবী। তবে অবশ্যই খাতামন্নাবীঈন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উম্মতী নবী। (সূরা নিসাঃ ৭০)

এ ছাড়া পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে, হযরত ঈসা (আঃ) ও ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) একই ব্যক্তি। যেহেতু উম্মতে মুহাম্মদীয়াতে আগমনকারী ঈসা (আঃ)-কে হাদীসে ‘নবী’ বলা হয়েছে (তিরমিযী)। অতএব হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)ও অবশ্যই নবী হবেন।

এখন দেখা যাক, হিজরীর চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে এরূপ কোন দাবীকারক ছিলেন কিনা?

ইতিহাস হতে জানা যায়, সেই সময় ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে মির্যা গোলাম আহ্‌মদ নামে এক ব্যক্তি ইমাম মাহ্‌দী ও প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ বলে দাবী করেন। হিজরীর ১৩০৬ সালে বা চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীর শিরোভাগে তাঁর এই দাবী তাঁর সত্যতারই প্রমাণ। তিনি তাঁর দাবীর স্বপক্ষে কুরআন হাদীস হতেও প্রয়োজনীয় প্রমাণ পেশ করেন। তাঁর দাবীর পর হতে আজ পর্যন্ত অন্য কোন দাবীকারক না থাকায় তিনিই যে প্রতিশ্রুত মাহ্‌দী তা’ বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় কুদরত বা খিলাফত অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। তদনুযায়ী তাঁর মৃত্যুর একদিন পরই ১৯০৮ সালের ২৭শে মে যে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়, তা-ই খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত বা নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত। বিরুদ্ধবাদীরা বহু চেষ্টা করেও এর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। এখনও তা’ ধারাবহিকভাবে চলমান আছে। বর্তমানে এর পঞ্চম খিলাফত চলছে। আগামী ২০০৮ সালে এর শতবর্ষ জুবিলী উৎসব পালিত হতে যাচ্ছে। হযরত রসূলে করীম (সাঃ) ও হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এ খিলাফত কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

পাক্ষিক আহ্‌মদী - ৩১শে জানুয়ারী ২০০৭

উপরে চলুন