In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

কুরআন আমার প্রিয় কুরআন

আলহাজ্জ মোহাম্মাদ মুতিউর রহমান

১ম কিস্তি

‘কুরআন সাব ছে আচ্ছা কুরআন সাব ছে পেয়ারা
কুআন দিল কি কুওওয়াত কুরআন হ্যা সাহারা’

(কুরআন সবচেয়ে উত্তম কুরআন সবচেয় প্রিয়
কুরআন প্রাণের শক্তি কুরআনই হলো আশয়।।)

কুরআন মজীদ আল্লাহ্‌ তাবারক ওয়া তাআলার পবিত্র ও অনন্য কিতাব এবং কালাম বা বাণী। সারা বিশ্বের মানবমন্ডলীর উদ্দেশ্যে এ পবিত্র কালাম অবতীর্ণ হয়েছে (সূরা বাকারা: ১৮৬)। রূহুল কুদুস রূহুল আমীন হযরত জিব্‌রাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে এ কুরআন হযরত খাতামুন্নাবীঈন রহমাতুল্লিল আলামীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ করেছেন মহান আল্লাহ্‌ তাআলা। ৬১০ খৃষ্টাব্দের ২৪শে রমযান হযরত জিবরাঈল আমীন সর্ব প্রথম হেরা গুহায় প্রথম কুরআনের বাণী নিয়ে আসেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের কাছে।

কুরআন মজীদ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞাতব্য বিষয়

এ কুরআন শেষ ও পরিপূর্ণ জীবন বিধান গোটা মানবজাতির জন্যে।

‘আল্‌ কুরআন’ শব্দটি ‘কারায়া’ মূল শব্দ থেকে উৎপন্ন। ‘কারায়া’ অর্থ সে পাঠ করেছিল, সে বাণী পৌঁছিয়েছিল, সে সংগ্রহ করেছিল। কুরআন অর্থ: (১) পাঠ্যোপযোগী পুস্তক যা বার বার পাঠ করা যায়। (২) একখানা পুস্তক যা বিশ্বের সব জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং পৌছানো প্রয়োজন। এমন যা সব সত্যকে ধারণ করে ইত্যাদি। কুরআনের ২য় সূরা আল্‌ বাকারার প্রথমেই ‘যালিকাল কিতাব’ বা এ সেই প্রতিশ্রুত কিতাব বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল একদিন এ এক সুসমন্বিত আকারে গ্রন্থ হিসেবে আকৃতি লাভ করবে অথচ তখনও পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণই হয়নি।

কুরআনে এর আরও ৩৩টি নাম বর্ণিত হয়েছে। এর কয়েকটি এরূপ: আল্‌ কিতাব, আল্‌ কুরআন, আয্‌ যিক্‌র, আল্‌ হুদা, আল্‌ আয়ান, আন্‌ নূর, আল্‌ হাকীম, আল্‌ বশীর, আল্‌ নাযীর, আল্‌ মাজীদ, আল্‌ কারীম

