In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীতে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর আবির্ভাব

হযরত মীর্যা গোলাম আহ্‌মদ কাদিয়ানী (আঃ) প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও ইমাম মাহ্‌দী

হযরত মীর্যা গোলাম আহমদ (আঃ) ১৮৩৫ সনে কাদিয়ানে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯০৮ সনে মৃত্যূবরণ করেন। তিনি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মনোনিত হবার প্রথম ওহী লাভ করেন ১৮৮২ সনে। তিনি ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুপম সৌন্দর্য ও গুণাবলী সম্বলিত ‘বারাহীনে আহ্‌মদীয়া’ নামে তাঁর রচিত প্রথম বই প্রকাশ করেন ১৮৮৪ সনে। তিনি প্রায় ৮৮টি বই রচনা করেছেন। আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশে তিনি ১৮৮৯ সনে আহ্‌মদীয়া মসুলিম জামাতের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মুত্যূর পরে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী ১৯০৮ সনের ২৭শে মে জামাতের মধ্যে খিলাফত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। জামাতের বর্তমান খলীফা হযরত মীর্যা মসরুর আহ্‌মদ, খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)। তাঁর নেতৃত্বে সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজ অব্যাহত রয়েছে। সারা বিশ্বে ১৮৪টি দেশে প্রায় বিশ কোটি আহ্‌মদী মুসলমান তাদের বিপুল পরিমান আর্থিক ত্যাগের মাধ্যমে অসংখ্য মস্‌জিদ, মিশন হাউজ, তবলীগ সেন্টার, হাসপাতাল ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে মানবজাতির সেবা করে যাচ্ছে। প্রায় ৬৫টি ভাষায় এই জামা’ত সম্পূর্ণ কুরআন এবং ১০০টিরও অধিক ভাষায় পবিত্র কুরআনের আংশিক অনুবাদ ছাপিয়েছে।

প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর আবির্ভাব

আল্লাহ্‌ জাল্লা শানহু পবিত্র কুরআনে করীমে বলেছেনঃ

أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ

“আনুগত্য কর আল্লাহ্‌র এবং আনুগত্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যাঁরা আদেশ দেয়ার অধিকার প্রাপ্ত (তাদেরও)”। (সূরা নিসাঃ ৬০)

এই আয়াতাংশে ‘উলীল আমর’ বা অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি বলতে বিশেষভাবে ও আধ্যাত্মিকভাবে বোঝানো হয়েছে ‘ইমামুজ্জামান’ বা যুগ-ইমামকে। মুসলমান মাত্রেরই জানা থাকার কথা যে, সাইয়্যেদনা ও মওলানা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রত্যেক শতাব্দীর শিরোভাগে এই উম্মতের জন্য এমন মহাপুরুষকে আবির্ভূত করবেন, যিনি তাদের জন্য ধর্মকে সঞ্জীবিত করবেন”। (আবু দাউদ, মিশকাত)

সহীহ্‌ হাদীসে আরো বলা হয়েছেঃ

“যে ব্যক্তি যামানার ইমামের হাতে বয়আত না করেই ইহলোক ত্যাগ করেছে সে জাহেলিয়াতের বা অজ্ঞতার মৃত্যূবরণ করেছে”। (মুসলিম)

এই একটি মাত্র হাদীসই যে কোন ধর্মভীরু ব্যক্তির হৃদয়কে যুগ-ইমামের অনুসন্ধানে ধাবিত করতে যথেষ্ট। কেননা, জাহেলিয়াতের মৃত্যূ এমন এক দুর্ভাগ্যের সমষ্টি যে, কোন প্রকারের অকল্যাণ ও অমঙ্গল এর বাইরে নয়। অতএব, নবী করীম (সাঃ)-এর এই ওসীয়্যত-বাণী অনুযায়ী প্রত্যেক সত্বান্বেষীর প্রকৃত ইমামের অনুসন্ধানে তৎপর থাকা অত্যাবশ্যক।

উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মুজাদ্দিদগণের নাম

হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রাহঃ)

২য় হিজরী শতাব্দী

ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহঃ)

৩য় হিজরী শতাব্দী

ইব্‌নে শরীহ্‌ (রাহঃ) ও আবুল হাসান আশআরী (রহঃ)

৪র্থ হিজরী শতাব্দী

আবুল ওবায়দুল্লাহ্‌ নিশাপুরী (রহঃ) ও কাযী আবুবকর বাকলানী (রহঃ)

৫ম হিজরী শতাব্দী

হযরত ইমাম আবু হামেদ গায্‌যালী (রহঃ) ও সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী (রাহঃ)

৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) ও খাজা মঈনুদ্দিন চিশ্‌তি আজমীরী (রহঃ)

৭ম হিজরী শতাব্দী

হাফিয ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ) ও হযরত সালেহ্‌ বিন ওমর (রহঃ)

৮ম হিজরী শতাব্দী

ইমাম সিউতি (রহঃ)

৯ম হিজরী শতাব্দী

ইমাম মুহাম্মদ তাহির গুজরাটি (রহঃ)

১০ম হিজরী শতাব্দী

মুজাদ্দিদ আলফেসানি শেখ আহ্‌মদ সারহিন্দী (রহঃ)

১১শ হিজরী শতাব্দী

শাহ্‌ ওলিউল্লাহ্‌ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহঃ)

১২শ হিজরী শতাব্দী

সৈয়দ আহমদ বেরেলবী (রহঃ)

