In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

কুরআন আমার প্রিয় কুরআন

আলহাজ্জ মোহাম্মাদ মুতিউর রহমান

(৩য় কিস্তি)

“কুরানের আলো সব আলো থেকে উজ্জ্বল প্রকাশিল
পবিত্র সেই যা থেকে নদীর এই আলো প্রকাশিল”॥

(বারাহীনে আহমদীয়া)

কুরআন অনুধাবনের পদ্ধতি

কুরআন করীম আল্লাহ্‌ তাবারক ওয়া তাআলার পবিত্র বাণী। এ বাণী বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে হলে আল্লাহ্‌প্রদত্ত বিধান মেনে চলতে হবে। আমরা কোন বস্তু তখনই দেখতে পাই যখন সেই বস্তুর আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। আর আমাদের চোখের আলোর সাথে সুসামঞ্জস্য ঘটায়। দ্রষ্টার চোখ এবং দৃশ্যমান বস্তুর মাঝে এর কোন ব্যত্যয় ঘটলে দর্শন ক্রিয়া সাধিত হয় না। কুরাআন বুঝার বেলায়ও এমনই প্রক্রিয়া ঘটে থাকে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম ক্বাদ আফলাহা মান তাযাক্কা অর্থাৎ সে অবশ্যই সাফল্য লাভ করেছে যে পবিত্রতা অবলম্বন করেছে (৮৭:১৫) প্রক্রিয়ায় নূর বা আলোতে পরিণত হয়েছিলেন। তাই জিব্‌রাঈল আমীন যখন কুরআনের আলো তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন তখন তিনি তা বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। মোটকথা ওহী ইলহামের আলোকেই কুরআন উপলব্ধি করা সম্ভব। কিন্তু এর বিপরীতে ওয়া ক্বাদ খাবা মান দাস্‌সাহা অর্থাৎ যে একে (অর্থাৎ আত্মাকে মাটিতে) প্রোথিত করেছে যে বিফল হয়েছে (৯১:১১)। অতএব একই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বসবাস করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম পবিত্র কালাম উপলব্ধি করে এর জ্যোতিতে জ্যোতির্মন্ডিত হয়েছিলেন অথচ আবূ জাহল একে উপলব্ধি না করার দরুন কালিমা লিপ্ত হয়েছিল এবং অন্ধকারের বাসিন্দায় পরিণত হয়েছিল।

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)ও এ পদ্ধতিতে কুরআন করীম বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং একটা সময় পর্যন্ত তাবা তাবেঈনরাও তাঁদের সাহচর্যে এসে উপকৃত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রায় এক হাজার বছর কাটে ঘোর আমানিশার অন্ধকারে। এ সময় কুরআনকে সেভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা হয়নি। কেবল আল্লাহ্‌র কালাম হিসেবে পুঁথি পাঠের ন্যায় পাঠ করার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। অবশেষে এমন এক সময়ও এলো যখন কুরআন স্থান পেলো গিলাফকৃত অবস্থায় তাকের ওপর। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল গোটা বিশ্বের সারা জাতি গোষ্ঠীর মানুষকে পথ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। একথা আমরা আগেও বলে এসেছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট জাতি গোষ্ঠীর ভাষায় অনুবাদ করে না দিলে সে উদ্দেশ্য সাধন ছিল দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু কুরআন অনুবাদ করাকে কোন এক সময় পাপকর্ম বলে মনে করা হতো। এ কুরআনও বেদের ন্যায় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর করতলগত বা বলা চলে কুক্ষিগত হয়ে গেল। তারা এ নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করে দিল। ব্রাহ্মণ ছাড়া বেদ যেমন অন্যদের পাঠ করার অধিকার ছিল না তেমনি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী ছাড়া অন্যদের কুরআন বুঝার ও উপলব্ধি করার সুযোগ যেন আর থাকলো না। একথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে যে কোন এক সময় এ কুরআন বাংলা ভাষায় করেন একজন হিন্দু ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন।

এ ঘোর অমানিশার অন্ধকার রজনীর পর আল্লাহ্‌ এবং আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চতুর্দশীর চাঁদরূপে আবির্ভূত হলেন যুগ-ইমাম হযরত ইমাম মাহদী ও মসীহ্‌ মাওউদ (আ.)। তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করলেন,