কুরআন এমন একখানা পুস্তক যা ১১৪টি পরিচ্ছেদ বা Chapter -এ বিভক্ত। প্রতিটি পরিচ্ছদকে বলে সূরা। সারা কুরআন আবার ৩০ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর এক একটি অংশকে পারা বা Part বলে। আবার পুরা কুরআন ৭টি মঞ্জিলে বিভক্ত। এসবই করা হয়েছে কুরআন সহজে মুখস্থ করার সুবিধার জন্যে। কুরআন যিনি মুখস্থ করে রাখেন তিনি ‘হাফিয’ নামে পরিচিত। বিশ্বের কোন গ্রন্থ এভাবে কেউ মুখস্থ রাখতে পারে না। এটা কুরআনেরই একটি বৈশিষ্ট্য। আর এ ব্যাপারে কুরআনে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। কুরআনের সূরাগুলোর কোন কোনটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং কোন কোনটি হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এদের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৪ এবং ৩০। তাই এ সূরা গুলোকে মক্কী ও মাদানী নামে অভিহিত করা হয়েছে। সূরার কোন কোনটি মক্কা মদীনা উভয় স্থানেই অর্থাৎ ২ বার অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআন মজীদে আয়াতের সবমোট সংখ্যা ৬২৩৬। আর সূরার প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ্‌’-কে আয়াত ধরে গণনা করলে সংখ্যা দাঁড়ায় (৬২৩৬ + ১১৩) ৬৩৪৯। কোন কোন বর্ণনায় ৬৬৬৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতের গঠন নিয়ে মতভেদের কারণে এ রকম হতে পারে। কুরআনের শব্দের সংখ্যা ৭৭, ৯৩৪ (ইমাম সাইউতী প্রণীত কিতাবুল ইতকাল ফি উল্কমিল কুরআন, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৬৬-৭২)। কুরআন মজীদ দীর্ঘ ২৩ বছর(মক্কায় ১২ বছর ৫ মাস ২১ দিন এবং মদীনায় ১০ বছর ৬ মাস ৯ দিন) বছর বা ৭৯৭০ দিনে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বুঝা যায় কুরআন খুব ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯টি শব্দ অবতীর্ণ হয়েছে। প্রাথমিক যুগে কুরআনে এখানকার মত ‘ই’রাব’ বা ‘যের’, ‘যবর’ ইত্যদি ছিলো না। উমাইয়া রাজত্বকালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময় এর প্রবর্তন করা হয়। আরও পরে মুখস্থ করার সুবিধার্থে কুরআন করীমকে ৫৪০ রুকূ এবং ৭টি মঞ্জিলে বিভক্ত করা হয়। এটা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্য এরূপ:

আগেই বলেছি কুরআনে ৩০টি পারা। যাতে ৩০ দিনে কুরআন খতম করা যায় তাই এ ব্যবস্থা। প্রত্যেক পারাকে আবার এক চতুর্থাংশ, অর্ধাংশ, এক তৃতীয়াংশ এভাবেও ভাগ করা হয়েছে। কুরআনে দু রকমের আয়াত - ‘আয়াতে মুহকামাত’ (আদেশসম্বলিত সুস্পষ্ট) এবং ‘আয়াতে মুতাশাবিহ’ (রূপ দ্বার্থবোধক)। কুরআনে ২৯টি সূরার প্রথমে সূরা হুরূফে মুকাত্তায়ত আছে। আরবীকে বলে ‘উম্মুল আল সিনা’ বা ভাষার জননী। এ ভাষায় কুরআন করীম অবতীর্ণ হয়েছে (সূরা ইউসূফ: ৩)। এ কুরআন সব গ্রন্থের জননী (সূরা যুখরুফ: ৫)। সব স্থায়ী আদেশ এতে সন্নিবেশিত করা হয়েছে (সূরা বাইয়েনাহ: ৪)। এ কুরআন শেষ ও পরিপূর্ণ শরীয়ত গ্রন্থ মানুষের জন্য পরিপূর্ণ জীবন বিধান (সূরা মায়েদা: ৪)। আল্‌ কুরআনে ‘আল্লাহ্‌’ শব্দটি ২৬৯৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে। ‘মুহাম্মদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হযেছে ৪ বার।