১৩শ হিজরী শতাব্দী

অতঃপর হিজরী ১৪শ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত মীর্যা গোলাম আহ্‌মদ কাদিয়ানী (আঃ)। হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর যিনি মুজাদ্দিদ তিনিই প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)। অতঃপর সূরা নূর-এর ‘আয়াত-এ-ইস্তেখলাফ’ (২৪:৫৬) এবং ‘খিলাফত আলা মিন হাযিন নবুয়ত’ (নবুয়তের ধারায় খিলাফত) হাদীস অনুযায়ী ইসলামে পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই খিলাফত নিরবচ্ছিন্ন ধারায় কিয়ামত পর্যন্ত জারী ও কায়েম থাকবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

হযরত নু’মান বিন বশীর হুযায়ফা বর্ণনা করেছেন যে,

“হযরত রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে নবুয়ত ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন অতঃপর, আল্লাহ্‌ তা’আলা তা উঠিয়ে নিবেন। এরপর নবুয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন, অতঃপর আল্লাহ্‌ তা’আলা তা উঠিয়ে নিবেন। তখন যুলুম, অত্যাচার ও উৎপীড়নের রাজত্ব কায়েম হবে। তা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন, অতঃপর আল্লাহ্‌ তা’আলা তা উঠিয়ে নিবেন। তখন তা অহংকার ও জবরদস্তি মূলক সাম্রাজ্যে পরিণত হবে, এবং তা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ চাইবেন, অতঃপর আল্লাহ্‌ তা’আলা তা উঠিয়ে নিবেন। তখন নবুয়তের পদ্ধতিতে (অর্থাৎ ইমাম মাহ্‌দী ও মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর আগমনের পর) পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে। অতঃপর হযরত নবী করীম (সাঃ) নীরব হয়ে গেলেন।” (আহ্‌মদ-বাইহাকী)

মুসলিম উম্মাহ্‌র আলেমদের প্রায় সকলেই হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দী (তের শতাব্দী) পর্যন্ত আগমনকারী যুগ-ইমামগণের উল্ল্যেখ করে থাকেন। কিন্তু হিজরী চৌদ্দ শতাব্দীতে কোন যুগ-ইমামের আগমন হয়েছে কিনা সে কথা তাঁরা বলতে চান না বা স্বীকার করতে চান না। এক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, আঁ-হযরত (সাঃ)-এর পবিত্র হাদীসের যে ভবিষ্যদ্বাণী বিগত তেরশ’ বৎসর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে পূর্ণ হয়ে এসেছে, তা কি চৌদ্দ শতাব্দীতে এসে সহসাই অকেজো হয়ে গেছে?

আমাদের কথা হল - হয়নি, হতে পারে না। আকাশ-পাতাল উলট-পালট হতে পারে, চন্দ্র-সুর্যের আলো দান বন্ধ হতে পারে, কিন্তু আঁ-হযরত (সাঃ)-এর কথা রদ হতে পারে না। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা বন্ধ হতে পারে না। কেননা, আল্লাহ্‌র রসূল (সাঃ) আল্লাহ্‌র নির্দেশেই কথা বলতেন। তাই, আমরা বিশ্বাস করি এবং আল্লাহ্‌র ফযলে আমরা জানি যে, হিজরী চৌদ্দ শতাব্দীতেও রসূলে পাক (সাঃ)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে এবং পূর্বের চেয়ে শক্তিশালীভাবে পূর্ণ হয়েছে। এবং চৌদ্দ শতকের সেই যুগ-ইমাম ও মুজাদ্দিদের পবিত্র নাম হযরত মীর্যা গোলাম আহ্‌মদ কাদিয়ানী (আঃ)।

ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-কে মান্য করার গুরুত্ব

রসূলে পাক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আখেরী যমানার সেই যুগ-ইমামকে প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও মাহ্‌দী উপাধিতে ভূষিত করেছেন এবং তাঁকে মান্য করার জন্য জোর তাকিদ দিয়েছেন। যেমনঃ

হযরত রসূলে করীম (সাঃ) বলেছেনঃ

“যখন তোমরা তাঁকে দেখতে পাবে তাঁর হাতে বয়আত করো, যদি বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়েও যেতে হয়, নিশ্চয় তিনি আল্লাহ্‌র খলীফা আল্‌ মাহ্‌দী।” (সুনান ইবনে মাজা-বাবু খুরুজুল মাহ্‌দী)

“অতঃপর আল্লাহ্‌ তা’আলার খলীফা ইমাম মাহ্‌দী আসবেন, তোমরা তাঁর আগমন বার্তা শোনা মাত্রই তাঁর কাছে হাজির হয়ে বয়আত করবে।”(মিসবাহ্‌ যুজাজা, হাসিয়া ইবনে মাজা, বাবু খুরুজুল মাহ্‌দী)

“তোমাদের মধ্যে যে কেউ ইমাম মাহ্‌দীকে পাবে তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে আমার সালাম পৌঁছাবে।” (কনযুল উম্মাল)

“প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব হবে সর্বোতভাবে ইমাম মাহ্‌দীর সাহায্য করা অথবা বলেছেন, তাঁর আহবানে সাড়া দেয়া।” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহ্‌দী)

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

হযরত মীর্যা গোলাম আহ্‌মদ ১৮৩৫ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী ভারতে পূর্বপাঞ্জাবের কাদিয়ান গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ২৩শে মার্চ, ১৮৮৯ সনে হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে এই জামাতের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই জামা’ত প্রতিষ্ঠার শতাধিক বছর অতিবাহিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ধর্মীয় জগতে এই জামা’ত বিশেষ স্থান ও মর্যাদা অর্জন করেছে।

