In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

কল্যাণময় কুরআনের সীমাহীন সমুদ্রে আমৃত্যু অবগাহনকারী এক মহান ব্যক্তিত্ব নূরুদ্দীন (রাঃ)

আব্দুল্লাহ্‌ শামস্‌ বিন তারিক

হযরত হেকীম নূরুদ্দীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আওওয়াল (রাঃ)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে চারটি ভালবাসা অত্যন্ত প্রবল আকারে সামনে আসে, এগুলো হলোঃ

এর কোন একটি নামের উচ্চারণেই তাঁর হৃদয় অনন্য এক আবেগে উদ্বেলিত হত এবং তাঁর মুখমন্ডলে এর উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হত। তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম ও চিকিৎসক হিসেবে দুনিয়াবী সম্মান ও অর্থ সম্পদ তাঁর পিছু ধাওয়া করা সত্ত্বেও আজীবন তাঁর মূল পরিচয় ছিল এক অসাধারণ বিনয়ী সেবকের, যিনি আল্লাহ্‌র রসূল-কুরআন ও যুগ সংস্কারক মসীহের চরণে সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন।

কুরআনের সেবায় খলীফা আওওয়াল (রাঃ)-এর অসামান্য প্রেরণার উৎস অনুধাবন করার জন্য এর পটভূমি জানা প্রয়োজন। পবিত্র কুরআনের প্রতি ভালবাসা ও এর সেবা তাঁর পিতা-মাতারও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁর পিতা হযরত হাফেয গোলাম রসূল স্বয়ং হাফেয তো ছিলেনই, উপরন্তু তাঁর আরো একটি বিশেষ শখ ছিল বহুল সংখ্যায় কুরআনের কপি সংগ্রহ করে তা বিনা মূল্যে বিতরণ করা। সে যুগে কুরআনের কপি সহজ প্রাপ্য ছিল না এবং কখনো কখনো তিনি সুদূর মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) থেকে এগুলো সংগ্রহ করতেন। একবার তৎকালীন ৩০,০০০/ (ত্রিশ হাজার) রূপী দিয়ে তিনি একশত কপি কুরআন ক্রয় করেন।

আবার হুযূর (রাঃ)-এর বড় বোনের বিয়ের সময় “সবচেয়ে বড় উপহার” হিসেবে তাঁর পিতা রেশমী কাপড়ে বর্ণাক্ষরে লেখা এক কপি কু্‌রআন প্রস্তুত করেছিলেন। কেবল কাতেব (অনুলিখনকারী)-কে মজুরীস্বরূপ তিনি একশত রূপী প্রদান করেছিলেন। ১৯১২ সনের ২৮শে মার্চের বদর পত্রিকায় প্রকাশিত বংশ তালিকায় দেখা যায় যে, হযরত উমর (রাঃ)-এর বংশোদ্ভুত এ মহাপুরুষের কেবল পিতাই নন, বরং পূর্ববর্তী অন্তত দশ প্রজন্ম হাফিয ছিলেন। বংশ তালিকার অংশ বিশেষ নিম্নে দেয়া হলঃ

উল্লেখ্য যে হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ) স্বয়ং হাফিয ছিলেন এবং তিনি ১৮৮১ সালে হিফ্‌য পূর্ণ করেন। সুতরাং পিতার দিক থেকে তাঁর রক্তে কুরআনের ভালবাসা ও সেবার স্পৃহা বহমান ছিল। কিন্তু এটিই সম্পূর্ণ চিত্র নয় বরং কুরআনের সাথে তাঁকে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত করেছিলেন তাঁর মা হযরত নূর বখ্‌ত সাহেবা। তিনি তাঁর এলাকার শিশুদের কুরআন শেখাতেন। হুযূর (রাঃ)ও মূলতঃ তাঁর মার কাছেই কুরআন শেখেন। যদিও তাঁর পিতাও কিছু শিখিয়েছিলেন। হুযূর (রাঃ) পরবর্তীত জীবনে বর্ণনা করেন, মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তিনি তাঁর মায়ের কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পেতেন এবং মাতৃদুগ্ধের সাথে কুরআনের ভালবাসা তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল। উল্লেখ্য যে তাঁর মাতা দুগ্ধদান করার পূর্বে ওযু করে নিতেন এবং কুরআন এবং দরূদ পাঠ করে শুনাতেন।