কুরআন করীমের অবতীর্ণ ও গ্রন্থবদ্ধ হওয়ার ইতিবৃত্ত

আগেই বলেছি কুরআন করীম রূহুল আমীন হযরত জিবরাঈলের মারফত দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের কাছে অল্প অল্প করে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আঁ হুযূর (সা.)-এর রীতি ছিল, কুরআনের যতটুকু অংশ যখনই অবতীর্ণ হতো তিনি তখনই আল্লাহ্‌ তাআলার প্রত্যক্ষ তদারকীতে ও নির্দেশে তা লিপিবদ্ধ করিয়ে নিতেন চামড়া হাড় গাছের পাতা বাকল প্রভৃতিতে। কেননা, তখনও কাগজ আবিষ্কৃত হয়নি। আর আল্লাহ্‌ তাআলার ফযল ও অনুগ্রহে নবী আকরম (সা.)-এর হৃদয়পটেও এ অংশ অঙ্কিত হয়ে যেতো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ তাআলার প্রতিশ্রুতি ছিল ‘সা নুক্বরিউকা ফালা তানসা’ (সূরা আলা) অর্থাৎ আমি তোমাকে কুরআন এমনভাবে পড়িয়ে দেবো যে তুমি তা ভুলবে না। মহান আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেছেন, ‘ইন্না আলায়না জামাআহূ ওয়া কুরআনাহূ’ (সূরা কিয়ামাহ্‌) অর্থাৎ ন��শ্চয় এ কুরআন (তোমার হৃদয়পটে) সমাবেশ করে দেয়া আমাদের দায়িত্ব।

কুরআন কিভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের কাছে অবতীর্ণ হতো এ প্রসঙ্গে দু একটি হাদীস উদ্ধৃত করার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করি:

আগেই বলেছি, ওহী অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই নবী করীম (সা.)-এর হৃদয়পটে তা খোদিত হয়ে যেতো। এমনকি সাহাবা কেরামের মাঝেও এর প্রভাব সৃষ্টি হতো। তাঁরাও সহজেই শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলতেন। তবে এর মাঝে যাতে কোন বিকৃতি না ঘটে সেজন্যে এ ওহী লিখার জন্যে কোন কোন সাহাবী নিযুক্ত ছিলেন। তাঁদের বলা হতো ‘কাতেবে ওহী’ বা ওহী লিখক। এঁদের মাঝে ছিলেন: (১) হযরত আবূ বকর (রা.) (২) হযরত ওমর (রা.), (৩) হযরত উসমান (রা.) (৪) হযরত আলী (রা.) (৫) যাবির বিন আলা আওয়াম (৬) শারজীল বিন হাসনাহ্‌ (৭) আব্দুল্লাহ্‌ বিন রাওয়াহাহ্‌ (৮) ওবায় বিন কা’ব (৯) যায়েদ বিন ছাবিত। রসূলুল্লাহ্‌ (সা.)-এর দরবারে এ রকম ৪২ জন কাতেবে ওহী ছিলেন। প্রত্যেক বছর কুরআন মজীদের কতটুকু অংশ অবতীর্ণ হতো রমযান মাসে হযরত জিব্‌রাঈল তা নবী করীম (স.)-এর কাছে পুনরাবৃত্তি করতেন। যে বছর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন সেই বছর হযরত জিব্‌রাঈল রমযান মাসে অবতীর্ণ গোটা অংশ ২ বার পুনরাবৃত্তি করেন। এতে নবী করীম (সা.) বুঝতে পারলেন কুরআন করীম অবতীর্ণ হওয়ার কাজ পূর্ণ হয়েছে এবং তাঁর (সা.) অন্তিম যাত্রার পালাও ঘনিয়ে এসেছে।

নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শক্রমে হযরত আবূ বকর (রা.) হযরত যায়েদ সাবিত আনসারী (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি লিখিত কুরআন শরীফের একখানা কপি পুস্তকাকারে বাঁধাই করে রাখেন। অতএব তিনি (রা.) অনেক পরিশ্রম করে প্রত্যেক আয়াতের ব্যাপারে লিখিত ও মুখস্থ প্রত্যেক প্রকারের দৃঢ় সাক্ষ্যের সত্যায়নের মাধ্যমে এ কুরআনকে একখানা গ্রন্থের রূপ দান করেন, (বুখারী কিতাবু ফাযায়েলিল কুরআন)। এ কুরআন খানা হযরত উম্মুল মু’মিনীন হাফসা বিনতে উমর (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। হযরত উসমান (রা.)-এর সময়ে যখন পঠনপদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ দেখা দিলো তখন হযরত উসমান (রা.) উপরোক্ত সংরক্ষিত কুরআন খানার বহু কপি নকল করিয়ে এক ফরমান জারির মাধ্যমে তা দেশে দেশে প্রেরণ করেন। নকল করার কাজে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা হলেন-যায়েদ বিন ছাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, সায়্যেদ ইবনুল আস ও আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস রেযওয়ানুল্লায়হে আলায়হিম। আজ সারা বিশ্বে সেই কুরআনের কপিই মজুদ আছে। আর এ কুরআনই যে সেই কুরআন যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের কাছে অবতীর্ণ হয়েছিল তা ইসলামের ঘোরতর শত্রু প্রাচ্যবিদও স্বীকার করেছেন (Life of Mahomet By Sir William Muir. Encyclopaedia Britannica, কুরআন অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। জার্মান প্রাচ্যবিদ নলডিকির সাক্ষ্যও এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। তিনি বলেছেন,

‘যেহেতু কুরআনের ব্যবহার উপাসনালয়ে বিদ্যালয়ে এবং অন্যান্যভাবে খ্রিষ্টান দেশগুলোতে বাইবেল পাঠের তুলনায় অধিকতর সেহেতু এটা প্রকৃতই বলা হয়েছে, সর্বাধিক ব্যাপকভাবে পঠিত গ্রন্থ হলো কুরআন’।

(এন সাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা নবম সংস্করণ)

তিলাওয়াত শব্দের প্রতি এক নজর

আরবী ‘তিলাওয়াত’ শব্দের অর্থ করা হয় সাধারণত আবৃত্তি। কিন্তু ব্যপকতার দিক থেকে তিলাওয়াত ও আবৃত্তির মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। আবৃত্তির অর্থ বারে বারে পাঠ, অভ্যাস করন, ছন্দ ভাব প্রভৃতি বজায় রেখে ঊচ্চঃস্বরে পাঠ, পুনঃপুনঃ আগমন ইত্যাদি (সংসদ)। কিন্তু ‘তিলাওয়াত’ শব্দ দিয়ে পাঠ করা, উপলব্ধি করা, অনুসরণ করা প্রভৃতি বুঝায় (মুফরাদাত)। অর্থাৎ না বুঝে পাঠ করলে হবে না এবং অনুসরণ না করে পাঠ করলেও একে তিলাওয়াত বলা যাবে না। তাই কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করার মাধ্যমে সাধারণত আবৃত্তি বুঝাবার পরেও এর ওপর সবিশেষ চিন্তা করতে হবে এবং প্রত্যাশিত সুফল লাভের জন্যে এর ওপর আমল অর্থাৎ কর্মে বাস্তবায়িত করতে হবে। আর কুরআন করীম তিলাওয়াতের প্রসঙ্গে আদেশ দেয়া হয়েছে- খুব উঁচু স্বরে, এবং খুব আস্তেও নয় অর্থাৎ ধীরে ধীরে বুঝে শুনে তিলাওয়াত করুন বিগলিত চিত্তের করে পাঠ করতে হবে (১৭:১১১; ৪৭৩:৫)

