In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

মাওলানা হাজী হেকীম নূরুদ্দীন (রাঃ): এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম

মাওলানা আব্দুল আউয়াল খান চৌধুরী, ওয়াকেফে যিন্দেগী

মহানবী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী নবুওতের পদাঙ্ক অনুসরণে শেষ যুগে যে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এরই শতবার্ষিকী পূর্তী এ বছর আমরা উদ্‌যাপন করছি। প্রতিশ্রুত এই ঐশী খিলাফত শেষ যুগের প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী (আঃ)-এর তিরোধানের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐশী নেতৃত্বের ক্রমধারায় প্রথম যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী (আঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তিনি কে ছিলেন আর কেমন ছিলেন এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। তাই এই প্রবন্ধে সংক্ষিপ্ত পরিসরে হযরত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রাঃ)-এর বৃত্তান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

হযরত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রাঃ)-এর নাম ছিল নূরুদ্দীন। তাঁর আত্মিক জ্যোতির যথার্থ ও সার্থক পরিচায়ক ছিল তাঁর নাম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্য তাঁর জীবনের এটিই সারসংক্ষেপ। তিনি সত্যিই ধর্মের এক জ্যোতি ছিলেন। ১৮৪১ সালে পাঞ্জাবের পশ্চিমাংশের একটি গ্রাম ‘ভেরা’-য় তাঁর জন্ম হয়। পিতা ছিলেন হযরত হাফেয গোলাম রসূল সাহেব আর মাতা ছিলেন ‘নূর বখত’ বেগম। পিতা-মাতা উভয়ই ছিলেন ধার্মিক, খোদাভীরু আর কুরআন প্রেমিক। বাড়ীতে কেবল কুরআন পড়ার পরিবেশই নয়, কুরআন চর্চারও পরিবেশ ছিল। তাই শৈশবকালে মৌলিক কুরআন শিক্ষা ও ধর্মীয় জ্ঞান তাঁর বিদুষী মা নূর বখত বেগমের কাছেই তিনি লাভ করেন। তাঁর মা অসাধারণ কুরআন অনুরাগী ছিলেন। ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি অন্যান্য শিশুদেরকে কুরআন পড়ানোর কাজটি আরম্ভ করেছিলেন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি এ কাজই করে গেছেন। এই বিদুষী মহিলা হাজারের অধিক সংখ্যায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কুরআন শরীফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। হযরত হাফেয গোলাম রসূল সাহেব ধনী ছিলেন। তিনি সংসারের দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন ও সন্তানদেরকে সুন্দরভাবে দেখাশুনা করার পাশাপাশি কুরআন শরীফের সেবকও ছিলেন। সে যুগে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন গ্রামে ও জনপদে কুরআন শরীফ উপহার স্বরূপ বিতরণ করতেন। মোট সাত ভাই ও দুই বোনের মাঝে নূরুদ্দীন (রাঃ) ছিলেন ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। খেলাধুলার প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ ছিল না। তবে ঘোড়া দৌড়ানো ও সাতার কাটা এই দুটো কাজে তিনি অল্প বয়সেই পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। সে যুগে প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশুনার জন্য মকতব মাদ্রাসা থাকলেও উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তখন গৃহশিক্ষক রেখে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণ করা হতো অথবা উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য দূর-দূরান্তে কোন শিক্ষকের কাছে থেকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করতে হতো। তদনুযায়ী যুবক নূরুদ্দীন (রাঃ)-কে অনেক কষ্ট স্বীকার করে দূর-দূরান্তে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হয়েছে। জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি কখনো লাহোর, কখনও রাওয়ালপিন্ডিতে, কখনো লখনৌ, কখনো রামপুর এমনকি পবিত্র মক্কা ও মদীনায়ও গমন করেন এবং দীর্ঘকাল অবস্থান করে জ্ঞান অর্জন করেন। জ্ঞান অর্জন করবার পেছনে তাঁর পিতার উৎসাহ প্রদানও একটি উল্ল্যেখযোগ্য উপকরণ ছিল। একবার এমনই একটি সফরে বের হবার প্রাক্কালে তাঁর পিতা তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, জ্ঞান অর্জন করার জন্য এত দূরে চলে যাও, ‘যেন আমাদের কারও বাঁচা বা মরার সাথে তোমার কোন সম্পর্ক না থাকে’ । অর্থাৎ জ্ঞান চর্চার একাগ্রতা ও সংসারবিমুখতা নিয়ে তাঁকে জ্ঞান সমুদ্রে ডুব দিতে বলেছিলেন। খুব সম্ভব একারণেই এই অসাধারণ মেধাবী ও আধ্যাত্মিক যুবক কুরআন শরীফ, হাদীস, তফসীর, ভাষা ও সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা ও চিকিৎসা শাস্ত্র এ সমস্ত বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। জ্ঞানের জগতে বিচরণকালে যে সব শিক্ষকের সাহচর্য্য তিনি লাভ করেন তাঁরাও ছিলেন সমসাময়িক আলেম সমাজের মধ্যে স্বনামধন্য ও সর্বজনবিদিত। ছাত্র জীবনে তিনি প্রবীণ বুযূর্গ আলেম হযরত মৌলভী আব্দুল কাইয়ুম সাহেব এবং শাহ আব্দুল গনী মুহাদ্দীস দেহলভীর (মহাজির মদীনা) শিষ্যত্ব গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর কত সুদূর প্রসারী প্রভাব-বলয় ছিল যার কিঞ্চিত ধারণা স্যার সৈয়দ আহমদ সাহেবের একটি উত্তর থেকে পাওয়া যায়। একবার স্যার সৈয়দ আহমদ সাহেবকে এক প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করলেন, অজ্ঞ ব্যক্তি পড়ালেখা করে জ্ঞানী হয়ে যায়; জ্ঞানী ‘আলেম’ উন্নতি করলে ‘সুফী’তে পরিণত হয় । প্রশ্ন হলো, ‘সুফী’ যখন উন্নতি করে তখন সে কি হয়? স্যার সৈয়দ আহমদ খান সাহেব উত্তর দেন, ‘সুফী’ যখন উন্নতি করে তখন ‘নূরুদ্দীন’ হয়ে যায়। এই হলো হযরত হেকীম নূরুদ্দীন (রাঃ)-এর সমসাময়িক সমাজে তাঁর প্রভাবের কিঞ্চিত ঝলক।

দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম জনাব মওলানা ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব ‘দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস গ্রন্থে’ তার রচিত ভূমিকায় লিখেছেনঃ

“হযরত নানুতবী (রহঃ)-এর খাস শিষ্য হাজী আমীর শাহ্‌ খান খোরজুরী ছাত্রদের এক সমাবেশে (সেখানে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম) বর্ণনা করেছিলেন যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর প্রথম খলীফা হেকীম নূরুদ্দীনও প্রথমে হযরত শাহ্‌ আব্দুল গনির ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, অবশ্য পরে সে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। লেখা-পড়া শেষ করে বিদায় গ্রহণের মুহূর্তে শাহ্‌ সাহেব তাকে বলেছিলেন, “মিয়া নূরুদ্দীন! কিতাবাদী পাঠ করে শেষ করেছ, এবার কিছু আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ করতে শিখ।” উত্তরে সে বলেছিল, “হযরত! কুরআন অধ্যয়ন করেছি, হাদীস পড়েছি, এরপর আর আল্লাহ আল্লাহ্‌‌ কি?” এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, মিয়া নূরুদ্দীন! আমার হাদীসের দরস থেকে তুমি একথা অবশ্যই অনুমান করে থাকবে যে, আমি কোন বর্ণনা ভিত্তিক বিষয়কে যতটুকু সম্ভব যৌক্তিক করে পেশ করতাম। আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ করলে এসব যৌক্তিক বিষয় ইন্দ্রিয়ানুভূত হয়ে যাবে।” (দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস’ প্রণেতা সাইয়িদ মাহবুব রিযভী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক আগস্ট ২০০৩ সনে অনুদিত আকারে প্রকাশিত, পৃষ্ঠাঃ ১৫)

শিক্ষকের এই উপদেশ তিনি পুঙ্খানু পুঙ্খরূপে পালন করেছিলেন। আর তাই তিনি কুরআন ও হাদীসের প্রকৃত মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। এই মহাজ্ঞানী ধর্ম বিশারদ তাঁর জ্ঞান ও পারদর্শিতায় অহঙ্কারী না হয়ে বরং আল্লাহ্‌কে লাভ করার সঠিক পথ অন্বেষণ করতেন। তিনি গভীর আধ্যাত্মিক দৃষ্টির �����িকারী ছিলেন। তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে প্রশ্ন করার ঘটনা সাব্যস্ত করছে তিনি অন্ধ অনুকরণ ও অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন না বরং সবকিছু যাচাই বাছাই করে গ্রহণ অথবা বর্জন করতেন। আর তাই শেষ পর্যন্ত তিনি সত্য ও খাঁটি ইসলাম খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর এই মানসিকতার কারণে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ‘আহ্‌মদীয়াত’ গ্রহণ করার অনেক আগে থেকেই তাঁর বিরোধিতা ও সমালোচনা করতো। এমনকি তারা তাঁকে প্রাণে মারারও চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ্‌ পদে পদে তাঁকে অলৌকিকভাবে সাহায্য করেন এবং তাঁর সুরক্ষা করেন। বিরুদ্ধবাদীরা আড়ালে তাঁকে হিংসা ও সমালোচনা করলেও তাঁর সামনে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কটুক্তি করতে সাহস পেতো না। তারা বলতো, এর প্রতি বিদ্বেষ ও শত্র্বতা থাকলেও আমরা একে ওলীউল্লাহ্‌ হিসেবেই জানি।