আহ্‌মদীয়া মসুলিম জামা’ত বর্তমানে ১৮৬টি দেশে দিনরাত অধ্যবসায়ের সাথে নিজেদের ধন, মান, প্রাণ ও সম্পদের ত্যাগ স্বীকার করে ইসলাম ও মানবতার সেবা করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত এ জামা’ত পয়ষট্টি’টিরও অধিক ভাষায় সম্পূর্ণ কুরআন শরীফের সংক্ষিপ্ত তফসীরসহ অনুবাদ প্রকাশ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে। শতাধিক ভাষায় কুরআন শরীফ ও হাদীসের বিষয়ভিত্তিক কতিপয় অংশের অ��ুবাদ প্রকাশ করেছে। আরো অনেক ভাষায় কুরআনের মূদ্রণ প্রকাশনাধীন রয়েছে। এই জামা’ত কর্তৃক ইসলামী সাহিত্য সম্বলিত পুস্তক-পুস্তিকা ছাড়াও সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দে��ে বিভিন্ন ভাষায় প্রায় ৫০টি পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দেড়শ’র অধিক স্কুল-কলেজ এবং শ’খানেক হাসপাতাল আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামা’ত কর্তৃক নির্মিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ জামা’ত এখন পর্যন্ত দেড় হাজারেরও অধিক মসজিদ ও ইসলাম প্রচার কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতের প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার লক্ষ-লক্ষ ধর্মহীন মানুষ ও খৃষ্টধর্মাবলম্বী আজ ইসলাম গ্রহণ করছে। তাঁরা এখন পবিত্র কলেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্”-এর উপর সর্বান্তঃকরণে ঈমান এনে তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে চলছে।

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামা’ত কোন নতুন ধর্মের অনুসারী নয়। এই জামা’ত সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ ধর্ম ইসলামের শিক্ষা হতে চুল-পরিমাণ বিচ্যুতিকেও না-জায়েয বলে মনে করে। এই জামা’ত ইসলামের শিক্ষায় বিন্দু মাত্র কমবেশী করাকে অপরাধ জ্ঞান করে। এ জামা’ত খাঁটি ইসলামের প্রকৃত, স্বচ্ছ, সজীব, নির্মল ও সুন্দর রূপ জগদ্বাসীর সামনে উপস্থাপন করে থাকে।

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামা’ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর উপর নাযিলকৃত কুরআনের বিসমিল্লাহ্‌র ‘বে’ থেকে নিয়ে ওয়ান্নাস এর ‘সীন’ পর্যন্ত প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও আয়াতের উপর এর প্রত্যেটি যের ও যবরসহ পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। আমরা এও বিশ্বাস রাখি যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর অঙ্গীকার অনুযায়ী সর্বকালে অলৌকিকভাবে কুরআনের সংরক্ষণ ও হিফাযত করে এসেছেন এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবেন। তাই কুরআনের কোন আয়াত তো দূরের কথা এর কোন যের বা যবরও পরিবর্তন করা বা মনসূখ (রহিত) করার সাধ্য কারো নেই।

কুরআন মজীদের অটল ও অমোঘ শিক্ষা -‘ধর্মে জবরদস্তি নাই’ (২:২৫৭) - এর আলোকে আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামা’ত ধর্মের ব্যাপারে কোন ধরণের বলপ্রয়োগ বা বাড়াবাড়িতে বিশ্বাসী নয়। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে, ইসলাম প্রচারের জন্য কখনো বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়নি এবং হবেও না।

আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা দাবী করেছেন যে, ইসলামের পুনর্জাগরণ ও বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন তদনুযায়ী হিজরী শতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে আল্লাহ্‌ তা’আলা হযরত মীর্যা গোলাম আহ্‌মদ (আঃ)-কে প্রতিশ্রুত ও মসীলে মসীহ্‌ (মসীহ্‌ সদৃশ) ইমাম মাহ্‌দী রূপে আবির্ভূত করেছেন। তাঁর স্থান ও মর্যাদা হচ্ছে, তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শ্রেষ্টতম আধ্যাত্মিক সন্তান ও সেবক। সূরা নূর-এ প্রদত্ত আল্লাহ্‌ তা’আলার ওয়াদা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত খিলাফতের সিলসিলায় এই জামাতের বর্তমান খলীফা হচ্ছেন হযরত মীর্যা মসরুর আহ্‌মদ (আই:)। তিনি আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতের খিলাফতের ক্রম-ধারায় পঞ্চম খলীফা। তাঁর প্রদত্ত জুমুআর খুতবা ‘মুসলিম টেলিভিশন আহ্‌মদীয়া’ কর্তৃক ভূ-উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) মাধ্যমে বিশ্বের ৫টি মহাদেশে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সাম্প্রতিককালে ‘মুসলিম টেলিভিশন আহ্‌মদীয়া’ (MTA) বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ইসলামের মহান শিক্ষার উপরে ভিত্তি করে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করেছে। বিশ্বের সকল মানুষকে আল্লাহ্‌ তা’আলার তৌহিদ এবং আঁ-হযরত (সাঃ)-এর রেসালতের ঝান্ডাতলে সমবেত করার লক্ষ্যে এটি এক অনন্য সংগ্রাম, আলহামদুলিল্লাহ্।

বিরুদ্ধবাদীগণ কর্তৃক মিথ্যা দোষারোপ করার বিরুদ্ধে নিখিল বিশ্ব আহ্‌মদীয়া মুসলিম জামাতের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা হযরত মির্যা গোলাম আ‏হ্‌মদ (আঃ) বলেন:

“আমরা ঈমান রাখি যে, খোদা তা’আলা ব্যতীত কোন মা’বুদ নাই এবং সৈয়্যদনা হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহ আলায়হে ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রসুল এবং খাতামুল আম্বিয়া। আমরা ঈমান রাখি যে, ফিরিশ্‌তা, হাশর, জান্নাত এবং জাহান্নাম সত্য এবং আমরা আরও ঈমান রাখি যে, কুরআন শরীফে আল্লাহ্‌ তা’আলা যা বলেছেন এবং আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হতে যা বর্ণিত হয়েছে উল্লিখিত বর্ণনানুসারে তা সবই সত্য। আমরা এও ঈমান রাখি, যে ব্যক্তি এই ইসলামী শরীয়ত হতে বিন্দু মাত্র বিচ্যুত হয় অথবা যে বিষয়গুলি অবশ্যকরণীয় বলে নির্ধারিত তা পরিত্যাগ করে এবং অবৈধ বস্তুকে বৈধ করণের ভিত্তি স্থাপন করে, সে ব্যক্তি বে-ঈমান এবং ইসলাম বিরোধী। আমি আমার জামা’তকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তারা যেন বিশুদ্ধ অন্তরে পবিত্র কালেমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌” এর উপর ঈমান রাখে এবং এই ঈমান নিয়ে মৃত্যূ বরণ করে। কুরআন শরীফ হতে যাদের সত্যতা প্রমাণিত, এমন সকল নবী (আলাইহিমুস সালাম) এবং কিতাবের উপর ঈমান আনবে। নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত এবং এতদ্ব্যতীত খোদা তা’লা এবং তাঁর রসূল কর্তৃক নির্ধারিত কর্তব্যসমূহকে প্রকৃতপক্ষে অবশ্য-করণীয় মনে করে, আর যাবতীয় নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে নিষিদ্ধ মনে করে সঠিকভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করবে। মোটকথা, যে সমস্ত বিষয়ের উপর আকিদা ও আমল হিসেবে পূর্ববর্তী বুযুর্গানের ‘ইজমা’ অর্থাৎ সর্ববাদী-সম্মত মত ছিল এবং যে সমস্ত বিষয়কে আহ্‌লে সুন্নত জামাতের সর্ববাদী-সম্মত মতে ইসলাম নাম দেয়া হয়েছে, তা সর্বতোভাবে মান্য করা অবশ্য কর্তব্য। যে ব্যক্তি উপরোক্ত ধর্মমতের বিরুদ্ধে কোন দোষ আমাদের প্রতি আরোপ করে, সে ত্বাকওয়া বা খোদা-ভীতি এবং সততা বিসর্জন দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটনা করে। কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ থাকবে যে, কবে সে আমাদের বুক চিরে দেখেছিল যে, আমাদের এই অঙ্গীকার সত্বেও অন্তরে আমরা এ সবের বিরোধী ছিলাম?” “আলা ইন্না লা’নাতাল্লাহে আলাল কাযেবীনা ওয়াল মুফতারিয়ীনা”- অর্থাৎ, সাবধান! নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী ও মিথ্যারোপকারীদের উপর আল্লাহ্‌র অভিসম্পাত। (আইয়ামুস সুলেহ্‌)

“আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের সারাংশ ও সারমর্ম হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌” । এই পার্থিব জীবনে আমরা যা বিশ্বাস করি এবং আল্লাহ্‌ তা’আলার কৃপায় এবং তাঁরই প্রদত্ত তৌফিকে যা নিয়ে আমরা এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করবো তা হলোঃ আমাদের সম্মানিত নেতা হঁযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) হলেন ‘খাতামান নবীঈন’ ও ‘খায়রুল মুরসালিন’ যার মাধ্যমে ধর্ম পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে এবং যে নেয়ামত দ্বারা সত্য পথ অবলম্বন করে মানুষ আল্লাহ্‌ তা’আলা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস রাখি যে, কুরআন করীম শেষ ঐশী-গ্রন্থ এবং এর শিক্ষা, বিধান, আদেশ ও নিষেধের মাঝে এক বিন্দু বা কণা পরিমাণ সংযোজনও হতে পারে না আর বিয়োজনও হতে পারে না। এখন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এমন কোন ওহী বা ইলহাম হতে পারে না যা কুরআন করীমের আদেশাবলীকে সংশোধন বা রহিত কিম্বা কোন একটি আদেশকেও পরিবর্তন করতে পারে। যদি কেউ এমন মনে করে তবে আমাদের মতে সে ব্যক্তি বিশ্বাসীদের জামা’ত বহির্ভূত, ধর্মত্যাগী ও কাফের। আর এটিও আমাদের বিশ্বাস যে, সিরাতে মুস্তাকীমের উচ্চমার্গে উপনীত হওয়া তো দূরের কথা, কোন মানুষ আমাদের নবী (সাঃ)-এর অনুসরণ ছাড়া এর সামান্য পরিমাণও অর্জন করতে পারে না। আমরা আমাদের নবী (সাঃ)-এর সত্যিকার ও পূর্ণ অনুসরণ ছাড়া কোন ধরণের আধ্যাত্মিক সম্��াণ ও উৎকর্ষতা কিম্বা মর্যাদা ও নৈকট্য লাভ করতে পারি না।” (ইযালায়ে আওহাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ১৩৭-১৩৮)