আল্লাহ্‌ তাবারক ওয়া তাআলা বলেন, ওয়া ইয্‌ ক্বুরিয়াল কুরআনা ফাসাতমি’উ লাহূ ওয়ান সিতু লাআল্লাকুম তুরহামুন অর্থাৎ, আর কুরআন যখন পাঠ করা হয় তখন তোমরা এ (কুরআন) কান পেতে শুন এবং নীরব থাক যেন তোমাদের প্রতি কৃপা করা যায় (সূরা আ’রাফ: ২০৫)। কুরআন খতমের নামে যখন দেখি হাফিয সাহেবরা মাইকে কুরআন তিলাওয়াত করেন হাটে বাজারে বন্দরে তখন দুঃখ হয়। কেউ কেউ হয় তো তা শুনে। অধিকাংশ লোকই শুনার সুযোগ পায় না। যারা কুরআনের এ নির্দেশ জানে না বা বুঝে না তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু যারা জেনে বুঝে মাইক লাগিয়ে এভাবে কুরআন খতম করেন তারা যে আল্লাহ্‌ তাআলার আদেশের অবমাননা করছেন তা জোর দিয়ে বলা যায়। অনেক সময় কোন এক উপলক্ষে যেমন বিয়ে সাদী বা সভা সম্মেলনে তিলাওয়াতের সময় যারা হৈ চৈ করেন বা অন্যান্য কথা বার্তা বলেন তারাও যে আল্লাহ্‌র আদেশ পালন না করে নিজেদের হাতে আল্লাহর কৃপার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন তা-ও বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না।

কুরআন করীম তিলাওয়াতের পূর্বে পাক পবিত্র হওয়া

বাহ্যিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর যে অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নির্ভরশীল এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কুরআন করীম পাঠ করার পূর্বে দৈহিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তথা ওযূ এবং প্রয়োজনে গোসল প্রভৃতি করে নিতে হবে। তবে অধিক সম্মান দেখাবার খাতিরে অনেকে কুরআন গিলাফে ভর্তি করে অনেক উঁচুতে তাকের ওপর রেখে দেন। এতেই যে এর প্রতি অধিক সম্মান ও শ্রদ্ধ-ভক্তি দেখানো হয় তা কেউ বলতে পারবে না। অবশ্য একথা ও ঠিক, বাহ্যিকভাবেও কুরআনকে সম্মান দেখাতে হবে। এমন কি কুরআন শরীফ নিচু স্থানে রেখে উঁচু স্থানে বসাও সমীচীন নয়��� প্রয়োজনে কুরআন করীমের বিশেষ বিশেষ স্থানে চিহ্ন দাগ প্রভৃতি দেয়া যেতে পারে এবং নোট প্রভৃতিও লেখা যেতে পারে। সাধারণ্যে কুরআন করীম তিলাওয়াতের অভ্যেস নেই বললেই চলে। আগেই বলেছি কুরআ��কে সম্মান দেখানোর জন্যে অনেক উঁচুতে উঠিয়ে রাখা হয়। কোন কোন সময় কসম খাওয়ার কাজে, বাটি চলান দিতে এবং মৃত্যু ব্যক্তির সামনে বসে কুরআন তিলাওয়াতের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

কুরআন মানবের জন্য জীবন বিধান-মুক্তির মহাসনদ। বেশি বেশি পাঠ করতে হবে বলেই এর কুরআন নামকরণ একটি বিশেষ কারণ। কুরআন গোটা মানবমন্ডলীর উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই একজন অমুসলিমকে যদি কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হয় সেক্ষেত্রে তাকে আগেই যদি ওযূ গোসল শিখতে হয় যা সে প্রথম প্রথম হয়তো করবে না বা করতেই চাইবে না অন্যথায় তার পক্ষে কুরআনের আলোকে আলোকিত হওয়াতো অনেক দূরের কথা। আসলে এ ব্যাপারটি এ রকম নয়। কুরআন করীমে বলা হয়েছে – “লা ইয়ামাসসু হু ইল্লাল মুত্বাহ্‌হারূন” অর্থাৎ পবিত্র লোক ছাড়া কেউ এ (কুরআন) স্পর্শ করবে না (সূরা আল্‌ ওয়াকেয়া: ৮০)। এর সত্যিকারের অর্থ হলো কেবলমাত্র সেসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যারা ধার্মিক জীবন ধারণের মাধ্যমে হৃদয়ে পবিত্রতা ও স্বচ্ছতা অর্জন করেছেন তারাই কুরআনের সঠিক তাৎপর্য ও অর্থ উপলব্ধি করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। অপবিত্র কলুষ হৃদয় এত্থেকে আলো সংগ্রহ করতে পারবে না। সে হাজার বার গোসল এবং ওযূ করে নিক না কেন। ইমাম গায্‌যালী (রহ.)-ও এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন,