“আমি কুরআন শরীফের হকীকত ও মা’রেফত (গভীর তত্ত্বজ্ঞান) প্রকাশ করিবার নিদর্শন প্রদত্ত হইয়াছি এমন কেহ নাই যে এ বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে”।

(জরুরতুল ইমাম, পৃষ্ঠা: ১২৭, বাংলা সংস্করণ)

তিনি (আ.) আরও বলেন:

“প্রায় ২০ বছর পূর্বে, বারাহীনে আহমদীয়া গ্রন্থে এই ইলহামটি লিপিবদ্ধ হইয়াছে - আর রহমান ‘আল্লামাল কুরআন-লিতুনযিরা ক্বাও মামনা উনযিরা আবাউহুম ওয়া লি তাসতাবীনা সাবীলাল মুজরিমীন। কুল ইন্নী উমিরতু ওয়া আনা আওওয়ালুল মু’মিনীন, অর্থাৎ অযাচিত-অসীম দানকারী যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন যেন তুমি সেই জাতিকে সতর্ক কর যাহাদের পিতৃপুরুষকে (ইতিপূর্বে) সতর্ক করা হয় নাই, যাতে অপরাধীদের পথ সুস্পষ্ট হইয়া যায়। তুমি বল, ‘আমি আদিষ্ট হইয়াছি এবং আমি মু’মিনদের মধ্যে প্রথম।’

এই ইলহাম অনুযায়ী খোদা আমাকে কুরআনের জ্ঞান দান করিয়াছেন। তিনি আমাকে সমুদ্রের ন্যায় মা’রেফত এবং তত্ত্বজ্ঞানে পূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। এবং বার বার ইলহাম যোগে জানাইয়াছেন, বর্তমান যুগে ঐশী জ্ঞানে আমার সমকক্ষ আর কেহ নাই। আমি খোদার নামে শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি মল্ল যুদ্ধের ময়দানে দন্ডায়মান। যে আমাকে গ্রহণ না করিবে অবিলম্বে মৃত্যুর পর সে লজ্জিত হইবে। আর এখন সে আল্লাহ্‌র অকাট্য যুক্তির নিচে দন্ডায়মান”।

(জরুতুল ইমাম, পৃষ্ঠা: ১৩৩-১৩৪, বাংলা সংস্করণ)

প্রসঙ্গত বলা যায়, মহান ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর (আ.) প্রতিষ্ঠিত খিলাফতের খলীফাগণের প্রচেষ্টায় আজ প্রায় ১০০টি ভাষায় কুরআন মজীদের অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রায় ৬৮টি ভাষায় এর মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন জামাআতে আহমদীয়া দাবী করতে পারে কিছুটা হলেও বিশ্বের জাতি গোষ্ঠীর কাছে কুরআনের বাণী পৌঁছে দিয়ে কুরআনের তবলীগ পৌঁছানো হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌।

তাই যে কথা আলোচনা করেছিলাম সে কথায় আসা যাক। কুরআন বুঝতে হলে কুরআন উপলব্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে ঐশীজ্ঞান তথা ওহী ইলহামের। এর সৌভাগ্য যাদের লাভ হয় তারাই কেবল নিজেরা এ মহান কালাম বুঝতে পারেন এবং অন্যদেরও বুঝাতে পারেন। একথা কেবল জামাআতে আহমদীয়া বিশ্বাস করে না অন্যদের কারও কারও মুখেও একথা শুনেছি।