১৬ বছর বয়সে কোলকাতা থেকে আগত এক বই বিক্রেতা তাঁকে কুরআনের অনুবাদ শেখার তাগিদ দেন এবং পাঁচটি বড় সূরার উর্দু অনুবাদ তাঁকে উপহার দেন। এর পর পরই মুম্বাই থেকে আগত আর এক বণিক তাঁকে তাকবিয়াতুল ঈমান ও মাশারেকুল আনওয়ার নামের দু’টো বই পড়ার পরামর্শ দেন যেগুলো মূলতঃ কুরআনের অংশবিশেষের ব্যাখ্যাস্বরূপ ছিল। এসব মিলিয়ে কুরআনের প্রতি নিবেদিত প্রাণ হয়ে তিনি যৌবনে পদার্পন করেন।

শিক্ষার উদ্দেশ্যে এক শহর থেকে আরেক শহর, এক শিক্ষক থেকে আরেক শিক্ষক, এমনকি শেষ পর্যন্ত মক্কা-মদীনায় ১৮৬৬ থেকে ১৮৭১ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর কাটানো এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষকের সাথে তার বৈচিত্রপূর্ণ ঘটনাসমূহ বর্ণনার সুযোগ এ প্রবন্ধে নেই।

মক্কা মদীনা থেকে ফিরে এসে চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলে এক পর্যায়ে তিনি জম্মু রাজ্যের রাজ-চিকিৎসক নিযুক্ত হন। সেখানেও চিকিৎসা তার পেশা হলেও নেশা কুরআনের সেবাই ছিল । নিজ অর্থ ব্যয় করে সর্বদা তিনি চেষ্টা করতেন যেন কুরআনের শিক্ষা বিস্তার লাভ করে এবং বিশেষতঃ যুব সমাজ এর (অর্থাৎ কুরআনের) সাথে একাত্ম হয়। তাঁর কুরআনের দরস এত আকর্ষণীয় ছিল যে অনেক সময় হিন্দু পন্ডিতগণও মুগ্ধ হয়ে তার আসরে বসে থাকতেন। তাঁর (রাঃ) আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মিরকাতুল ইয়াকীন’-এ হুযূর (রাঃ) স্বয়ং লেখেনঃ

“অনেক সময় আমার সুযোগ হত সভাসদদের কতকের সঙ্গে বসার, যাদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু। অতঃপর সেখানে পবিত্র কুরআনের সৌন্দর্য সম্পর্কে আলোচনা করতাম। তাঁদের মধ্যে এক হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেন রতি রাম। তিনি রাজ্যের কোষাধ্যক্ষের পুত্র ছিলেন এবং নিজেও রাজস্ব কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি প্রকাশ্য মজলিসে ঘোষণা করেন, “কেউ কি হেকীম সাহেবেকে পবিত্র কুরআন শেখানো থেকে বিরত করবে, নাকি আমি ইসলাম গ্রহণ করবো?” তিনি আরো বলেন, “পবিত্র কুরআন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক কিতাব আরো আকর্ষণীয় হলো হেকীম সাহেবের শেখানোর পদ্ধতি।”

হযূর (রাঃ) সে যুগে কুরআনের খেদমতের জন্য বিশেষ পারদর্শী আলেমদের এক দল তৈরী করতে চেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি লেখেন,