“আমরা মুসলমান। এক অদ্বিতীয় খোদা তা’আলার উপর ঈমান রাখি এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” কলেমার উপর আমরা বিশ্বাসী। আমরা কুরআনকে খোদার কিতাব এবং তাঁর রসূল খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে মানি। আমরা ফিরিশতা, পুনরুত্থান দিবস (কিয়ামত), জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাসী। আমরা নামায পড়ি ও রোযা রাখি এবং কিবলা মুখী হই। যা কিছু আল্লাহ্‌ ও রসূল (সাঃ) ‘হারাম’ (নিষিদ্ধ) আখ্যা দিয়েছেন সেগুলোকে হারাম জ্ঞান করি এবং যা কিছু ‘হালাল’ (বৈধ) করেছেন সেগুলোকে হালাল আখ্যা দেই। আমরা শরীয়তে কোন কিছু সংযোজনও করি না, বিয়োজনও করি না এবং এক বিন্দু পরিমাণও কম-বেশী করি না। যা কিছু রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর মাধ্যমে আমরা পেয়েছি- আমরা এর হিকমত বুঝি বা না বুঝি কিম্বা এর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব নাইবা উদ্ধার করতে পারি - আমরা তা গ্রহণ করি। আমরা আল্লাহ্‌র ফযলে বিশ্বাসী, একত্ববাদী মুসলমান।” (‘নূরুল হক’ পুস্তক, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫)

“আঁ-হযরত (সাঃ) ‘খাতামান নবীঈন’ এবং কুরআন শরীফ ‘খাতামুল কুতুব’। এখন আর নতুন কোন কলেমা বা নামায হতে পারে না। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যা কিছু বলেছেন বা করে দেখিয়েছেন এবং কুরআন শরীফে যে শিক্ষা প্রদত্ত এগুলোকে বাদ দিয়ে মুক্তি বা পরিত্রাণ (নাজাত) পাওয়া যাবে না। যে এগুলোকে পরিত্যাগ করে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটি আমাদের মতাদর্শ এবং আকীদা।” (মলফুযাত, অষ্টম খন্ড, পৃঃ ২৫২)

“আমি সত্য বলছি এবং খোদা তা’লার কসম খেয়ে বলছি যে, আমি এবং আমার জামা’ত মুসলমান। এ জামা’ত আঁ-হযরত (সাঃ) ও কুরআন করীমের উপর সেভাবেই ঈমান রাখে যেভাবে একজন সত্যিকার মুসলমানের ঈমান রাখা উচিত। ইসলাম থেকে কিঞ্চিত পরিমাণ পদস্খলনকে আমি ধ্বংসের কারণ বলে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস হলো এক ব্যক্তি যত কল্যাণ ও বরকত লাভ করতে পারে, যতটা আল্লাহ্‌তা’লার নৈকট্য অর্জনে সক্ষম শুধুমাত্র আঁ-হযরত (সাঃ)-এর সত্যিকার আনুগত্য ও পূর্ণ প্রেমের মাধ্যমেই সে তা লাভ করতে পারে, তা না হলে নয়। তাঁকে বাদ দিয়ে এখন পূণ্যের আর কোন পথ খোলা নাই।” (লেকচার লুধিয়ানা,পৃঃ ১২, মলফুযাত, অষ্টম খন্ড, পৃঃ ২২৪-২২৫)

“এই অধমকে তো এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করা হয়েছে, সে যেন আল্লাহ্‌র সৃষ্টির কাছে এই পয়গাম পৌঁছিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার বুকে যে সকল ধর্ম বর্তমান রয়েছে তার মধ্যে সেই ধর্মই সত্যের উপরে আছে এবং খোদা তা’লার ইচ্ছানুযায়ী বিদ্যমান রয়েছে যা কুরআন করীম নিয়ে এসেছে এবং পরিত্রাণ বা নাজাতের ঘরে দাখিল হওয়ার দরজা হচ্ছে -“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌”। (হুজ্জাতুল ইসলাম)

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আঃ)-এর দৃষ্টিতে ‘খাতামান নবীঈন’ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)

“আমি সব সময় বড় আশ্চর্যের দৃষ্টিতে দেখি যে, এই আরবী নবী যাঁর নাম মুহাম্মদ (তাঁর উপর হাজার হাজার দরূদ ও সালাম), তিনি কত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী ছিলেন। তাঁর সুউচ্চ মোকামের সীমা কল্পনা করা যায় না, তাঁর পবিত্র প্রভাব অনুমান করা মানবের সাধ্যের বাইরে। বড়ই দুঃখের বিষয়, যেভাবে তাঁকে মূল্যায়ন করা উচিৎ সেভাবে তাঁর মর্যাদাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। আল্লাহ্‌র একত্ববাদের বিশ্বাস-পৃথিবীতে যার বিলুপ্তি ঘটেছিল তিনিই সেই অনন্য বীর যিনি তা পৃথিবীতে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আল্লাহ্‌ তা’আলার সাথে পরম ভালবাসা গড়ে তোলেন আর সৃষ্টির সহানুভূতিতে তাঁর প্রাণ সবচেয়ে বেশী উদ্বেলিত হয়। তাই যিনি তাঁর হৃদয়ের রহস্য জানতেন সেই খোদা তা’আলা তাঁকে সকল নবী আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন আর তাঁর সব আশা-আকাঙ্খাকে তাঁর জীবদ্দশাতেই পূর্ণ করে দেন।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃঃ ১১৫-১১৬)