আশির দশকের কথা। খাকসার তখন পটুয়াখালীতে একটি ছোট খাট ব্যবসা করি এবং পটুয়াখালী জামাআতকে নুতন করে প্রতিষ্ঠা করে এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছি। খাকসারের তবলীগে আবহওয়া অফিসের স্থানীয় কর্মকর্তা জনাব গিয়াসউদ্দীন আহমদ সাহেব সপরিবারে আহমদীয়ত গ্রহণ করেন। কোন একদিন মাওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব পটুয়াখালী এলেন। পটুয়াখালী জুবিলী স্কুলে তার বিশাল মাহফিলের প্যান্ডেল তৈরী করা হয়েছে। পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি লোক সমাগম হয়েছে। আমি গিয়াস সাহেবকে নিয়ে গেলাম মাহফিল শুনতে। সাঈদী সাহেব তার বক্তৃতার কোন এক পর্যায় বলে ফেললেন, “কুরআন বুঝতে হলে ওহীর জ্ঞানের আবশ্যক”। সাথে সাথে গিয়াস সাহেবকে বললাম, “শুনলেন তো! একথা আহমদীরা বললে দোষ। আর হ���রত মির্যা সাহেব তো ওহী ইলহামের দাবী করেই কাফের হয়ে গেছেন। সে যা-ই হোক সত্য কথা অবলীলায় মুখ থেকে বের হয়ে যায়”। এর কাছাকাছি সময়ের আর একটি ঘটনা সম্পর্কে না উল্লেখ করে পারলাম না। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেব ঢাকা সিটির জামাতে ইসলামীর আমীর। তিনি গেছেন পটুয়াখালীতে সভা করতে। টাউন হলে সভার আয়োজন করা হয়েছে। জনাব নাসির উদ্দিন মিল্লাত তখন আমার জামাআতের খোদ্দামুল আহমদীয়ার সদস্য। তাকে দিয়ে নিজামী সাহেবকে ইমাম মাহদী সম্পর্কে তার কি ধারণা এ প্রশ্নটি করলাম। মাওলানা সাহেব জবাব দিলেন, “যার মাধ্যমে খিলাফত কায়েম হবে তিনিই ইমাম মাহদী”। ২০/২৫ বছর আগের কথা। মেঘনা পদ্মায় অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। আহমদী জামাআত হযরত ইমাম মাহদী ও মসীহ্‌ মাওউদ (আ.)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত খিলাফতের শতবার্ষিকী উৎসব পালন করছে এ বছর। তিনি যা বলেছেন তার গুরুর পুস্তকাদিতে এভাবেই লেখা আছে। তিনি এখন জীবনের শেষ বেলায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তাকে সে দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিনীতভাবে বলতে চাই, নানা বাধা বিপত্তির মুখে যে খিলাফত শতবর্ষ ধরে টিকে আছে এর প্রতিষ্ঠার পেছনে যে পবিত্র ব্যক্তিসত্তা রয়েছেন তিনি কি মিথ্যাবাদী হতে পারেন, দয়া করে খোদার ওয়াস্তে একটু চিন্তা করে দেখবেন কি? নচেৎ এ বিষয়টি যেদিন মহান খোদার দরবারে উপস্থাপন করা হবে তখন আপনার কি জবাব হবে তা দেশবাসীকে জানাবেন কি?

প্রসঙ্গত বলতে চাই, বিগত শতাব্দী এবং এ শতাব্দীতেও খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্যে জোরদার আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু তা সফলতার মুখ দেখেনি। কিন্তু যে খিলাফত আজ শতবর্ষ ধরে আল্লাহ্‌র নামের দোহাই দিয়ে টিকে আছে একে সত্য বলে গ্রহণ না করাটা আল্লাহ্‌র কাছে যে পসন্দনীয় হবে না তা জোর দিয়ে বলা যায়।

কুরআন করীম বুঝার এবং উপলব্ধি করার প্রসঙ্গে মৌলভী আবুল আলা মৌদূদী সাহেব খুব সুন্দর একটি নীতি নির্ধারণী বক্তব্য রেখেছেন তার তফহীমুল কুরআনের বঙ্গনুবাদের ভূমিকায়। বক্তব্যটি এরূপ:

“বস্তুত কুরআন উপলব্ধি করা তখনই সহজ হইতে পারে, যদি আপনি উহা লইয়া উঠেন এবং বিশ্ব মানবকে আহ্বান জানাইবার কাজ বাস্তব ক্ষেত্রে শুরু করেন। অতঃপর আপনার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ, প্রত্যেকটি কার্যক্রম এই কুরআন অনুযায়ী হইলে ইহা অবতীর্ণ হওয়ার সময় তখনকার লোকদের যে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ হইয়াছিল, আপনার জীবনেও তাহাই লাভ হওয়া সম্ভব হইতে পারে। অতএব মক্কা, আবিসিনিয়া ও তায়েফের কঠিনতম অধ্যায়গুলি এক-এক করিয়া আপনার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইবে। বদর ওহোদ হইতে শুরু করিয়া হোনায়েন এবং তাবুক পর্যন্ত প্রত্যেকটি অধ্যায়ই সম্মুখে হাজির হইবে। আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মত লোকদের সহিতও আপনার মুকাবিলা হইবে। বহু মুনাফেক ও ইয়াহুদী জাতির সহিতও আপনার সাক্ষাত ঘটিবে এবং প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হইতে শুরু করিয়া যাহাদের মন রক্ষা করা হইয়াছে এমন সব লোক পর্যন্ত সকল প্রকারের মানুষের সহিতই সাক্ষাৎ ঘটিবে। বস্তুত ইহা এমন এক প্রকারের সাধনা, যাহাকে আমি ‘কুরআনী সাধনা’ নামে অভিহিত করিতে চাই। এই সাধনার বাস্তব ফল এই যে, এই পথে যতই অগ্রসর হইবেন, কুরআনের অনেক আয়াত এবং অনেক পূর্ণ সূরা সম্মুখে আসিয়া স্বতঃই জানাইতে থাকিবে যে, উহা এইরূপ অবস্থায় এই বাণী লইয়া নাযিল হইয়াছিল। এই পথে কুরআনের কোন কোন শব্দ কিংবা কোন তত্ত্ব পথিকের দৃষ্টির আড়ালে থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু কুরআন তাহার সমগ্র অন্তর্নিহিত ভাবধারা যে তাহার সম্মুখে উদ্ঘাটিত করিয়া দিবে তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই”।

(তফহীমুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ২২, আধুনিক প্রকাশনী কর্তৃক মার্চ ১৯৮৩ সনে প্রকাশিত)

মৌলভী সাহেবের উদারহণটি খুবই সুন্দর তা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। এজন্যে তাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারছি না। কিন্তু এ বন্ধুর পথে পদচারণা করতে গোটা বিশ্বে আহমদী জামাআত ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তিনি হয়ত তার জামাআতকে লক্ষ করে এ বর্ণনাটি উপস্থাপন করে থাকবেন। কিন্তু এটা তার জামাআত হতে পারে না। এটা এমন একটি জামাআত যার পেছনে একজন ঐশী প্রত্যাদিষ্ট পুরুষ রয়েছেন যিনি কুরআন করীম হাতে নিয়ে উঠেছেন। এখানে ‘উঠেছেন’ শব্দের প্রতি একটু লক্ষ করা আবশ্যক। আরবীতে এর অনুরূপ শব্দ হলো বা ‘আছা’ এ শব্দটি যার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তিনি আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রত্যাদিষ্ট হয়ে থাকেন। এ কথা আমাদেরকে নিম্নোক্ত হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দেয়:

ইন্নাল্লাহা ইয়াবআছু লি হাযিহিল উম্মাতি আলা রা’সি কুল্লি মিয়াতি সানাতিন মাঁইইউজাদ্দিদুলাহা দীনাহা

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ প্রত্যেক শতাব্দীর শিরোভাগে এ উম্মতের জন্যে এমন মহাপুরুষ আবির্ভূত করবেন (অন্য কথায় উঠাবেন বা দাঁড় করাবেন-প্রবন্ধকার) যিনি তাদের জন্যে ধর্মকে সঞ্জীবিত করবেন।

(আবূ দাউদ, কিতাবুল মাহদী)

সত্যিকথা বলতে কি মৌলভী সাহেব বা তার দলের কেউ এমন দাবী করেন নি আর আল্লাহ্‌র আদেশ ছাড়া এমন দাবী করার ধৃষ্টতাই বা দেখাবেন কি করে? এমন দাবী করেছেন হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ইমাম মাহদী ও মসীহ মাওউদ (আ.)। তিনি আল্লাহ্‌র নামে কসম খেয়ে এ দাবী করেছেন এবং কুরআনের প্রচার ও প্রসারের কাজ সারাজীবন করে গেছেন।