“আমি ১২ জনের একটি দলকে প্রশিক্ষিত করার জন্য অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছি, যাদের প্রত্যেককে মাসিক ৫০ রূপী বৃত্তি দেয়া হবে যেন তারা তাদের খরচাদি পূরণ করতে পারেন এবং শিক্ষক ও পরামর্শকের কাজ করতে পারেন�� পরিকল্পনা অনুসারে .... তাদেরকে আরবী, লাতিন, সংস্কৃত ও ইংরেজী শেখার ভার দেয়া হবে। এটি কাম্য হবে যে প্রত্যেকেই ইংরেজী ও আরবী এ দুই ভাষাতেই পারদর্শী হবে। তাদেরকে আরবী ও আরবী অভিধান শেখানো হবে, প্রথমে চিরিয়াকোট-এ এবং কোলকাতায় এবং দুই বছরান্তে তারা আরবী ভাষার উপর ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন আলেম হিসেবে প্রত্যাবর্তন করবেন। দুইজনকে আলীগড়ে পাঠানো হয় এবং আলীগড়ের স্যার সৈয়্যদ আহমদ খান সাহেবের পরামর্শে তাদের ৩০ রূপী করে মাসিক বৃত্তি দেয়া হয়।” [আল হাকাম, মার্চ, ২৪, ১৯০১ এর প্রকাশিত প্রবন্ধে উদ্ধৃত]

যদিও তাঁর এ পরিকল্পনা সফল হয়নি, অর্থাৎ শিক্ষা লাভের পর এ ছাত্রগণ ধর্মের ও কুরআনের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেনি, তবুও হুযূর (রাঃ)-এর এ প্রেরণা শত সহস্র ব্যক্তিকে কুরআন শিখায উদ্বুদ্ধ করেছে। আরো বর্ণনায় আছে,

“রাজা অমর সিং, যিনি জম্মুর মহারাজার ভাই ছিলেন, তাঁর কাছে পবিত্র কুরআন শেখেন, এবং তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। মহারাজা স্বয়ং পবিত্র কুরআনের প্রায় অর্ধাংশের অনুবাদ তাঁর কাছে শেখেন।” [মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ্‌ খান রচিত হযরত মৌলভী নুরুদ্দীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আওওয়াল]

১৮৮১ সালে হুযূর (রাঃ) এক রাজপুত্রের বিয়েতে যাত্রার সময় আহত হন এবং তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় পালকীতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। এতটাই আহত ছিলেন যে তাঁকে ধরে পালকীতে উঠাতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে এক মাসের সফর ছিল। পালকিতে শুয়ে শুয়ে এ সফরেই তিনি কুরআনের চৌদ্দ পারা হিফ্‌য করেন। সফরান্তে বাকী অংশ হিফ্‌য করে ‘হাফিয-এ-কুরআন’ হওয়ার বংশগত ঐতিহ্য তিনি রক্ষা করেন।

হুযূর (রাঃ)-একবার পবিত্র কুরআনের একটি উর্দু অনুবাদ সম্পন্ন করেন। কিন্তু মুদ্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত কমিটির গাফিলতিতে তা প্রকাশিত হয়নি। ১৯০৭ সালে কেবল একটি সূরার অনুবাদ ব্যক্তিগতভাবে এক আহ্‌মদী প্রকাশ করেন।

পবিত্র কুরআনের গূঢ়তত্ত্ব অনুধাবনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ১৯০৮ সালের ৩০শে মার্চ আল হাকাম পত্রিকায় এক অভিনব পদ্ধতি বর্ণনা করেন। সংক্ষেপে পদ্ধতিটি এই যে, প্রথম পাঠের সময় একাকী পাঠ করা উচিত, গভীরভাবে এর অর্থের উপর চিন্তা করা উচিত। আর পাঠের পূর্বে ও পরে বার বার দরূদ ইস্তেগফার ও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহরাজি কামনা করা উচিত। আর সেই সাথে যে অংশগুলো বুঝতে কষ্ট হয় সেগুলোর নোট রাখা উচিত। দ্বিতীয় নিজ স্ত্রীকে নিয়ে পাঠ করা উচিত আর মনে করা উচিত যে তখনই কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছে। নোট করা কিছু কিছু সমস্যা এসময় দূর হবে। আরো কোন আয়াত কঠিন মনে হলে তার নোট করা উচিত। এমনিভাবে এরপর পরিবার পরিজন প্রতিবেশী, এরপর মুসলমানদের জমায়েতে এবং সবশেষে অমুসলিমদের নিয়ে পাঠ করলে ক্রমাগত কঠিন বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে। বাকীগুলোর জন্য দোয়াতে আল্লাহ্‌র সাহায্য চাইতে হবে।