এই ক্ষণজন্মা ‘ওলিউল্লাহ’ ১৮৮৫-র পূর্বেই হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর পুস্তকাদি আনিয়ে পড়েছিলেন। ১৮৮৫ সনের মার্চ মাসে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আঃ) আলেম সমাজের কাছে আহ্বান জানিয়ে যখন একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন তা পেয়ে তিনি জম্মু থেকে কাদিয়ানে ছুটে আসেন। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি শেষ যুগের প্রতিশ্রুত এই মহাপুরুষকে চিনতে পারেন এবং মনে প্রাণে তাঁর ভক্ত হয়ে যান। তাদের এই সাক্ষাত ও পরিচয় আহ্‌মদীয়া জামা’ত গঠন ও আনুষ্ঠানিক বয়আত গ্রহণের অনেক আগের ঘটনা। কিন্তু তখন থেকেই তাঁদের পারস্পারিক হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব অতি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইসলাম ধর্মের স্বপক্ষে ও সমর্থনে আল্লাহ্‌ তা’লা হযরত মির্যা সাহেবকে যে মহান দায়িত্বসহ প্রত্যাদিষ্ট করেছিলেন সে কাজে সাহায্য করার ও অংশ নেয়ার জন্য হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ) সদা প্রস্তুত ও ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। ফতেহ্‌ ইসলাম পুস্তকে হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ) লিখেছেন,

“সর্ব প্রথম আমি আমার এক আধ্যাত্মিক ভাইয়ের কথা উল্ল্যেখ না করে পারছি না যাঁর নিষ্ঠা জ্যোতির মত, তাঁর নামও হচ্ছে ‘নূরুদ্দীন’। তাঁর হালাল পথে উপার্জিত ধন সম্পদ দিয়ে তিনি যেসব ধর্মসেবা এবং ইসলামের সমর্থনে কাজ করে যাচ্ছেন সেগুলো লক্ষ্য করে আমার সব সময় আক্ষেপ জন্মে, হায়! এমন সেবা যদি আমিও করতে পারতাম! সত্য ধর্ম সমর্থনের জন্য তাঁর অন্তরে যে আবেগ সৃষ্টি করা হয়েছে সেদিকটি চিন্তা করলে আল্লাহ্‌র ঐশী পরিকল্পনার চিত্র আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি কীভাবে নিজেই তাঁর বান্দাদেরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকেন! এই মানুষটি তাঁর সমস্ত ধন-সম্পদ সামর্থ্য ও উপকরণের মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ্‌ রসূলের আনুগত্য করতে সদা প্রস্তুত। আর আমি কেবল সুধারণার বশবর্তী হয়ে একথা বলছি না বরং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি নিশ্চিতভাবে জানি, আমার খাতিরে কেবল ধন-সম্পদ নয়, তিনি তাঁর প্রাণ ও সম্মানকেও বিসর্জন দিতে পিছ পা হবেন না। আমি তাঁকে অনুমতি দিলে তিনি তাঁর সর্বস্ব এ পথে বিসর্জন দিয়ে আধ্যাত্মিক সাহচর্য্যের মত বাহ্যিক সাহচর্য্য অবলম্বন করার এবং সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকার দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করবেন।” (ফতেহ ইসলাম পুস্তিকা)

বয়আত গ্রহণের অনেক আগেই তিনি হুযূর (আঃ)-কে বলে রেখেছিলেন, যখনই বয়আত নিবেন আমাকে সবার আগে স্মরণ করবেন। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে নিজ কর্মজীবনে ব্যস্ত থেকেও যখনই তিনি সুযোগ পেতেন কাদিয়ানে ছুটে আসতেন আর সময় ও আর্থিক ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি সেবা অব্যাহত রাখতেন। এমনই এক পর্যায়ে হযরত মির্যা সাহেবের নির্দেশে তিনি খৃষ্টীয় মতবাদ খন্ডন করে ‘ফসলুল খেতাব’ পুস্তক রচনা করেন। আর যখন ১৮৮৯ সনের ২৩ মার্চ তারিখে লুধিয়ানায় সর্ব প্রথম বয়আত গ্রহণ অনুষ্ঠান হয় তখন এই নিষ্ঠাবান ধর্মানুরাগী মহান ব্যক্তিই সর্ব প্রথম হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর হাতে বয়আত গ্রহণ করেন।

ছাত্রাবস্থায়েই তিনি ইবাদত ও দোয়ার অভ্যাস পরিপক্ক করে নেন। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর দোয়া শুনতেন। আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর দোয়া কবুল করতেন বলেই প্রত্যেক প্রয়োজনের সময় অলৌকিকভাবে তিনি ঐশী সাহায্য পেতেন। আল্লাহ্‌র প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। অনেকগুলো ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা উল্ল্যেখ করছি।

ছাত্রাবস্থায় একবার এক যাত্রাপথে দীর্ঘসময় তাঁকে অভুক্ত থাকতে হয়। এক গ্রামের মসজিদে তিনি অবস্থান করছিলেন আর দৈহিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ছিলেন। কারও কাছে চেয়ে খাবার অভ্যাস তার ছিল না আর তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস ছিল আল্লাহ্‌ তাঁকে অবশ্যই উদ্ধার করবেন। এশার নামাযের পর মসজিদের বাইরে থেকে কে যেন এসে ‘নূরুদ্দীন’ বলে ডাক দিল। তিনি বাইরে গেলেন দেখলেন আধো অন্ধকারে এক ব্যক্তি ট্রে-ভরা সাজানো খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোন প্রশ্ন না করে তিনি তাঁর কাছ থেকে ট্রে নিয়ে মসজিদে এলেন এবং পেট ভরে খাবার খেলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন এই আড়ম্বরপূর্ণ খাবারের ব্যবস্থা কোন মানুষ করেনি বরং তাঁর প্রেমাস্পদ খোদার পক্ষ থেকে এই ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। খাবার খেয়ে থালা-বাসন ধুয়ে সেগুলো আবার শুকিয়ে মসজিদের তাকে রেখে দিলেন। পরের দিন তিনি তাঁর কাজে অন্য স্থানে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। কাজ শেষ করে বেশ কয়েকদিন পরে একই পথ দিয়ে ফেরার সময় সেই মসজিদে প্রবেশ করে দেখেন ট্রে আর থালা বাসনগুলো যেখানে রেখেছিলেন সেখানেই পড়ে আছে। কেউ এগুলো ফেরৎ নিতে আসে নি। তখন তিনি আরও নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তার জীবনোপকরণ দাতা খোদাই তাকে অলৌকিক ভাবে খাদ্য সরবরাহ করেছিলেন।