তাঁর জামাআতও এখন করে যাচ্ছে এবং করতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ্‌। মৌলভী মৌদূদী সাহেব তার উপরোক্ত বক্তব্যে যে চিত্র এঁকেছেন তা আমরা আহামদী জামাআতের মাঝেই দেখতে পাই। এ চিত্র দেখতে পাই ১৯৩৪ সনে, ১৯৫৩ সনে, ১৯৭৪ সনে এবং ১৯৮৪ সনে। এ চিত্র দেখতে পাই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে এবং ইন্দোনেশিয়ায়। প্রত্যেক ইতিহাস পাঠক সচেতন ব্যক্তি এ ব্যাপারে অবহিত। প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় শুধু ইঙ্গিত করলাম মাত্র। বিশেষ আর কোন জামাআতের বিরুদ্ধে বদর, উহুদ, হুনায়ন প্রভৃতির ন্যায় যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি হয় হয়নি। তায়েফ ও আবিসিনিয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয় নি। সারা বিশ্বে অসংখ্য নিষ্পাপ আহমদী শাহাদতের পেয়ালা পান করে ধন্য হয়েছেন। মক্কার কাফিররা যেভাবে মুসলমানদের পবিত্র কলেমা পড়তে ও আল্লাহ্‌র নাম নিতে বাধা দিয়েছিল তেমনি বাধা আহমদী জামাআত ছাড়া আর কাউকে দেয় হয়নি। আর আল্লাহ্‌র ফযলে এ জামাআত পর্বতসম একটার পর একটা বাধা ডিঙ্গিয়ে আজ বিশ্বের ১৯৩টি দেশে ইসলামের কলেমার ঝান্ড তৌহীদের ঝান্ডা নিয়ে কুরআন প্রচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এবং ৬৮টিরও অধিক ভাষায় কুরআন প্রচার করে বেড়াচ্ছে। এর সফলতার প্রমাণ এম.টি.এ এবং এর মাধ্যমে প্রচারিত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত জুবিলী জলসাগুলো। আলহামদুলিল্লাহ্‌ আলা যালিক। সুতরাং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একথা বলা যায় আজকের বিশ্বে কুরআন যদি কেউ বুঝে থাকে এবং হাতে নিয়ে ‘উঠে’ থাকে তাহলে তা হলো আহমদী জামাআত।

কুরআন তফসীরের মূলনীতি বা মানদন্ড

যুগ ইমাম হযরত ইমাম মাহদী ও মসীহ্‌ মাওউদ (আ.) তাঁর বিখ্যাত ‘বারাকাতুদ্দোয়া’ পুস্তকে কুরআনের তফসীরের যে মূলনীতি বর্ণনা করেছেন তা সংক্ষেপে নিজ ভাষায় বর্ণনা করছি:

  • (১) তফসীরের ব্যাখ্যার প্রথম নীতিনির্ধারক ও মানদন্ড হলো কুরআন করীম স্বয়ং নিজেই। কুরআনের যে কোন একটি আয়াতের অর্থ কুরআনেরই অন্যান্য আয়াতে পাওয়া যায়। কুরআন যেন একটি পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ অট্টালিকা। কুরআনের এমন কোন উক্তি নেই, যার সাহায্যের জন্যে কুরআনের আরও ১০/২০ টি স্থানে অনুরূপ উক্তি পাওয়া যায় না। কুরআনের একাংশ অন্য অংশের বিপরীত হতে পারে এটাও অসম্ভব। সত্যও সঠিক অর্থের চিহ্ন হলো এটাই যে কুরআন করীমের মাঝেই এর সাক্ষদাতা এক বাহিনী মজুদ আছে।

  • (২) কুরআনকে সবচেয়ে অধিক বুঝতেন আমাদের প্রিয় ও সম্মানিত নবী রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম। এ প্রসঙ্গে কেউ সন্দেহ করতে পারে না। তাই তিনি (সা.) যে সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে জানা যায় তা-ই সঠিক। যে অর্থ রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলয়হে ওয়া সাল্লাম করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় প্রত্যেক মুসলমানের তা বিনা দ্বিধায় ও বিনা সংশয়ে গ্রহণ ও মান্য করা আবশ্যক।

  • (৩) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম তাঁর (সা.) কাছ থেকে সরাসরি আধ্যাত্মিক জ্যোতি লাভ করেছিলেন। যে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি বিতরণের জন্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম এসেছিলেন তা গ্রহণ করার জন্যে সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন প্রথম সারিতে। তারাই খোদা তাআলার বিশেষ অনুগ্রহভাজন। পবিত্র কুরআন সঠিকভাবে বুঝতে সহায়তা করার জন্যে খোদা তাআলার সাহায্য ছিল তাদের নিত্য সহচর। তাঁরা শুধু পাঠ করতেন আর অর্থ করতেন এমন নয় তাঁদের জীবন যাপন পদ্ধতিও ছিল কুরআন সম্মত। কুরআনের প্রতিটি অংশ তাদের কাজ কর্মে প্রতিফলিত হতো। তাঁরা ছিলেন কুরাআনের আলোকে দীপ্তিমান।