তাঁর জীবন এতটাই কুরআন কেন্দ্রীক ছিল যে, হযরত মসীহ মাওউদ (আঃ)-এর মৃত্যুর পর দিল্লীর কার্জন গেজেট পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সম্পাদক মির্যা হযরত দেহলবী অবজ্ঞা করে লিখেনঃ

“এখন মির্যা গোলাম আহমদের মৃত্যুর পর মির্যায়ীদের কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। এ জামাআত তাদের ইমামকে হারিয়েছে; আর যিনি তাদের নেতা হয়েছেন তিনি কুরআন ছাড়া কিছুই জানেন না। মসজিদে কুরআন পাঠ ও এর উপর তিনি কেবল বক্তৃতা করতে থাকবেন।”

হুযূর (রাঃ) মন্তব্য করেন,

“আল্লাহ্‌ তাআলা আমাকে তৌফিক দিন যেন তাদের কুরআন শেখাতে পারি এমনভাবে যেন তারা একে অনুধাবন করতে পারে।”

আরেকটি ঐতিহাসিক বিষয় হল, মসীহ মাওউদ (আঃ) যখন একবার ফনোগ্রাফের ব্যবহার পরীক্ষা করেন তখন হযরত নূরদ্দীন (রাঃ) কর্তৃক সূরা আসরের সংক্ষিপ্ত তফসীর রেকর্ড করা হয়।

কুরআনের ইংরেজী অনুবাদের প্রয়োজন দেখা দিলে খলীফা আওওয়াল (রাঃ) ১৯০৯ সালে মৌলভী মোহাম্মদ আলীকে রিভিউ অব রিলিজিয়নস এর সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে কুরআনের ইংরেজী অনুবাদে নিয়োজিত করেন। প্রত্যহ তিনি টুকরো টুকরো অংশ উর্দু অনুবাদ করতেন আর মৌলভী মোহাম্মদ আলী তাঁর তত্ত্বাবধানে একে ইংরেজী করতেন। শেষ অসুস্থ্যতার সময় চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তিনি এ কাজ চালিয়ে যান এবং বলেন, কুরআন অনুবাদের কাজ নুরুদ্দীনের আধ্যাত্মিক খোরাক এবং তাঁর পক্ষে থামা সম্ভব নয়। এ কাজ তাঁর (রাঃ) মৃত্যুর ৩ দিন আগে শেষ হয়। পরবর্তীতে মৌঃ মোহাম্মদ আলী অনুবাদকৃত পুরো পান্ডুলিপি নিয়ে জামাআত ছেড়ে চলে যান আর কিছু মনগড়া সংশোধনীসহ অনুবাদটি প্রকাশ করেন। এটি “মোহাম্মদ আলীর অনুবাদ” বলে পরিচিত। এতে খলীফা আউয়াল (রাঃ)-এর দীর্ঘ দিনের অবদান রয়েছে যা তিনি অস্বীকার করেন।

হুযূর (রাঃ)-এর দরসসমূহের নোটের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রায় সাতশত পৃষ্ঠার ‘দরস-এ-কুরআন’, ‘সূরা জুমুআর তফসীর’ ‘নূরুদ্দীন’ নামক বই ‘রদ-ই-নকশে কুরআন’ নামক পত্র সংকলন কুরআনের সেবায় তাঁর রচনার আরো কতগুলো উদাহরণ।