“প্রকৃতপক্ষে একজন মাত্র পূর্ণ মানবই পৃথিবীতে আগমন করেন যিনি সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ আকারে আধ্যাত্মিক পুনরুত্থান সংঘটিত করে দেখিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিনের মৃতদের আর হাজার হাজার বছরের গলিত হাঁড়গোড়কে জীবিত করে দেখিয়েছেন। তাঁর আবির্ভাবে কবরসমূহ উম্মুক্ত হয় এবং জীর্ণ পচা হাঁড়গোড়ে জীবন ফিরে আসে। তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনিই এক ত্রাণকারী (হাশের) এবং এক আধ্যাত্মিক ‘পুনরুত্থান’ যাঁর পদতলে একটি গোটা জগৎ কবর থেকে বের হয়ে সমবেত হয়।” (আয়নায়ে কামালতে ইসলাম, পৃঃ ২০৭)

“এক পূর্ণ মানব এবং নবীকুল সর্দার পৃথিবীকে হেদায়াত প্রদানের জন্য আগমন করেন যাঁর মত কেউ পূর্বেও জন্ম নেয়নি আর পরবর্তীতেও জন্ম নিবে না। তিনি পৃথিবীর জন্য এমন উজ্জল এক ধর্মগ্রন্থ (আল্‌ কুরআন) নিয়ে আসেন যার দৃষ্টান্ত কোন চোখ কখনও দেখে নি।” (বারাহীনে আহ্‌মদীয়া, চতুর্থ খন্ড, পৃঃ ৩৫১, টীকা)

“আঁ-হযরত (সাঃ) সকল উত্তম চারিত্রিক গুণের পূর্ণতা দানকারী। আর তাঁর চরিত্রকেই আল্লাহ্‌ তা’আলা এখন সর্বশেষ আদর্শরূপে ধার্য করেছেন”। (আল্‌ হাকাম পত্রিকা, ১০ই মার্চ, ১৯০৪ ইং)

“আমরা যখন ইনসাফের দৃষ্টিতে তাকাই তখন সমগ্র নবুয়তের ধারায় কেবল এক ব্যক্তিকেই অসীম সাহসী, চিরঞ্জীব এবং আল্লাহ্‌র অতীব নৈকট্যপ্রাপ্ত নবী হিসেবে দেখতে পাই - অর্থাৎ সেই নবীকূল সর্দার, রসূলগণের গৌরব, সমস্ত প্রেরিতগণের মাথার মুকুট যাঁর নাম মুহাম্মদ মুস্তফাএবং আহমদ মুজতবা (সাঃ) । যাঁর ছায়াতলে দশ দিন অতিবাহিত করে এমন জ্যোতিঃ লাভ করা যায়, যা ইতিপূর্বে হাজার বছরেও পাওয়া যেত না।” (সীরাজে মুনীর, পৃঃ ৭২)

“আদম সন্তানের জন্য হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) ছাড়া এখন আর কোন রসূল আর শাফী (যোজক) নাই। তাই তোমরা এই ঐশ্বর্য্যপূর্ণ মহান নবীর সাথে সত্যিকার প্রেম বন্ধন গড়ে তুলতে চেষ্টা কর এবং কোন ক্রমেই অন্য কাউকে তাঁর উপর কোন ধরণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না, যাতে তোমরা আকাশে মুক্তিপ্রাপ্ত হিসেবে গণ্য হতে পার। মনে রেখো, নাজাত (পরিত্রাণ) এমন কোন জিনিষের নাম নয় যা মৃত্যূর পরে প্রকাশ লাভ করবে বরং প্রকৃত নাজাত সেটিই যা এই দুনিয়ায় আপন জ্যোতিঃ প্রদর্শন করে। সত্যিকারের নাজাতপ্রাপ্ত কে? সে-ই যে বিশ্বাস করে-আল্লাহ্‌ তা’আলা সত্য এবং মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর সৃষ্টির মাঝে শাফী বা ‘মধ্যবর্তী যোজক’ এবং আকাশের নীচে তাঁর সমপর্যায়ের অন্য কোন রসূল নাই এবং পবিত্র কুরআনের সমমর্যাদায় অন্য কোন ধর্মগ্রন্থও নাই। অন্য কারো জন্যে আল্লাহ্‌ তা’আলা চিরস্থায়ী জীবন দানের ইচ্ছা করেন নি, কিন্তু তাঁর মনোনীত এই নবী চিরকালের তরে জীবন।” (কিশ্‌তিয়ে নূহ্‌, পৃঃ ১৩)

আঁ-হযরত (সাঃ)-এর চিরস্থায়ী জীবন প্রাপ্তির একটি শক্তিশালী প্রমাণ হচ্ছে এই যে, তাঁর মাধ্যমে জারীকৃত স্থায়ী কল্যাণ চির প্রবহমান। যে ব্যক্তি এ যুগেও আঁ-হযরত (সাঃ)-এর অনুসরণ করে সে নিঃসন্দেহে কবর (আধ্যাত্মিক মৃত্যূ) থেকে উদ্ধার লাভ করে এবং তাঁকে এক আধ্যাত্মিক জীবন প্রদান করা হয়।” (আয়নায়ে কামালতে ইসলাম, পৃঃ ২২১)

“আরবের মরুভূমিতে যে অত্যাশ্চর্জ ঘটনা ঘটেছিল - অল্প কিছুদিনের মধ্যে লাখ লাখ মৃত মানুষ জীবন লাভ করলো, এবং বংশ পরম্পরায় যারা বিকৃত ছিল তারা আল্লাহ্‌র রং ধারণ করলো, অন্ধরা দৃষ্টি শক্তি লাভ করলো, বোবাদের মুখে খোদার মা’রেফত ও তত্বের কথা প্রকাশিত হলো, হঠাৎ এমন এক বিপ্লব সংঘটিত হলো, যা ইতোপূর্বে কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শুনেনি। তোমরা কি জানো, তা আসলে কি ছিল? তা ছিল আল্লাহ্‌র সত্ত্বায় বিলীন এক ব্যক্তির (সাঃ) অন্ধকার রাতের দোয়া, যা পৃথি���ীতে এক তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়েছিল আর এমন সব ঘটনা ঘটিয়েছিল যা সেই নিরক্ষর নিঃসহায় ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হতো।