  • (৪) কুরআন করীমের যে কোন অংশের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য বুঝতে হলে এর পাঠককে পরিস্রুত আত্মা নিয়ে ভালভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। কেননা, কুরআনের আয়াত - লাইয়া মাস্‌ সুহূ ইল্লাল মুতাহ্‌হারূন, অর্থাৎ পূত-পবিত্র না হলে কেউই একে স্পর্শ করতে পারে না (৫৬:৮০) অনুযায়ী কুরআন এবং পরিস্রুত আত্মার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কুরআনের সত্যগুলো কেবল তাদেরই কাছে আত্ম প্রকাশ করে থাকে যারা পবিত্র ও নির্মল হৃদয় নিয়ে একে বুঝতে চেষ্টা করে। আত্মার জ্যোতি মূল্যবান নীতিনির্ধারক পার্থক্যকারী। এর মাধ্যমে সঠিক অর্থে পৌঁছানো যায়। ব্যক্তিগত মতের ভিত্তিতে কুরআনের অর্থ করতে রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। এবং বলেছেন, “মান ফাস্‌সারাল কুরআনা বিরা’ইহি ফা আসাবা ফাক্বাদ আখতারা” অর্থাৎ যে কেবল নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করেছে এবং নিজ ধারনায় উত্তম করেছে তবুও সে অপব্যাখ্যা করেছে।

  • (৫) কুরআনের সঠিক তফসীরের মানদন্ড হিসেবে আরবী অভিধানও রয়েছে। কিন্তু কুরআন করীম নিজের মাঝে এত উপরকণ সন্নিবেশ করে দিয়েছে যে এরকম আরবী অভিধানের প্রয়োজন নেই। তবে অধিক অন্তর্দৃষ্টি লাভের খাতিরে নিঃসন্দেহে অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। বরং কখনো কখনো কুরআন করীমের গোপন রহস্যের প্রতি অভিধান নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে দেয় এবং একটি তত্ত্ব বের হয়ে আসে।

  • (৬) আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাকে উপলব্ধি করার জন্যে জড় জগতের ব্যবস্থাদিও রয়েছে। কেননা, খোদা তাআলার উভয় বিধিমালা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এত্থেকে পথনির্দেশনা নেয়া যেতে পারে।

  • (৭) ওলী আল্লাহ্‌গণের ওহী-ইলহাম এবং মুহাদ্দেসগণের কাশ্‌ফ বা দিব্যদর্শন। এ মানদন্ডই সবচেয়ে অধিক প্রামাণিক। কেননা, ওহীপ্রাপ্ত মুহাদ্দাস নবীর ভূমিকাই পালন করে থাকেন। তাকে নবুওয়ত ছাড়া ধর্মের পুনরুজ্জীবনে সব আদেশই দেয়া হয়ে থাকে। যাঁরা আল্লাহ্‌র বাণী লাভ করেন তাঁরাই মুহাদ্দাস। তাঁদের মন ও আত্মা নবীগণের মন ও আত্মার সাথে নিগুঢ়ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নবুওয়তের স্বরূপকে জানার চিরস্থায়ী উপায় ও চিহ্ন হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতা কাজ করে থাকে।

(বারাকাতুদ্দোয়া, পৃষ্ঠা: ২৬-৩০)

আমরা পুনরায় আমাদের গোড়ার আলোচনায় ফিরে এসে বলতে চাই, কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে ওহী ও ইলহামের জ্ঞানের প্রয়োজন। আর আল্লাহ্‌ তাআলা এ সৌভাগ্য কেবল তাঁর প্রিয় ব্যক্তিগণকেই দিয়ে থাকেন। কেবল পার্থিব জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে কেউ সঠিকভাবে কুরআনের তত্ত্বজ্ঞান যে লাভ করতে পারে না তা বলাই বাহুল্য। আমরা মহান আল্লাহ্‌র কাছেই তাঁর পবিত্র কলাম কুরআনে মজীদ বুঝার ও উপলব্ধি করার সাহায্য ভিক্ষা করি।

“কুরআন বুঝিতে চাহ? দুনিয়ার ভোগী হয়ে হয় না যে এ কাজ সাধন,
এই শরবতের স্বাদ, তাহাদেরই তরে, আগে যারা পেয়েছে কিছু আস্বাদন।”

-বারাকাতুদ্দোয়া

৪র্থ কিস্তি

পাক্ষিক আহ্‌মদী - সংখ্যা: ১৫ই আগস্ট, ২০০৮ইং

উপরে চলুন