খোদা প্রেমিক নূরুদ্দীন (রাঃ)-এর জীবনে অজস্র এমন ঈমান উদ্দীপক ঘটনা আছে যা আমাদের ঈমানকে সতেজ ও শক্তিশালী করে। লেখা সংক্ষিপ্ত রাখার উদ্দেশ্যে তাঁর জীবনের মাত্র কয়েকটি ঘটনা উল্ল্যেখ করছি।

হযরত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রাঃ) এর জীবনীর প্রধান উল্ল্যেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর খোদাপ্রেম ও ইবাদত। তিনি যখন প্রথমবার হজ্জে গিয়েছিলেন, যাবার সময় তিনি জানতে পেরেছিলেন, কোন ব্যক্তি যখন সর্বপ্রথম স্বচক্ষে কা’বা শরীফ দর্শন করে সে সময় তার মনে এক অদ্ভুত অবস্থা ও অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় বান্দা যে দোয়াই করে সেই দোয়া গৃহীত হয়। হযরত হেকিম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ) তাই কা’বার প্রথম দর্শনেই দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ আমি তোমার এক অধম বান্দা। আমি প্রতি মুহুর্তে তোমার মুখাপেক্ষী । আমি দোয়া করছি জীবনে কোন সমস্যায় পড়ে আমি তোমার কাছে বিপদমুক্তির জন্য যে দোয়াই করবো তুমি তা গ্রহণ করে নিও। এই ছিল আল্লাহর এই খাঁটি বান্দার আকুতি। আর আল্লাহ তাঁর এই বান্দার দোয়া স্থায়ীভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রথমবার ২৪/২৫ বছর বয়সে মক্কায় গমন করেন এবং সেখানে দেড় বছর অবস্থান করে জ্ঞান আহরণ করেন। পরে তিনি কিছু দিন মদীনাতেও থাকেন এবং প্রখ্যাত আলেম শাহ আব্দুল গণি মুহাদ্দেস দেহলভীর সাহচর্য্যে জ্ঞান চর্চা করেন।

হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ)-কে একবার একজন প্রশ্ন করেছিলেন, মির্যা সাহেবের হাতে বয়আত করে আপনি কি পেলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আগে স্বপ্নের মাধ্যমে মহানবী (সাঃ)-এর দর্শন লাভ করতাম, বয়আতের পর জাগ্রত অবস্থায়ও তাঁর সাক্ষাত লাভ করে থাকি।”