اللھم صل و سلم و بارک علیہ و الہ بعدد ھمہ وغمہ و حزنہ لھذہ الامۃو انزل علیہ انوار رحمتک الی الابد۔

(বারকাতুদ্দোয়া, পৃঃ ১০-১১)

“সেই ব্যক্তি যিনি সবচেয়ে সম্পূর্ণ এবং পূর্ণ মানব ছিলেন এবং পূর্ণ নবী ছিলেন এবং যিনি পূর্ণ কল্যাণরাজি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যাঁর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পুনরুত্থান ও একত্রীকরণের কারণে পৃথিবীর প্রথম কিয়ামত (পুনরুত্থান) সংঘটিত হয়, যাঁর আগমনে এক মৃত জগৎ জীবন ফিরে পায় সেই মোবারক নবী হলেন হযরত খাতামুল আম্বিয়া, ইমামুল আসফিয়া, খাতামুল মুরসালীন, নবীগণের গৌরব হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) । হে প্রিয় খোদা! এই প্রিয় নবীর উপর এমন দরূদ ও রহমত বর্ষণ করো যেমনটি দুনিইয়ার সৃষ্টি অব্দি তুমি কারো প্রতি নাযেল করোনি। এই অসীম মর্যাদাবান নবী পৃথিবীতে আবির্ভূত না হলে ছোট ছোট যত নবী দুনিয়ায় এসেছেন, যেমন-ইউনুস, আইউব, মসীহ্‌ ইবনে মরিয়ম, মালাকি, ইয়াহ্‌ইয়া, যাকারিয়া প্রমূখ তাঁদের সত্যতার কোন প্রমাণ আমাদের কাছে থাকতো না, যদিও তাঁরা সকলেই নৈকট্যপ্রাপ্ত, সম্মানিত এবং খোদা তা’লার প্রিয়ভাজন ছিলেন। এ কেবল ঐ নবীরই (সাঃ) অনুগ্রহ বিশেষ যে, এই নবীগণও পৃথিবীতে সত্যবাদী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। হে আল্লাহ্‌! তাঁর (সাঃ) উপর, তাঁর বংশধরগণের, তাঁর সাহাবীগণের সবার উপর তুমি দরূদ, রহমত ও বরকত নাযেল কর।” (ইতমামুল হুজ্জত, পৃঃ ২৮)

“যেহেতু আঁ-হযরত (সাঃ) আন্তরিক পবিত্রতা, হৃদয়ের প্রশস্ততা, সততা, নম্রতা, দৃঢ়তা, নিষ্কলুষতা, খোদা ভরসা, নিষ্ঠা, খোদা-প্রেমের সব দিক দিয়ে সব নবীর চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন এবং সবার তুলনায় শ্রেষ্ঠ, উচ্চ, সম্পূর্ণ সম্মাণিত, অধিক জ্যোতির্ময় ও অধিক নিষ্কলুষ বা মাসুম ছিলেন তাই আল্লাহ্‌ জাল্লাশানহু বিশেষ বৈশিষ্টাবলীর আতর দিয়ে তাঁকে সবচেয়ে বেশী সুরভিত করেছেন এবং সেই বক্ষ, যা সব পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীর তুলনায় অধিক প্রশস্থ, পবিত্রতর, বেশী জ্যোতির্ময় ও অধিক প্রেমিক ছিল তা এমন ওহী লাভ করার যোগ্য হলো যা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, পূর্ণতর, অধিক উচ্চমানের ও সম্পূর্ণ এবং তা খোদার গুণাবলীর জন্য অতি পরিস্কার ও বিস্তৃত দর্পণস্বরূপ।” (সুরমা চশমায়ে আরিয়া, পৃঃ ২৩-২৪)

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক এবং দরূদ ও সালাম সেই নবী সর্দারের প্রতি যিনি তাঁর মনোনীতদের মাঝে সবচে’ সম্মানিত, তাঁর সকল সৃষ্ট জীবের মধ্যে প্রিয় এবং যিনি খাতামুল আম্বিয়া ও আওলিয়াদের গৌরব। আমাদের নেতা, আমাদের ইমাম, আমাদের নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) পৃথিবীর বাসিন্দাদের হৃদয় আলোকিত করার জন্য সূর্যস্বরূপ। সালাম ও দরূদ তাঁর বংশধরগণের প্রতি, তাঁর সাহাবীগণের প্রতি এবং প্রত্যেক এমন মুত্তাকী মু’মেনের প্রতি যে আল্লাহ্‌র রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে। একইভাবে, খোদার সব নেক বান্দাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক।” (নূরুল হক, ১ম খন্ড, পৃঃ ১)

“কুল্লু বারাকাতিম মিন মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম।” (সমস্ত আশিস ও কল্যাণ মুহাম্মদ (সাঃ) থেকেই) {ইলহামঃ মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)}

“খোদার পরে আমি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রেমে বিভোর; এটাই যদি কুফরী হয় তাহলে খোদার কসম, আমি শক্ত কাফের।” (মসীহ্‌ মওউদ (আঃ))

“আহ্‌মদ (সাঃ)-এর মহিমা ও মর্যাদা চিন্তা ও কল্পনার অতীত, তাঁর এক গোলামকেই দেখ, সে যমানার মসীহ্‌ হয়েছে।” {ইলহামঃ মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)}