কুরআনের ব্যাখ্যায় দিবারাত্র ব্যয় করলেও তিনি নিজে কোন পূর্ণাঙ্গ তফসীর রচনা করেন নি। এর কারণ সম্পর্কে তিনি লেখেনঃ

“পবিত্র কুরআন আল্লাহ্‌র কালাম। আল্লাহ্‌ তাআলা অসীম, তেমনি তাঁর কালাম। সুতরাং কতকগুলো ধারণার মধ্যে এর ব্যাখ্যাকে সীমাবদ্ধ করতে পারি না।.....পবিত্র কুরআন আল্লাহ্‌র কালাম। আল্লাহ্‌ নিজে এর তফসীর প্রদান করতে পারতেন, কিন্তু আল্লাহ্‌ তা করেন নি। রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-ও করেননি। তাঁর খলীফাগণ ও তাঁর পর এরূপ করতে পারতেন-কিন্তু তারাও করেননি। ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের চার ইমাম আবু হানিফা, মালিকী শাফী ও আহমদ বিন হাম্বলের কেউই তফসীর লেখেন নি.........হাদীস সংকলকদের ইমাম বুখারী, ইমাম তিরিমিযী বা ইমাম আবু দাউদ অনেক বড় বুযুর্গ ছিলেন, কিন্তু তাদেরও কেউই কোন তফসীর রচনা করেন নি। সূফীদের মধ্যে মুঈন উদ্দীন চিশ্‌তি, শাহ নাকশ্‌বন্দ, সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী এবং অন্যান্য মহাপুরুষও অনেক গুপ্ত ও প্রকাশ্য নিদর্শন লাভ করেন, কিন্তু তাঁরাও কোন তফসীর রচনা করেননি। শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী একটি তফসীর লিখেন, কিন্তু তাও মৌলিক কিছু নয়।

মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ) যাকে কুরআনের সেবায় প্রত্যাদিষ্ট করা হয়েছে, তিনি পবিত্র কুরআনের কোন তরজমা বা তফসীর রচনা করেন নি। (এটা সত্য যে,) লোকেরা প্রকাশিত বিভিন্ন তরজমা ও তফসীর থেকে কিছু কল্যাণ লাভ করেছে, সাধারণত প্রত্যেক মানুষের জন্য এ ঝুঁকি থেকে যায় যে তারা কোন একটি তফসীরকেই শেষ কথা মনে করে নিতে পারে এবং এর উপর ভরসা করে নিজেরা (কুরআন নিয়ে) চিন্তা করা বন্ধ করে দিতে পারে; এরূপ হলে তা হবে বড় ক্ষতির কারণ।

আমি একটি তফসীর রচনা করেছিলাম এবং আমার বন্ধুগণ এটি প্রকাশের জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। এরপর আমি ভেবে দেখলাম আমার পর যারা আসবেন তারা হয়ত একেই শেষ কথা মনে করবে এবং এভাবে কুরআনের রত্ন ভান্ডার ও তত্ত্বজ্ঞানের দ্বার নিজেদের জন্য বন্ধ করে দিবে। এটি খোদার কালাম, এটি সর্ব যুগের সমস্যাবলীর সমাধান প্রদান করে এবং সর্ব অবস্থার আত্মার ব্যাধিসমূহের আরোগ্য বিধান করে। এর কল্যাণকে সীমিত করা উচিত নয়। তাই সীমাহীন সমুদ্রকে কলমের মধ্যে ধারণ করার প্রয়াস পরিত্যাগ করলাম।”