কাশ্মীরের রাজার রাজ চিকিৎসক পদ থেকে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে জম্মু ত্যাগ করে চলে আসার সময়কার ঘটনা। হঠাৎ চাকুরী চলে গেলে মানুষ যেমন বিচলিত হয়ে পড়ে, হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ)-এর মাঝে তেমন কোন উৎকন্ঠাই লক্ষ্য করা গেল না। বরং আগে যেমন মানবসেবায় তাঁর দরবার উন্মুক্ত থাকতো তেমনি মানবসেবা, চিকিৎসা দান ও অন���যান্য কাজে তাঁর দ্বার খোলাই রইলো। তাঁর চাকুরীকালে স্বচ্ছল সময় কেটেছে কিন্তু তিনি কখনো নিজের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এসব ধন সম্পদ ব্যয় করেন নি। সেগুলো হ�� ধ��্ম সেবায় ব্যয় করতেন নয়তো মানুষের বিপদ দূর করার জন্য দান করতেন। বরং মানুষকে সাহায্য করার জন্য হেকীম সাহেব অনেক বড় অঙ্কের টাকা ধারও করতেন। চাকুরী কালেই জম্মুর এক হিন্দু মুদি ব্যবসায়ী তাঁকে মাসে অন্তত এক টাকা করে জমা রাখার পরামর্শ দিতো আর বলতো, সঞ্চিত সম্পদ বিপদের সময় কাজে লাগবে। কিন্তু হেকীম সাহেব (রাঃ) তার কথায় মোটেও ভ্রুক্ষেপ করতেন না। তিনি বিপদমুক্তির জন্য কখনই টাকার উপর নির্ভর করেন নি, তিনি জানতেন, তাঁর এক জীবন্ত খোদা আছেন যিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বশক্তিমান। তিনি থাকতে নূরুদ্দীনের আর চিন্তা কিসের? চাকুরী ছেড়ে দেয়ার সময় হযরত হেকীম সাহেবের হাতে টাকা পয়সা ছিল না, এদিকে তিনি জম্মু থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। এ সময় সেই হিন্দু ব্যক্তি এসে উপস্থিত। সুযোগ পেয়ে সে হেকীম সাহেবকে বললো, এখন নিশ্চয়ই আপনি আমার পরামর্শের মূল্য উপলব্ধি করতে পারছেন। একথা শুনে হেকীম সাহেব বললেন, আমি আপনার পরামর্শকে আগেও গুরুত্ব দেই নি, এখনও আমার কাছে এর কোন গুরুত্ব নেই। কিন্তু ভদ্রলোকটি তার আলাপ শেষ করার আগেই রাজ-কোষাগারের কয়েকজন আমলা এসে হেকীম সাহেবকে বললো, এই হলো ৪৮০ টাকা। এটি আপনার পাওনা ভাতা, দয়া করে বুঝে নিন। সেই হিন্দু আবেগের বশবর্তী হয়ে বলে ফেললো, তোমাদের বিরুদ্ধে হেকীম সাহেব কি কোন অভিযোগ দায়ের করতে যাচ্ছেন যার কারণে তোমরা তাঁর পাওনা প্রদান করতে এত তড়িঘড়ি করছো? যাই হোক, এই দৃশ্য দেখা শেষ হতে না হতেই আরেকটি অভিজ্ঞতা। এর কিছুক্ষণ পরে রাণী সাহেবার পক্ষ থেকে প্রায় আট’শ টাকা নিয়ে এক ভৃত্য এসে উপস্থিত। রাণী সাহেবার পক্ষ থেকে সে জানালো, রাণী মা আপনার ফেরৎ যাবার সংবাদ পেয়ে এ টাকা প্রেরণ করেছেন। হাত খরচ হিসেবে বাড়ীতে যা ছিল তার সবটাই পাঠিয়েছেন তিনি। সেই হিন্দু এই দৃশ্য দেখে হতবাক। ‘নূরুদ্দীন’-এর খোদা কি তাঁর জন্য সত্যিই এভাবে ব্যবস্থা করতে পারেন? কিন্তু তখনও সে হাল ছাড়বার পাত্র নয়। সে বললো, যার কাছ থেকে আপনি প্রায় দু’লাখ টাকা ধার নিয়েছেন সে কি আপনাকে এত সহজে যেতে দিবে? এর ক্ষেত্রে আপনি কি করবেন? কথা বলতে না বলতেই সেই ঋনদাতার ম্যানেজার গোছের একজন কর্মী এসে উপস্থিত। অতি বিনয়ের সাথে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে সে বললো, আমার কর্তা টেলিগ্রাম যোগে আমাকে সংবাদ পাঠিয়ে বলেছেন, মৌলভী সাহেব দেশে ফেরৎ যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি যেন তাঁর সমস্ত জিনিষ পত্র সাথে নিয়ে যান। তাঁর জিনিষ পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা থাকলে আমি যেন সে সব মালামাল আপনার সাথে প্রেরণের ব্যবস্থা করে দেই। আর এই ফিরতি যাত্রার জন্য যদি অর্থকড়ির প্রয়োজন হয় তা-ও যেন আমি তাঁর পক্ষ থেকে আপনাকে প্রদান করি। হেকিম সাহেব (রাঃ) বললেন, রাজকোষ থেকে টাকা পেয়েছি, একজন রাণী সাহেবাও কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। আমার কাছে এখন পর্যাপ্ত টাকা আছে, তাই টাকা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তবে আমার সব জিনিষ পত্র আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো-এর ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করুন। এ দৃশ্য দেখে হিন্দু বলে বসলো, পরমেশ্বররাও পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেন। আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গতর খেটে, পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে বড় কষ্টে এক টাকা আয় করতে পারি আর এই মানুষটা বসে বসে এত বড় ভান্ডার পায় কীভাবে? পূর্ববর্তী দু’জনের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু এই তৃতীয় ব্যক্তি যে লাখ লাখ টাকা আপনার কাছে পাবে, সে টাকা ফেরৎ না চেয়ে উল্টো আপনার ফেরৎ যাবার জন্য আরো টাকা সাধছে-এটা কেমন কথা? হেকিম সাহেব (রাঃ) উত্তর দিলেন, খোদা তা’লা মানুষের মন ভালভাবে চেনেন। আমি নিশ্চয়ই এই ঋণদাতার সমস্ত ঋণ অতি শীঘ্রই ফেরৎ দিয়ে দেবো। আপনি এর রহস্য বুঝবেন না। সত্যি সত্যিই হেকীম সাহেব সেই ব্যক্তির এক লক্ষ পঁচানব্বই হাজার টাকা ঋণ বছর খানেকের মধ্যেই শোধ করে দিয়েছিলেন। সেটাও এক অলৌকিক বিষয়। সেদিকে না গিয়ে এতটুকু বলাই যথেষ্ট, আল্লাহ্‌ তা’লা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়ে বলেছেনঃ ওয়ামাই ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজআল লাহু মাখরাজান ওয়া ইয়ারযুকহু মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব। অর্থাৎ “যে-ই সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন করবে আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর জন্য বিপদমুক্তির একটি সহজ পথ বের করে দিবেন এবং এমন পথ দিয়ে তাঁকে রিয্‌ক্‌ দান করবেন যার কথা সে ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করে নাই।” খোদা তা’লার এই অমোঘ প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ)-এর জীবনে আমরা পদে পদে দেখতে পাই। খোদা তা’লা আমাদেরকেও এই বিশেষ রিযকের ভাগীদার করুন, আমীন।

হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ সানী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, একবার হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ)-এর কিছু অর্থের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিল। হুযূর (রাঃ) তখন নামায আরম্ভ করে দীর্ঘ সময় দোয়া করলেন। নামায শেষ করে যখন জায়েনামায তুলছেন তখন সেখানে একটা পাউন্ড পড়া অবস্থায় পাওয়া গেল।

হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেবের জীবনের আরেকটি উল্ল্যেখযোগ্য দিক হচ্ছে যুগ-ইমাম হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা ও তাঁর প্রতি আনুগত্য। ১৮৯৩ সনের কথা। হেকিম সাহেব (রাঃ) তখন চাকুরী জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ দেশের বাড়ীতে বিশালাকার বসতবাড়ী ও হাসপাতাল নির্মাণ করছিলেন। বাড়ী নির্মাণের কাজে প্রায় সাত হাজার (৭,০০০) টাকা তখন ব্যয়ও করে ফেলেছেন আর হাসপাতালের নির্মাণ কাজ চলছে। এমন সময় তিনি এক কাজে লাহোরে আসলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে হুযূর (আঃ)-এর সাথে এক ঝলক সাক্ষাতের জন্য কাদিয়ান গেলেন। বাটালা থেকে কাদিয়ান যাবার জন্য যে ঘোড়া গাড়ী তিনি ভাড়া করলেন তার সাথে ফিরতি পথের ভাড়াও ঠিক করে নিলেন। কেননা তিনি ‘যাবো আর আসবো’ ভেবে কাদিয়ান যাচ্ছিলেন। ঘোড়া গাড়ী থেকে নেমে হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করলেন। হযরত মসীহ মাওউদ (আঃ) বলেন, এখন নিশ্চয়ই আপনার প্রচুর অবসর। হেকীম সাহেব বললেন, জ্বী হুযূর, আর কোন বাক্য ব্যয় না করে তিনি সোজা ঘোড়া গাড়ী বিদায় করে দিলেন। একদিন পরে হযরত আকদাস মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ) বললেন, আপনি আপনার এক স্ত্রীকে এখানে ডেকে নিন। হেকীম সাহেব হাসপাতাল নির্মাণের কাজ যে পর্যায়ে ছিল তেমনটি রেখেই কাজ বন্ধ করে দিলেন, আর তাঁর ছোট স্ত্রীকে আনিয়ে নিলেন। এরপর হুযূর আকদাস (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনার সাধের পাঠাগার আপনার অতি প্রিয়। সেটিও আনার ব্যবস্থা করুন। হেকীম নূরুদ্দীন পাঠাগারটি স্থানান্তরিত করে কাদিয়ানে নিয়ে আসলেন। এরপর এক পর্যায়ে হুযূর (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনার অপর স্ত্রী যিনি আপনার পছন্দ-অপছন্দ ভাল বুঝেন এবং আপনার পুরনো সঙ্গী তাঁকেও ডেকে পাঠান। তাঁকেও আনিয়ে নিলেন। এরপর হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনার দেশ ‘ভেরা’-র কথা একেবারে ভুলে যান। হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ)-এ কাজে আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর মনের অবস্থা পরিবর্তন করে দিলেন। এরপর থেকে তিনি আর কখনো ‘ভেরা’-কে স্মরণ করেন নাই। তখন থেকে তিনি কাদিয়ানেরই হয়ে রইলেন।

স্মরণ রাখতে হবে, এর কয়েক বছর আগে হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর কাছে তিনি কাদিয়ানে এসে জীবন কাটানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। তখন কিন্তু হুযূর (আঃ) তাঁকে অনুমতি দেন নি। ১৮৯৩ সনে তিনি যখন অবসর গ্রহণের পর হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে বাড়ী, হাসপাতাল নির্মাণের কাজে ব্যস্ত তখন যুগের ইমাম কেবল এতটুকু বললেন, এখন নিশ্চয়ই আপনার প্রচুর অবসর। আর এটুকু কথাতেই তিনি আর কোন ধরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না দিয়ে কাদিয়ানে রয়ে গেলেন। তাঁর নিজস্ব যত চিন্তাভাবনা ছিল, যত স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল সব বাদ দিয়ে যাঁর হাতে তিনি বয়আত করেছিলেন তাঁর সান্নিধ্যেই থেকে গেলেন। এই ছিল তাঁর আদর্শ, এই হলো আনুগত্যের পরাকাষ্ঠ��। এ��েই বলে Thy wish is my command. এভাবে নিঃশর্ত আনুগত্য করেছিলেন বলেই তিনি হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর তিরোধানের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রথম খলীফা হয়েছিলেন।

হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ)-এর জীবনের একটি বিশেষ দিক হলো তাঁর কুরআন প্রেম। তিনি সারাক্ষণ কুরআন অধ্যয়ন করতেন। নিজে পড়তেন আর অন্যদেরকে পড়াতেন। ১৮৯৩ সনের পরে কাদিয়ানে বসবাস আরম্ভ করার পরও তাঁর এটাই নিয়ম ছিল। প্রথমে তিনি নিজের বাড়ীতে পড়াতেন, পরবর্তীতে মসজিদেও দরস দিতেন। তিনি বড় হয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে কুরআন হিফয করেছিলেন। কেউ কুরআন মুখস্থ করে ফেলেছে জানতে পারলে এমন আনন্দিত হতেন যেমনটা অন্য কোন কারণে দেখা যেতো না। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তাঁর ছেলে জনাব আব্দুল হাই সাহেবকে ডেকে যেসব উপদেশ তিনি দিয়েছিলেন তার মধ্যে কুরআন শরীফ গভীরভাবে পড়ার কথা বিশেষভাবে বলেছিলেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়ালের কুরআন পড়ানোর একটি বৈশিষ্ট ছিল তিনি অল্প কথায় অনেক গভীর বিষয় বর্ণনা করে দিতেন। তাঁর ‘দরসুল কুরআন’ যারা পড়েছেন তারা একবাক্যে একথা স্বীকার করতে বাধ্য। তাঁর এই দরসগুলো প্রথমে ‘বদর’ পত্রিকায় এবং পরে পৃথক সংকলন আকারেও প্রকাশিত হয়েছে।

হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ)-এর জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা ইতিহাসে সংরক্ষিত। এর মাধ্যমে কেবল জামা’তের সদস্যদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সহানুভূতিই প্রকাশিত হয় না বরং সব খলীফাদের ভেতরকার মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। ঘটনাটি এরকম,

হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর সাহাবী মরহুম চৌধুরী হাশেম দীন সাহেব (রাঃ)-এর স্ত্রী তাঁর প্রথম সন্তান হবার সময় প্রসব বেদনায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। চৌধুরী সাহেব রাত ১১টার সময় হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ)-এর বাসায় ছুটে গেলেন। বাড়ীর দারোয়ান এত রাতে ভেতরে সংবাদ পৌঁছাতে অপারগতা প্রকাশ করে। কিন্তু হুযূর (রাঃ) বাড়ীর ভেতর থেকেই তাদের কথাবার্তা শুনতে পান। তিনি দোয়া পড়ে একটি খেজুর এনে চৌধুরী সাহেবকে দেন। হুযূর (রাঃ) তাঁকে বলেন, এটি যেন তিনি তাঁর স্ত্রীকে খাইয়ে দেন আর শিশুর জন্ম হয়ে গেলে তাঁকে যেন জানানো হয়। কিছুক্ষণ পরে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে কিন্তু এত রাতে গিয়ে হুযূর (রাঃ)-এর ঘুম ভাঙ্গানো তিনি আর সমীচীন মনে করলেন না। যখন সকালে উপস্থিত হয়ে তিনি বিস্তারিত সব জানালেন তখন হযরত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রাঃ) তাঁকে বললেন, “শিশুর জন্মগ্রহণের পর তোমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লে। আমাকেও জানাতে পারতে, তাহলে আমিও কিছুক্ষণ নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে নিতে পারতাম। আমি সারা রাত জেগে তোমার স্ত্রীর সুস্বাস্থ্যের জন্য দোয়া করেছি”। (তারিখে আহ্‌মদীয়াত, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ৫৫৩)

জামা’তের সদস্যদের প্রতি এই আন্তরিক ভালবাসা ও সহানুভূতির কারণেই তারাও গভীর অনুরাগ ও ভক্তির সাথে তাঁদের খলীফাদেরকে ভালবেসে থাকে ।

হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ) তাঁর খিলাফত কালে যে সব উল্ল্যেখযোগ্য কাজ করেছিলেন তার মধ্যে একটি হলো তিনি সমাজে ঐশী খিলাফতের মর্যাদা ও অবস্থান পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছিলেন।

হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর মৃত্যুর পর জামা’তের মুত্তাকী বুযুর্গরা যখন তাঁকে বয়আত গ্রহণ করার অনুরোধ জানান, তখন তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বয়আত নেন নি। বরং প্রথমে পানি আনিয়ে ওজু করে নিভৃতে নফল নামায পড়েন। দীর্ঘক্ষণ নামাযে কান্নাকাটি ও দোয়ার পর জনসমক্ষে আসেন। হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর জানাযা পড়ানোর আগে তিনি বয়আত গ্রহণ করেন কিন্তু এর আগে তিনি সবাইকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা যদি সত্যিই আমার বয়আত করতে চাও তাহলে কথা দাও, তোমরা আমার পূর্ণ আনুগত্য করবে। উপস্থিত সকলেই এক বাক্যে কথা দিলে তখন তিনি বয়আত গ্রহণ করেন। এ কাজের মাধ্যমে তিনি খিলাফতের সুমহান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।