“পবিত্র হস্ত ব্যতীত যেরূপ প্রকাশ্যে কুরআন শরীফ স্পর্শ করা নিষিদ্ধ, তদ্রূপ যাহার হৃদয় কুরিপুর কর্দম হইতে পবিত্র নহে এবং ভক্তি ও মহব্বতের নূরে আলোকিত নহে সে আত্মাও কুরআনের প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হওয়ার যোগ্য নহে।”

(কিমিয়ায়ে সা’দত, ইবাদত খন্ড)

অবশ্য একথাও ঠিক, বাহ্যিকভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করা উচিত। এখানে উল্লেখ থাকে, ঋতুবতী মহিলারা মাসিকের সময় কুরআন স্পর্শ করবেন না। তবে মুখস্থ দোয়া কালাম পাঠ করতে পারেন।

কুরআন পাঠের পূর্বে আল্লাহ্‌ তাআলা শয়তান থেকে তাঁর আশ্রয় প্রথৃনা করার আদেশ দিয়েছেন। যেমন বলা হয়েছে,

“ফা ইযা কারা’তাল কুরআনা ফাসতাইয বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম”

অর্থাৎ, অতএব তুমি যখন কুরআন পাঠ কর তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্‌ আশ্রয় প্রথৃনা করো।

(সূরা নাহল: ৯৯)

সুতরাং যে কোন সময়েই কুরআন তিলাওয়াত করা হোক না কেন এ ‘তা‘আব্বুয’ পাঠ করা ফরয। এখানে এ প্রার্থনার মাধ্যমে কুরআন তিলাওয়াতকারীকে অভ্যন্তরীণ শয়তানী প্রভাব থেকে মুক্ত ও পাক পবিত্র হয়ে কুরআনের প্রকৃত শিক্ষা লাভ করার জন্যে দোয়া শিখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘তা‘আব্বুয’-ও একটি দোয়া। সাধারণ্য প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বাইরে আলাদা একটি শয়তানের অস্তিত্ব রয়েছে। এর কাছ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহ্‌র আশ্রয় চাওয়া হয়-এ ধারণা ঠিক নয়। এতে আল্লাহ্‌ তাআলার প্রতিপক্ষ একটি সত্তার কল্পনা করা হয় মাত্র যা মানুষকে শির্‌কের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আসলে শয়তান মানুষের আন্তর্নিহিত কুপ্রবৃত্তিকে বলা। যেভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

আশ শায়ত্বানু মিনাল জিন্নাতে ওয়ান্নাস।

শয়তান মানুষ ও জিনের মাঝেই রয়েছে।

সুতরাং কুরআন তিলাওয়াতের পূর্বে এ আশ্রয় চাওয়ার অর্থ, মানুষের মাঝে নিহিত কুপ্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা যেন তার কুরআনী জ্ঞান আহরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য মহান আল্লাহ্‌র আশ্রয় এসে তাঁর কৃপা ও কল্যাণ কামনা করা যেন সে কুরআনের আলোকে আলোকিত হতে পারে।

কুরআন করীমে ‘বিসমিল্লাহ্‌’-এর ব্যবহার

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের শিক্ষানুযায়ী প্রত্যেক কাজ করার আগে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ [আমি আল্লাহ্‌র নামে (আরম্ভ করছি) যিনি পরম করুণাময়, অযাচিত-অসীমদাতা (ও) বার বার কৃপাকারী] পাঠ করা উচিত। নবী করীম (সা.) সামান্য সামান্য কাজ এমন কি পাতিলের ঢাকনাটি উঠানোর সময়েও এ বাক্যটি পাঠ করতে বলেছেন কল্যাণ ও বরকতের জন্যে।