তিনি (রাঃ) নিজ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কুরআনের সেবা করে গেছেন। ইংরেজী অনুবাদের কাজের কথা পূর্বেই লিখেছি। অনুরূপভাবে অত্যন্ত অসুস্থ্য অবস্থায় মির্যা বশীর আহমদ (রাঃ) এর কুরআন পাঠের কাজ তিনি শেষ করেন। ১৯০৮ সালের রমযানে ইতেকাফের মধ্যে দশদিনে পুরো কুরআনের দরস তিনি প্রদান করেন। মুমূর্ষু না হলেও তখন তিনি বৃদ্ধ। রোযা রেখে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন পারার দরস দেয়া মোটেই সাধারণ বিষয় নয়। তাঁর এর���প নিষ্ঠা আমৃত্যু অক্ষুন্ন ছিল। অন্তিম শয্যায় (মৃত্যুর দশ দিন পূর্বে) ৪ মার্চ ১৯১৪ হুযূর (রাঃ) একটি সংক্ষিপ্ত ওসীয়্যত করেন। এর শেষ বাক্য ছিল,

“কুরআন ও ��াদীসের দরস যেন চলতে থাকে।”

তাঁর তিরোধানে ভারতবর্ষের নামকরা সব পত্রিকা ও বড় বড় উলামা শোক বিবৃতি প্রকাশ করে যার কয়েকটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলঃ

সাবেক কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আল-হিলাল’ পত্রিকায় লেখেনঃ

“হযরত হেকীম মাওলানা নূরুদ্দীন ভেরবী ও কাদিয়ানী অসাধারণ আলেম ও সাধু পুরুষ ছিলেন যার সমগ্র জীবন পবিত্র কুরআন শেখানোর জন্য নিবেদিত ছিল এবং পবিত্র কুরআনের যে জ্ঞান তাঁর ছিল তা ছিল সীমাহীন।”

লাহোর থেকে প্রকাশিত ‘মিউনিসিপাল গেজেট’ লিখে,

“ভারতবর্ষের মুসলমানদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক অসামান্য সাধুপুরুষ, এবং আল্লাহ্‌র কালামের গভীর প্রেমে তিনি বিভোর ছিলেন, আর তাঁর এ ভালবাসার তুলনা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর।”

হুযূর (রাঃ) স্বয়ং লেখেনঃ

“পবিত্র কুরআনের প্রতি আমার ভালবাসা এক কথায় সীমাহীন; এর কোন সীমানা নাই। এর শব্দাবলীতে আমার প্রাণপ্রিয় (খোদা)-র দর্শন আমি লাভ করি। আমার মুখে কুরআনের আয়াতসমূহের এক প্রস্রবণ বহমান, আর পবিত্র কুরআনের এক বাগিচা আমি আমার সত্তায় ধারণ করি।

পবিত্র কুরআন আমার খাদ্য এবং কেবলমাত্র এর গঠনেই আমি পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করি। যদি না এর পাঠকে আমি বারংবার পুনরাবৃত্তি করি, আমার তৃষ্ণা ও আমার সাধ অপূর্ণ থাকে। আমার বিশ্বাস যে পবিত্র কুরআনের একটি রুকু একটি রাজত্বের চেয়ে শ্রেয়”।

পরিশেষে তিনি যাকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জানতেন, সেই মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ) এর সাক্ষ্য দিয়ে শেষ করছিঃ

“পবিত্র কুরআনের যে ভালবাসা, নিবেদন ও আবেগ হেকীম নূরুদ্দীনের মধ্যে তার তুলনা আমি দেখি না। তিনি প্রকৃতই কুরআনের প্রেমিক, আর এর আয়াতসমূহের জ্যোতিতে প্রায়শঃই তাঁর চেহারা আলোকিত হয়ে উঠে। এটি তার অন্তরে এক অনন্য রূহানী সুখানূভূতিকে জাগ্রত করে এবং এই প্রেমপূর্ণ হৃদয় থেকে পবিত্র কুরআনের সত্যতা ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে তিনি যা বর্ণনা করেন, অন্য কারো পক্ষে তা সম্ভবপর নয়।”

তথ্য সূত্রঃ

পাক্ষিক আহ্‌মদী - ৩১শে মে, ২০০৮ইং

উপরে চলুন