জাগতিক শিক্ষা দীক্ষার প্রভাবে যারা খলীফাকে ‘একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি’ বলে ধারণা করতো তাদেরকে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোন আঞ্জুমান (বা সংগঠন) আমাকে খলীফা বানায় নাই আর আঞ্জুমান খলীফা বানানোর সাধ্যও রাখে না বরং খোদা তা’লা খলীফা বানান এবং তিনিই আমাকে খলীফা বানিয়েছেন। তিনি (রাঃ) দূর্বলদেরকে বুঝিয়েছিলেন, খিলাফত মুদির দোকানের সহজলভ্য সোডা ওয়াটারের মত কোন জিনিষ নয়। এটি চাইলেই কিনতে পাওয়া যায় না। এটি খোদা প্রদত্ত এক ঐশী নেয়ামত। তিনি আরও বলেছিলেন, খিলাফতের সমর্থনের জন্য ঐশী ফেরেশ্‌তারা সদা প্রস্তুত। কেউ যদি খিলাফতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তবে ফেরেশ্‌তা বাহিনী অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এভাবে, বিভিন্ন সময়ে তিনি খিলাফতের মান ও অবস্থান জামাআতের সামনে স্পষ্ট করে দেন। তাঁর খিলাফতকালে যে সব উল্ল্যেখযোগ্য কাজ সাধিত হয় সেগুলো হযরত মুফতি মুহাম্মদ সদেক সাহেব (রাঃ)-এর ভাষায় সংক্ষেপে এভাবে লেখা আছেঃ

(১) কাদিয়ানে দারুল উলুম মহল্লার জমি ক্রয়। (২) তা’লীমুল ইসলাম হাইস্কুলের এবং হোষ্টেলের নতুন ভবন নির্মাণ (৩) কাদিয়ানে মসজিদে নূর নির্মাণ (৪) নূর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা (৫) মাদ্রাসা আহ্‌মদীয়া প্রতিষ্ঠা (৬) ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার বিখ্যাত আলেম মওলানা মৌলভী সৈয়দ আব্দুল ওয়াহেদ সাহেবের বয়আত গ্রহণ যাঁর মাধ্যমে আরও শত শত মানুষ বয়আত করেন। (৭) ‘নূর’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। (৮) জামা’তের মুখপত্র ‘আল ফযল প্রকাশ। (৯) ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে অ-আহ্‌মদী ও আহ্‌মদীদের মাঝে ধর্মীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত। (১০) আহ্‌মদীয়া জামা’তের বিশিষ্ট বুযুর্গদের পক্ষ থেকে হিন্দুস্থানের বিভিন্ন স্থানে তবলীগি সভা ও প্রচার। (১১) আহ্‌মদীয়া জামা’তের প্রচারকদের অ-আহ্‌মদীদের পক্ষ থেকে তাদের বিভিন্ন সভায় বক্তৃতাদানের জন্য আমন্ত্রণ। (১২) লন্ডনে জামা’তের পক্ষ থেকে একটি ইসলাম প্রচার কেন্দ্র স্থাপন। এ কাজের জন্য জনাব খাজা কামাল উদ্দিন সাহেব ও চৌধুরী ফতেহ মুহাম্মদ সাইয়াল সাহেবকে সেখানে প্রেরণ।

হযরত হেকীম নূরুদ্দীন সাহেব (রাঃ) ১৯১০ সালে ঘোড়া থেকে পড়ে আহত হন। দীর্ঘ সময় তিনি অসুস্থ্য থাকেন। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি জামাআত পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। একান্ত অসুস্থ্য না বোধ করলে তিনি কুরআনের দরস প্রদান কখনই বাদ দেন নি। ১৯১৪ সনে ১৩ই মার্চ শুক্রবার তিনি তাঁর সর্বোচ্চ প্রেমাস্পদের কাছে ফিরে যান। পরের দিন ১৪ই মার্চ দ্বিতীয় খলীফা নির্বাচিত হয়ে হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রাঃ) তাঁর জানাযা পড়ান এবং হযরত মসীহ মাওউদ (আঃ)-এর কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আউয়াল (রাঃ) তাঁর প্রাণপ্রিয় ইমাম হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর সমান বয়স পেয়েছিলেন। একইভাবে ইহজগতে তিনি যেভাবে তাঁর ইমামের বাহ্যিক সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তেমনি মৃত্যুর পরেও তাঁর কবরের পাশেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসে আমাদের নেতা ও প্রাণপ্রিয় রসূল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সান্নিধ্যে স্থান দিন, এই আমাদের সবার দোয়া। আমীন।

হযরত মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর একটি ফারসী পংক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। তিনি হযরত হাজী হেকীম নূরুদ্দীন (রাঃ)-এর প্রশংসা করে লিখেছিলেন,

চেহ্‌ খুস্‌ বুদে গার্‌ হার্‌ ইয়াক যে উম্মত নূরে দীঁ বুদে
হামিঁ বুদে আগার হার দিল পুর আয্‌ নূরে ইয়াকিঁ বুদে॥

অর্থাৎ কত ভাল হতো যদি এই উম্মতের প্রত্যেকে নূরুদ্দীন হতো,
এটা তখনই সম্ভব হবে যখন প্রত্যেকের হ��দয় দৃঢ় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ হবে।

পাক্ষিক আহ্‌মদী - ৩১শে মে, ২০০৮ইং

উপরে চলুন