আগে বলে এসেছি কুরআন মজীদে ১১৪টি সূরা রয়েছে। প্রতিটি সূরা আরম্ভ হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম’ আয়াত দিয়ে কেবল সূরা তাওবা এর ব্যতিক্রম। আর সূরা নামলের ৩১ আয়াতেও ১বার ‘বিসমিল্লাহ্‌র’ উল্লেখ এসেছে। সুতরাং সারা কুরআনে ১১৪ বার বিসমিল্লাহ্‌র উল্লেখের মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে ১১৪ বার দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাওরাতের দ্বিতীয় বিবরণের ১৮ অধ্যায়ের ১৯ শ্লোকে বলা হয়েছিল-মূসার ভ্রাতৃগণের মাঝ থেকে যে, মহানবীর আবির্ভাবের কথা বলা হযেছিল,

‘তিনি আমার নামে যে সকল বাক্য বলবেন তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে তাহার কাছে আমি পরিশোধ লইব’।

যথাসময়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের ব্যক্তি সত্তার মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুত মহানবী আবির্ভূত হলেন। তিনি ‘বিসমিল্লাহ্‌’ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র নামে সব কথা বলেছেন। কিন্তু বনী ইসরাঈল তাওরাতের সুস্পষ্ট ভাবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা সত্ত্বেও মহানবী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামকে মান্য করেনি; বরং তাঁর (সা.) জীবদ্দশায়ও তাঁকে অশেষ দুঃখ যাতনা দিয়েছে এবং তাঁর জাতিকে এখনও কষ্টের পর কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। তাই উপরোক্ত বিধান অনুযায়ী তারা সদাপ্রভু আল্লাহ্‌র নিকট অপরাধী। আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের কাছ থেখে পরিশোধ নিয়েছেন এবং নিতে থাকবেন। যদিও সাময়িকভাবে তারা এখন কিছুটা সুখ সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু শেষ যুগে তাদের জন্যে মহা আযাব অপেক্ষা করছে (১৭: ১০৫)। নিঃসন্দেহে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ সূরার একটি আয়তে। আহমদী জামাআত বিসমিল্লাহ্‌-কে একটি আয়াত ধরেই সূরার আয়াত গণনা করে থাকে। যে ‘তা‘আব্বুয’ পাঠ করার তাগিদ আছে তা কিন্তু কোথাও লেখা নেই। অথচ যা সূরার প্রারম্ভে লেখা আছে তা কেন গণনা থেকে বাদ দেয়া হবে? অন্যান্যরা এটা গণনা করতেন না বা এখনও সব ক্ষেত্রে গণনা করেন না। সূরা ফাতিহা হলো কুরআন মজীদের প্রথম সূরা। একে ‘সাবাআম মিনাল মাসানী’ অর্থাৎ পুনঃপুনঃ পাঠ্য সাত আয়াত আখ্যায়িত করা হয়েছে কু্‌রআনে হাকীমে (সূরা হিজর: ৮৮)। যখন বলা হলো ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বাদে ৭টি আয়াত দেখিয়ে দিন, তখন কেউ তা পারলেন না। তাই ইদানিং কালে সৌদী রাজার সহায়তায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব প্রণীত যে কুরআন শরীফের বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যায় বাংলাদেশে বিলি করা হয়েছে এতে দেখা যায়, সুরা ফাতিহার আরবী অংশে ‘বিসমিল্লাহ্‌’-কে এক নম্বর আয়াত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কিন্তু বাংলা অনুবাদে ‘বিসমিল্লাহ্‌’-এর অর্থে আয়াত নম্বর দেয়া হয়নি। ৬ নম্বর আয়াতকে ৬ ও ৭ নম্বর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এরপর বাকারাসহ আর কোন সূরায় ‘বিসমিল্লাহ্‌’-আয়াতকে সংখ্যা হিসেবে গণনা করা হয়নি। এসবের কী অর্থ আমরা বুঝি না। ‘আল আয়াযুবিল্লাহ্‌’ - এত্থেকে আল্লাহ্‌র আশ্রয় চাচ্ছি। এটা কি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ধোঁকাবাজি না আত্মাপ্রবঞ্চনা এর বিচারের ভার পাঠক সামাজের ওপর অর্পিত হলো।