সত্য নির্ধারণের সন্দেহাতীত পন্থাঃ

খোদা তা’আলার সহিত সম্বন্ধ স্থাপনের উপর ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বলেছেন, “আমার দাবী মানবার স্বপক্ষে খোদা তা’আলা বহু প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু আমি তোমাকে একথা বলিনা যে, তুমি কেবল ঐগুলো চিন্তা করে দেখ এবং বুঝতে চেষ্টা কর। যদি প্রমাণসমূহ চিন্তা করে দেখবার ও বুঝবার সুযোগ না পাও, কিম্বা এর প্রয়োজনবোধ না কর অথবা যদি মনে কর তোমার বিবেক এর সঠিক মিমাংসা করতে ভুল করতে পারে, তবে তোমার মনোযোগ আর এক দিকে আকর্ষণ করছি। তুমি খোদার কাছে আমার বিষয়ে দোয়া কর এবং খোদা তা’আলার কাছে সঠিক নির্দেশ প্রার্থী হও এবং বল, ‘হে খোদা! এই ব্যক্তি যদি সত্যবাদী হন, তবে আমাকে সত্য পথ দেখাও কিন্তু যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে আমাকে তার কাছ থেকে দূরে রাখ।’ তিনি বলেছেন, যদি কেউ সত্য মন নিয়ে এবং বিদ্বেষমুক্ত হয়ে খোদার কাছে এভাবে কিছু দিন দোয়া করে, তবে নিশ্চয় তার জন্য হেদায়াতের দ্বার উম্মুক্ত হবে এবং আমার সত্যতা তার কাছে দেদীপ্যমান হয়ে উঠবে। সহস্র মানুষ এ পন্থা অবলম্বন করে খোদার কাছ থেকে আলোক প্রাপ্ত হয়েছেন। এটি কত জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। মানুষ নিজে বুঝতে ভুল করতে পারে, কিন্তু খোদা তা’লা কখনও স্বীয় পথ প্রদর্শনে ভুল করতে পারেন না। নিজের সত্যতার প্রতি কত অটল বিশ্বাস সেই ব্যক্তির, যিনি নিজের দাবীর সত্যতা যাচাই করবার জন্য লোকের সামনে এরূপ ঐশী পন্থা পেশ করেন!

কোন মিথ্যাবাদী কি একথা বলতে সাহস করতে পারে যে, যাও স্বয়ং খোদার কাছে গিয়ে আমার সত্যতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস কর? কোন মিথ্যাবাদী কি এটি কল্পনা করতে পারে যে, মীমাংসার এরূপ পন্থা তার পক্ষে শুভ হবে? যে ব্যক্তি খোদা তা’আলার প্রেরিত না হয়ে মীমাংসার এ পন্থা মেনে নেয় সে প্রকৃতপক্ষে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ডিক্রি দেয় এবং নিজের পায়ে নিজে কুঠারাঘাত করে। কিন্তু হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) সর্বদা বিশ্বের কাছে প্রকাশ করেছেনঃ

“আমার কাছে হাজার হাজার প্রমাণ আছে, কিন্তু এতে যদি তোমরা সন্তুষ্ট হতে না পার, তবে আমার কথা গ্রহণ করো না, আমার বিরোধীদের কথাও গ্রহণ করো না; খোদা তা’আলার কাছে যাও এবং জিজ্ঞাসা কর যে, আমি সত্যবাদী কিনা। যদি খোদা তা’আলা বলে দেন যে, আমি মিথ্যাবাদী, তবে নিশ্চয় আমি মিথ্যাবাদী। কিন্তু যদি খোদা তা’আলা বলে দেন যে, আমি সত্যবাদী তবে আমার সত্যতা গ্রহণ করেত তোমার আপত্তি কেন?”

হে আমার প্রিয়গণ! মীমাংসার জন্য এটি কেমন সরল, সহজ ও সত্য পথ। হাজার হাজার মানুষ এই উপায়ে উপকৃত হয়েছে এবং এখনও যারা উক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে চায় তারা উপকৃত হতে পারে।

মীমাংসার এই পদ্ধতির মধ্যে প্রকৃতপক্ষে হিকমত ছিল যে, তিনি পার্থিবতার উপর ধর্মকে প্রবল জানতেন। তিনি বলতেন, জড়বস্তু দেখবার জন্য খোদা তা’আলা আমাদেরকে চক্ষু দিয়েছেন, জড় বিষয় বুঝবার জন্য বুদ্ধি দিয়েছেন। জড় পদার্থকে দৃশ্যমান করবার জন্য সূর্য এবং অসংখ্য তারকারাজি সৃষ্টি করেছেন। অতএব কিভাবে এটি সম্ভব যে, আধ্যাত্মিক হেদায়াতের জন্য তিনি কোন ব্যবস্থা করবেন না? নিশ্চয়, যে কোন সময় যে কোন ব্যক্তি তাঁর কাছে আধ্যাত্মিক বস্তু দেখবার আকাঙ্খা প্রকাশ করলে, তিনি তার জন্য এর দরজা উম্মুক্ত করে দেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ-

وَٱلَّذِينَ جَـٰهَدُواْ فِينَا لَنَہۡدِيَنَّہُمۡ سُبُلَنَا‌ۚ

অর্থাৎ, যে কেউ আমাদের সাথে মিলিত হবার বাসনা নিয়ে পরিশ্রম সহকারে কাজ করে, আমরা নিশ্চয় তাদেরকে পথ প্রদর্শন করি। (সূরা আনকবুতঃ ৭০)

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে

উপরে চলুন