আগে বলে এসেছি কুরআন শরীফ পাঠ করার পূর্বে ‘তাআব্বুয’ বা আউযুবিল্লাহ্‌ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ্‌ তাবারক ওয়া তাআলা কিন্তু কুরআনে কোথাও তা অবতীর্ণ করেন নি অথচ সূরার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ্‌ অবতীর্ণ করেছেন। আমার মনে হয়, শেষ যুগে মৌলভী সাহেবান বিসমিল্লাহ���‌কে সূরা থেকে বাদ দেবার চেষ্টা করবেন তাই মহান আল্লাহ্‌ সূরার প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ্‌র’ উল্লেখ করে দিয়েছেন। সূরা তাওবার প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ অবতীর্ণ করেন নি। কেউ কি এতে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ ব্যবহার করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারবেন?

বিসমিল্লাহ্‌’তে যেসব অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে এর সংখ্যা হলো ১৯টি। কেউ কেউ এ ১৯ সংখ্যা দিয়ে কুরআন থেকে নানা প্রকার তথ্য বের করার চেষ্টা করেছেন যেমন, কুরআনে বিসমিল্লাহ্‌ ১১৪ বার ব্যবহৃত হযেছে। এ সংখ্যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য। তবে এর কোন সমর্থন কুরআন হাদীসে নেই। আবার বিসমিল্লায় ১৯ টি অক্ষরের আবাজদের মূল্যমান হয় ৭৮৬। কেউ কেউ বিসমিল্লাহ্‌কে সংক্ষেপে ‘৭৮৬’ লিখে থাকেন। এরও কোন ভিত্তি আছে বলে আমাদের জানা নেই।

কুরআন তিলাওয়াতে প্রারম্ভে সব সময় ‘তাআব্বুয’ পাঠ করা আবশ্যকীয়। তবে সূরার প্রারম্ভে যেখানে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ রয়েছে সেখানে ছাড়া অন্য স্থানে তিলাওয়াতের সময় বিসমিল্লাহ্‌ পাঠ করা জরুরী নয়। নামাযের কিরাতে নবী করীম (সা.) কখনো ‘বিসমিল্লাহ্‌ বিল যিহ্‌র’ (সশব্দে) আবার কখনো ‘বিল খফী’ (নিশব্দে) পাঠ করেছেন। সুতরাং উভয় ধরনই জায়েয বা সিদ্ধ। তবে আমরা আমাদের খলীফাদের অনুসরণে বিসমিল্লাহ্‌ বিল খফী পাঠ করে থাকি।

কুরআন তিলাওয়াতে পরে কেউ কেউ সশব্দে বা নিঃশব্দে ‘সাদাকাল্লাহুল আলীউল আযীম’ বা এ ধরনের স্বীকৃতিমূলক বাক্য পাঠ করে থাকেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের সুন্নত থেকে এটা সাব্যস্ত হয় না তবে কেউ কেউ কুরআনের এ আয়াতগুলো উল্লেখ করে এর যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন: (১) কুল সাদাকাল্লাহু অর্থাৎ তুমি বলো আল্লাহ্‌ সত্য বলেছেন, (আলে ইমরান: ৯৬) এবং (২) ওয়া সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসুলুহূ অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল সত্যই বলেছেন (আহযাব: ২৩)

২য় কিস্তি

পাক্ষিক আহ্‌মদী - সংখ্যা: ১৫ই জুলাই, ২০০৮ইং

উপরে চলুন